ঢাকা, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

লামায় ৩৮ বছরেও শেষ হয়নি জমি বিরোধ: একই অভিযোগে বারবার প্রশাসনের দ্বারে

জাহিদ হাসান,বান্দরবান প্রতিনিধি।

বান্দরবানের লামা পৌরসভার সাবেক বিলছড়ি ৬ নং ওয়ার্ড।এক একর দশ শতক ৩৮ বছর ধরে চলছে মালিকানা ও দখলের বিরোধ। মামলা হয়েছে, আপিল হয়েছে, প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছে, এমনকি দুই পক্ষের মধ্যে আপসের উদ্যোগও হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও থামেনি বিরোধ।বরং অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী কর্মকর্তা বদল হলেই একই জমি নিয়ে নতুন করে অভিযোগ ও মামলা করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে একই বিষয়ে প্রশাসনের দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে দুই পক্ষকে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—একই জমি নিয়ে এত বছর ধরে মামলা ও অভিযোগ চললেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন?গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিরোধপূর্ণ জমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন। তাঁর পরিদর্শনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রায় চার দশকের পুরোনো এই জমি বিরোধ।দলিল এক পক্ষের, রেকর্ড অন্য পক্ষের লিকন, নাজমুল হক রিপন, তাসফির ও রাসেলের দাবি, তাদের পিতা মৃত আলতাফ মিয়া ওরফে আফলাতুন হোসেন এবং মাতা মোছাম্মৎ তৈয়বের নেছা ১৯৮৭ সালে ১৩৫/৮৭ নম্বর সাফ-কবলা দলিলের মাধ্যমে তবদীল হোসেনের কাছ থেকে এক একর দশ শতক জমি ক্রয় করেন। তাদের দাবি, দলিলের পর থেকেই তাদের পরিবার জমিটি ভোগদখল করে আসছে।অন্যদিকে বাদীপক্ষের দাবি, তবদীল হোসেনের মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সূত্রে তাদের পিতা মইনুল হোসেন ২০০২ সালে মিউটেশন মামলা নং-৪৭/২০০২ এর মাধ্যমে জমির রেকর্ড সংশোধন করেন। এরপরই মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়।এখানেই উঠে আসে মূল প্রশ্ন—জমির বর্তমান রেকর্ড এক পক্ষের নামে হলেও দীর্ঘদিনের বাস্তব দখল যদি অন্য পক্ষের হাতে থাকে, তাহলে বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি কীভাবে হবে?আদালতের মামলা, তদন্ত ও আপস—তারপরও বিরোধ তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বাদীপক্ষের পিতা মইনুল হোসেনের দায়ের করা মামলা নং-১৮/০৮ বিজ্ঞ আদালত ২৩ জুলাই ২০০৯ সালে প্রমাণের অভাবে খারিজ করেন। পরে সিভিল আপিল মামলা নং-১৩/২০১০ দায়ের করা হয়।স্থানীয় সূত্রের দাবি, পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সেনা ক্যাম্পের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে আপসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সমঝোতাও দীর্ঘমেয়াদে বিরোধের অবসান ঘটাতে পারেনি।এদিকে লামা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা পিটিশন মামলা নং-১৬/১৪ এর পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি অফিসের কানুনগো সরেজমিন তদন্ত করেন।তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮৭ সালের ১৩৫/৮৭ নম্বর সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে ২৯৩ নম্বর ছাগল খাইয়া মৌজার ১৪৮ নম্বর খতিয়ানের অন্তর্ভুক্তএক একর দশ শতক জমি আফলাতুন হোসেন ও মোছাম্মৎ তৈয়বের নেছার কাছে বিক্রয়ের বিষয়টি সঠিক। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই সময় থেকে বিবাদীপক্ষের পরিবার জমিটি ভোগদখল করে আসছে এবং বর্তমান রেকর্ড বাদীপক্ষের নামে থাকলেও বাস্তবে জমিটি বিবাদীপক্ষের দখলে রয়েছে।‘একই মামলা বারবার’—স্থানীয়দের প্রশ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং কয়েক বছর পরপর একই বিষয় নতুন করে প্রশাসনের সামনে আসছে।বিবাদীপক্ষের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ভোগদখলে থাকা জমি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও অভিযোগ দায়ের করে হয়রানি করা হচ্ছে। তারা দাবি করছেন, প্রশাসনের কাছে একই বিষয়ে বারবার অভিযোগ করার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবন ও জমির ভোগদখল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।অন্যদিকে বাদীপক্ষের বক্তব্য—তারা জমির বৈধ মালিক এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা সরেজমিনে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, দীর্ঘদিন ধরে জমিটি আফলাতুন হোসেনের পরিবার ভোগদখল করে আসছে। তবে রেকর্ড সংশোধন না হওয়ায় বিরোধের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে তাদের মত।এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আজিদা বেগম, খালেদা বেগম ও মোছাম্মৎ মাজেদা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জমি দখলকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষ জোরপূর্বক পদক্ষেপ নিলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।তাই স্থানীয়দের দাবি, কে প্রকৃত মালিক, কার দখল বৈধ এবং ৩৮ বছর ধরে একই জমি নিয়ে কেন বিরোধ ও মামলা চলমান—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।তাদের মতে, একই অভিযোগ বারবার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরার পরিবর্তে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, আদালতের রায় ও বাস্তব দখল—সবকিছু যাচাই করে আইনগতভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান হবে, অন্যদিকে দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতও এড়ানো সম্ভব হবে।

