
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেরেস্তার নামে টাকা নেওয়া এবং দলিল লেখক সমিতির নামে নির্ধারিত অর্থের চেয়ে বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জমির শ্রেণি পরিবর্তন দেখিয়ে সাফ-কবলা দলিলের পরিবর্তে হেবা-বিল-এওয়াজ বা দানপত্র দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেরেস্তা, দলিল লেখক, স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি কথিত সিন্ডিকেটের কারণে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
উলিপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রবেশ করতেই দেয়ালে লেখা রয়েছে—‘আমি ও আমার কার্যালয় দুর্নীতিমুক্ত।’ কিন্তু সেবা নিতে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বাস্তবে সরকারি ফির বাইরে বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে তাদের।
অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে উলিপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৬ হাজার ৪৩টি দলিল সম্পাদন হয়েছে। এসব দলিলের মধ্যে সাফ-কবলা, হেবা-বিল-এওয়াজ, আমমোক্তারনামা, দানপত্র ও ঘোষণাপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের দলিল রয়েছে।
দলিলপ্রতি অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দলিল লেখক অভিযোগ করেন, সাফ-কবলা দলিলের ক্ষেত্রে দলিলপ্রতি ৬ হাজার টাকা এবং হেবা কিংবা দানপত্র দলিলের ক্ষেত্রে ৬ হাজার ৪০০ টাকা করে নেওয়া হয়। তাদের দাবি, এর মধ্যে ২ হাজার ৯০০ টাকা সেরেস্তার নামে নেওয়া হয়। বাকি অর্থ সমিতির নামে রাখা হলেও দলিল লেখকদের অনেকে এর সুফল থেকে বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ তাদের।
তাদের আরও অভিযোগ, দলিল লেখক সমিতির কার্যকরী কমিটি লিখিতভাবে না থাকলেও মৌখিকভাবে একটি কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং এর বাইরে গিয়ে কাজ করতে গেলে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ
গুনাইগাছ ইউনিয়নের জমিদাতা ইয়াকুব আলী অভিযোগ করেন, জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকারি ফির বাইরে ‘অফিস খরচ’ হিসেবে তার কাছে ৬ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, “আমি ৩ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাদের আচরণে শেষ পর্যন্ত দাবিকৃত টাকা দিতে বাধ্য হই।”
অন্য এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, একটি কাগজের সমস্যা দেখিয়ে তার কাছ থেকে ৬ হাজার টাকার বাইরে আরও ১ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তিনি টাকা দিতে আপত্তি জানালে পরের সপ্তাহে দলিল সম্পাদনের কথা বলা হয়। দূর থেকে বারবার আসা-যাওয়ায় অতিরিক্ত খরচ হবে বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তিনি দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করেন বলে জানান।
মসজিদের নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, গত আট মাসে সম্পাদিত ৬ হাজার ৪৩টি দলিলের বিপরীতে দলিলপ্রতি ১০০ টাকা করে মসজিদের উন্নয়নের নামে অর্থ নেওয়া হয়েছে। এ হিসাবে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার ৩০০ টাকা আদায়ের হিসাব দাঁড়ায়।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়ে সেবা গ্রহীতাদের কাছে স্বচ্ছ কোনো হিসাব নেই। কয়েকটি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা ও সংস্কারকাজে অর্থ ব্যয় করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
প্রায় চার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সেরেস্তা ও দলিল লেখক সমিতিসহ বিভিন্ন খাতে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রায় চার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে।
তবে এই হিসাবের সুনির্দিষ্ট নথি বা সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের আর্থিক পরিমাণটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাব-রেজিস্ট্রারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে উলিপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার ওয়াহেদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যা বলছে দলিল লেখক সমিতি
অভিযোগের বিষয়ে উলিপুর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক খান বলেন, “সরকারি ফির বাইরে আমাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দলিলপ্রতি ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে কোনো সেবা গ্রহীতা দিতে অপারগ হলে জোর করে নেওয়া হয় না।”
মসজিদের উন্নয়নের নামে নেওয়া অর্থ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কয়েকটি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা এবং সংস্কারকাজে ওই অর্থ ব্যবহার করা হয়।”
জেলা রেজিস্ট্রারের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার রুহুল কুদ্দছের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই। আপনি পত্রিকায় প্রকাশ করেন।”
এদিকে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি 



















