ঢাকা, বাংলাদেশ। , সোমবার, ০৪ মে ২০২৬

উলিপুরে তিস্তার ভয়াবহ আগ্রাসনে শত শত মানুষ গৃহহারা

শাহজাহান খন্দকার, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) 
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:২২:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫
  • / ৬৩ বার পঠিত

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের চর গোড়াইপিয়ার গ্রামে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে গত কয়েক দিনের ব্যবধানে শতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বসতভিটা হারিয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যার পর পানি কমে যাওয়ায় ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয়রা জানান, তিস্তার চরাঞ্চলে এরকম তীব্র ভাঙ্গন তারা জীবনে দেখেননি। গত কয়েক মাসে চর গোড়াইপিয়ারে শতাধিক বাড়ি ও বহু একর আবাদি জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। ভাঙ্গনের কারণে অনেক পরিবার এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদী খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ না থাকায় প্রতিবছরই তিস্তা পাড়ে ভাঙ্গন তীব্র হচ্ছে। তারা বলেন, “আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা চাই নদী সংস্কার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।”

থেতরাই ইউনিয়নের চর গোড়াইপিয়ারে প্রায় এক হাজার পরিবারের চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ বর্তমানে হুমকির মুখে আছেন। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি মসজিদ ও ৪টি নূরানী মাদ্রাসা। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, চর গোড়াইপিয়ার জামে মসজিদ কয়েক দিনের মধ্যেই নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকার দবির উদ্দিন (৬৭) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি চর গোড়াইপিয়ার জামে মসজিদের মোয়াজ্জিন। জীবনে ১৫ বার বাড়ি নদীতে গেছে, এবার মসজিদসহ ঘর হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো খেতেও পারছি না।”

একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মজিবর রহমান, আইয়ুব আলী, তৈয়ব আলী, মর্জিনা বেগম ও সাজিনা বেগমসহ অনেকে জানান, নদী তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। শত শত একর জমি ও ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

শুধু থেতরাই নয়, উপজেলার বজরা, গুনাইগাছ ও দলদলিয়া ইউনিয়নের তিস্তা পাড়ের পশ্চিম বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামারহাট, খামার দামারহাট, সাতালস্কর, চর বজরা, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক, টিটমা, ঠুটাপাইকার, কর্পুরা, লাল মসজিদ ও অর্জুন এলাকা ভাঙ্গন কবলিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বসতভিটা নদীতে বিলীন হচ্ছে।

ভাঙ্গনের প্রভাব পড়েছে শিশুদের শিক্ষাজীবনেও। স্কুলছাত্রী আশা মনি (৬ষ্ঠ শ্রেণি) জানান, “ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। রাতে ঘুমাতে পারি না, স্কুলেও যেতে পারছি না।”

থেতরাই ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য আজিজার রহমান বলেন, “চর গোড়াইপিয়ারে এ পর্যন্ত শতাধিক বাড়ি নদীতে গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ হুমকির মুখে রয়েছে। নদী ভাঙ্গন রোধে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।”

উপজেলা নির্বাহী অফিসার নয়ন কুমার সাহা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিকসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

এলাকাবাসীর দাবি, তিস্তা নদী সংস্কার ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে এবং শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ আবাদি জমি হারিয়ে যাবে নদীগর্ভে।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

উলিপুরে তিস্তার ভয়াবহ আগ্রাসনে শত শত মানুষ গৃহহারা

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:২২:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের চর গোড়াইপিয়ার গ্রামে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে গত কয়েক দিনের ব্যবধানে শতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বসতভিটা হারিয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যার পর পানি কমে যাওয়ায় ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয়রা জানান, তিস্তার চরাঞ্চলে এরকম তীব্র ভাঙ্গন তারা জীবনে দেখেননি। গত কয়েক মাসে চর গোড়াইপিয়ারে শতাধিক বাড়ি ও বহু একর আবাদি জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। ভাঙ্গনের কারণে অনেক পরিবার এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদী খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ না থাকায় প্রতিবছরই তিস্তা পাড়ে ভাঙ্গন তীব্র হচ্ছে। তারা বলেন, “আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা চাই নদী সংস্কার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।”

থেতরাই ইউনিয়নের চর গোড়াইপিয়ারে প্রায় এক হাজার পরিবারের চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ বর্তমানে হুমকির মুখে আছেন। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি মসজিদ ও ৪টি নূরানী মাদ্রাসা। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, চর গোড়াইপিয়ার জামে মসজিদ কয়েক দিনের মধ্যেই নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকার দবির উদ্দিন (৬৭) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি চর গোড়াইপিয়ার জামে মসজিদের মোয়াজ্জিন। জীবনে ১৫ বার বাড়ি নদীতে গেছে, এবার মসজিদসহ ঘর হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো খেতেও পারছি না।”

একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মজিবর রহমান, আইয়ুব আলী, তৈয়ব আলী, মর্জিনা বেগম ও সাজিনা বেগমসহ অনেকে জানান, নদী তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। শত শত একর জমি ও ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

শুধু থেতরাই নয়, উপজেলার বজরা, গুনাইগাছ ও দলদলিয়া ইউনিয়নের তিস্তা পাড়ের পশ্চিম বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামারহাট, খামার দামারহাট, সাতালস্কর, চর বজরা, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক, টিটমা, ঠুটাপাইকার, কর্পুরা, লাল মসজিদ ও অর্জুন এলাকা ভাঙ্গন কবলিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বসতভিটা নদীতে বিলীন হচ্ছে।

ভাঙ্গনের প্রভাব পড়েছে শিশুদের শিক্ষাজীবনেও। স্কুলছাত্রী আশা মনি (৬ষ্ঠ শ্রেণি) জানান, “ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। রাতে ঘুমাতে পারি না, স্কুলেও যেতে পারছি না।”

থেতরাই ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য আজিজার রহমান বলেন, “চর গোড়াইপিয়ারে এ পর্যন্ত শতাধিক বাড়ি নদীতে গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ হুমকির মুখে রয়েছে। নদী ভাঙ্গন রোধে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।”

উপজেলা নির্বাহী অফিসার নয়ন কুমার সাহা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিকসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

এলাকাবাসীর দাবি, তিস্তা নদী সংস্কার ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে এবং শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ আবাদি জমি হারিয়ে যাবে নদীগর্ভে।