Share this news as a Photo Card

সম্পর্কিত খবর :
জনপ্রিয়

কলেজের হোস্টেল থেকে ২০-হাজার ইয়াবা উদ্ধার: নারী শিক্ষার্থী গ্রেফতার

21 September 2026

লোহাগড়ায় ইউপি চেয়ারম্যান লাবু মিয়া গ্রেফতার

বিস্তারিত লিংক কমেন্টে |
nagorikbhabna.com
nagorikbhabna

লামায় ৩৮ বছরেও শেষ হয়নি জমি বিরোধ: একই অভিযোগে বারবার প্রশাসনের দ্বারে

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০৪:৫৯:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাহিদ হাসান,বান্দরবান প্রতিনিধি।

বান্দরবানের লামা পৌরসভার সাবেক বিলছড়ি ৬ নং ওয়ার্ড।এক একর দশ শতক ৩৮ বছর ধরে চলছে মালিকানা ও দখলের বিরোধ। মামলা হয়েছে, আপিল হয়েছে, প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছে, এমনকি দুই পক্ষের মধ্যে আপসের উদ্যোগও হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও থামেনি বিরোধ।বরং অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী কর্মকর্তা বদল হলেই একই জমি নিয়ে নতুন করে অভিযোগ ও মামলা করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে একই বিষয়ে প্রশাসনের দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে দুই পক্ষকে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—একই জমি নিয়ে এত বছর ধরে মামলা ও অভিযোগ চললেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন?গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিরোধপূর্ণ জমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন। তাঁর পরিদর্শনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রায় চার দশকের পুরোনো এই জমি বিরোধ।দলিল এক পক্ষের, রেকর্ড অন্য পক্ষের লিকন, নাজমুল হক রিপন, তাসফির ও রাসেলের দাবি, তাদের পিতা মৃত আলতাফ মিয়া ওরফে আফলাতুন হোসেন এবং মাতা মোছাম্মৎ তৈয়বের নেছা ১৯৮৭ সালে ১৩৫/৮৭ নম্বর সাফ-কবলা দলিলের মাধ্যমে তবদীল হোসেনের কাছ থেকে এক একর দশ শতক জমি ক্রয় করেন। তাদের দাবি, দলিলের পর থেকেই তাদের পরিবার জমিটি ভোগদখল করে আসছে।অন্যদিকে বাদীপক্ষের দাবি, তবদীল হোসেনের মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সূত্রে তাদের পিতা মইনুল হোসেন ২০০২ সালে মিউটেশন মামলা নং-৪৭/২০০২ এর মাধ্যমে জমির রেকর্ড সংশোধন করেন। এরপরই মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়।এখানেই উঠে আসে মূল প্রশ্ন—জমির বর্তমান রেকর্ড এক পক্ষের নামে হলেও দীর্ঘদিনের বাস্তব দখল যদি অন্য পক্ষের হাতে থাকে, তাহলে বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি কীভাবে হবে?আদালতের মামলা, তদন্ত ও আপস—তারপরও বিরোধ তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বাদীপক্ষের পিতা মইনুল হোসেনের দায়ের করা মামলা নং-১৮/০৮ বিজ্ঞ আদালত ২৩ জুলাই ২০০৯ সালে প্রমাণের অভাবে খারিজ করেন। পরে সিভিল আপিল মামলা নং-১৩/২০১০ দায়ের করা হয়।স্থানীয় সূত্রের দাবি, পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সেনা ক্যাম্পের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে আপসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সমঝোতাও দীর্ঘমেয়াদে বিরোধের অবসান ঘটাতে পারেনি।এদিকে লামা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা পিটিশন মামলা নং-১৬/১৪ এর পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি অফিসের কানুনগো সরেজমিন তদন্ত করেন।তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮৭ সালের ১৩৫/৮৭ নম্বর সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে ২৯৩ নম্বর ছাগল খাইয়া মৌজার ১৪৮ নম্বর খতিয়ানের অন্তর্ভুক্তএক একর দশ শতক জমি আফলাতুন হোসেন ও মোছাম্মৎ তৈয়বের নেছার কাছে বিক্রয়ের বিষয়টি সঠিক। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই সময় থেকে বিবাদীপক্ষের পরিবার জমিটি ভোগদখল করে আসছে এবং বর্তমান রেকর্ড বাদীপক্ষের নামে থাকলেও বাস্তবে জমিটি বিবাদীপক্ষের দখলে রয়েছে।‘একই মামলা বারবার’—স্থানীয়দের প্রশ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং কয়েক বছর পরপর একই বিষয় নতুন করে প্রশাসনের সামনে আসছে।বিবাদীপক্ষের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ভোগদখলে থাকা জমি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও অভিযোগ দায়ের করে হয়রানি করা হচ্ছে। তারা দাবি করছেন, প্রশাসনের কাছে একই বিষয়ে বারবার অভিযোগ করার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবন ও জমির ভোগদখল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।অন্যদিকে বাদীপক্ষের বক্তব্য—তারা জমির বৈধ মালিক এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা সরেজমিনে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, দীর্ঘদিন ধরে জমিটি আফলাতুন হোসেনের পরিবার ভোগদখল করে আসছে। তবে রেকর্ড সংশোধন না হওয়ায় বিরোধের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে তাদের মত।এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আজিদা বেগম, খালেদা বেগম ও মোছাম্মৎ মাজেদা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জমি দখলকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষ জোরপূর্বক পদক্ষেপ নিলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।তাই স্থানীয়দের দাবি, কে প্রকৃত মালিক, কার দখল বৈধ এবং ৩৮ বছর ধরে একই জমি নিয়ে কেন বিরোধ ও মামলা চলমান—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।তাদের মতে, একই অভিযোগ বারবার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরার পরিবর্তে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, আদালতের রায় ও বাস্তব দখল—সবকিছু যাচাই করে আইনগতভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান হবে, অন্যদিকে দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতও এড়ানো সম্ভব হবে।

Share this news as a Photo Card