এম.জে.এ মামুন:
নারায়ে রিসালাত—ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)’—স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল কুমিল্লার দেবিদ্বার। নাতে রাসুল (সা.)-এর সুমধুর সুর, দরুদ ও সালামের ধ্বনি, কালেমাখচিত পতাকা এবং ধর্মীয় নানা স্লোগানে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, দেবিদ্বার উপজেলা শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস ও আনন্দ র্যালি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে দেবিদ্বার রেয়াজ উদ্দিন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে জশনে জুলুসটি শুরু হয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম থেকে শিশু-কিশোর, তরুণ, বয়োজ্যেষ্ঠসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেন।
সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসল্লিরা পায়ে হেঁটে এবং বিভিন্ন যানবাহনে করে জুলুসস্থলে এসে সমবেত হতে থাকেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয় মাঠটি পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। অনেকের পরনে ছিল সাদা টুপি-পাঞ্জাবি। কারও হাতে ছিল ব্যানার, ফেস্টুন ও কালেমাখচিত বর্ণিল পতাকা।
জুলুসে অংশ নেওয়া মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল ‘নারায়ে রিসালাত—ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)’। পাশাপাশি নাতে রাসুল (সা.), দরুদ ও সালামের সুমধুর ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আতর ও গোলাপের সুবাসে জুলুসের পরিবেশে যোগ হয় ভিন্নমাত্রা।
রেয়াজ উদ্দিন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে জশনে জুলুসটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরে এটি দেবিদ্বার সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
জুলুসের পুরো পথজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল উৎসাহ-উদ্দীপনা। ধর্মীয় স্লোগান, নাতে রাসুল (সা.) এবং দরুদ-সালামের ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে দেবিদ্বার শহরের বিভিন্ন সড়ক। বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জশনে জুলুসটি একটি বর্ণাঢ্য ধর্মীয় আয়োজনে পরিণত হয়।
জশনে জুলুসে সভাপতিত্ব করেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, দেবিদ্বার উপজেলা শাখার সভাপতি আলহাজ্ব মো. মোজাফফর আহমেদ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন দেবিদ্বার আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহ জামান মুন্সী, অধ্যক্ষ মুফতি আবু হানিফ, মুফতি মাওলানা মো. কবির হোসাইন রেজা, আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা, ইউসুফপুর ইউনিয়ন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি হযরত মাওলানা শেখ মো. এরশাদুর রহমান মোজাহেদী, সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিনসহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন অধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, সুফি মোবারক হোসেন মুরাদ, সুবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মুকুল, বিশ্ব সুফি সংস্থা কুমিল্লা শাখার প্রধান সমন্বয়ক মো. কবির হোসেন, দেবিদ্বার উপজেলা সমন্বয়ক মো. কাজী কাওসার, মো. মহিউদ্দিন মজনু, মো. মুজিবুর রহমান, হাজী আব্দুল হান্নান, মো. আবুল খায়ের, আবুল কালাম আজাদ, মো. হাবিবসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
জশনে জুলুস উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হওয়ার পর সেখানে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। সভায় বক্তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম, জীবন, কর্ম, শিক্ষা ও সুমহান আদর্শের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বক্তারা বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত এবং সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর জীবন ছিল সত্য, ন্যায়, মানবতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও শান্তির অনন্য দৃষ্টান্ত।
তাঁর আদর্শ অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তারা বলেন, ব্যক্তি জীবনে সততা, পরিবারে ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ এবং সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার শিক্ষা মহানবীর জীবনাদর্শে রয়েছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তবায়ন করা গেলে হিংসা, বিদ্বেষ, অন্যায়, বৈষম্য ও বিভেদ অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।
আলোচনা সভায় বক্তারা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনকে ‘বিদআত’ আখ্যায়িতকারীদের বক্তব্যের সমালোচনা করে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে ধর্মীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন তারা।
বক্তারা বলেন, ধর্মীয় বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে কোনো মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে সমাজে বিভেদ, বিদ্বেষ বা সংঘাত তৈরি করা উচিত নয়। পরস্পরের ধর্মীয় অনুভূতি ও মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান তারা।
তারা আরও বলেন, মহানবী (সা.)-এর আগমন ছিল মানবজাতির জন্য এক মহান নিয়ামত। তাঁর শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর জীবন ও আদর্শ মানবতার জন্য শান্তি ও কল্যাণের পথনির্দেশনা বহন করে।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও বিভেদের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বের চর্চা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্য বজায় রেখে সবাইকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে। সাম্প্রদায়িক বিভেদ ভুলে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা শুধু ধর্মীয় জীবনের জন্য নয়; ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ন্যায় ও কল্যাণের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।
আলোচনা সভার শেষপর্বে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করা হয়। পরে দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি, মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ, বিশ্বশান্তি এবং মানবতার মঙ্গল কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীতে আনুমানিক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী ১২ রবিউল আউয়াল তাঁর জন্মদিন হিসেবে বহু মুসলমানের কাছে স্মরণীয়। প্রতিবছর এ দিনটি উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মহানবী (সা.)-এর জন্ম, জীবন ও আদর্শ স্মরণ করে নানা ধর্মীয় কর্মসূচি পালন করা হয়।
দেবিদ্বারেও এবার ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত জশনে জুলুসে ধর্মীয় আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটান অংশগ্রহণকারীরা। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি, ন্যায়, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় বর্ণাঢ্য এ আয়োজন।

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 



















