ঢাকা, বাংলাদেশ। , সোমবার, ০৪ মে ২০২৬

গাজীপুরের জেলা ও মহানগরে চলে মাসে শত শত কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা, নেপথ্যে কারা ?

মৃণাল চৌধুরী সৈকত, সিনি" স্টাফ রিপোর্টার
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:৩৯:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
  • / ৮৮ বার পঠিত

রাজধানী ঢাকার কাছের শিল্পনগরী গাজীপুর মহানগরে মাদকের কারবার জমজমাট হয়ে উঠেছে। মাদক ব্যবসায়ীরা কোটিপতি আর মাদকাসক্তরা সর্বস্ব হারিয়ে জড়াচ্ছে বিভিন্ন অপরাধে, ফলে অভিভাবকরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে।
রাজধানী ঢাকার কাছের শিল্পনগরী গাজীপুরে টঙ্গীসহ আশপাশের বিভিন্ন থানা এলাকায় চলে এ ব্যবসা । মহানগরের টঙ্গী অঞ্চলের কেরানীরটেক এবং কো-অপারেটিভ ব্যাংক মাঠ বস্তিসহ এরশাদ নগর বস্তির প্রায় দেড়শতাধিক স্থানে রয়েছে মাদকের হাট। সেখানে পাইকারি কারবারিই আছেন প্রায় ৫০ জনের মতো আর বিক্রেতা রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। এছাড়া গাছা বাসন ও সদর থানা এলাকায় রয়েছে আরো দুই শকাধিক মাদকের হাট। স্থানীয় প্রভাবশালী কতিপয় রাজনৈতিক দলের পদ-পদবীহীন নামধারী নেতাদের ছায়াতলে মাদক বাণিজ্যের টাকায় এসব ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছেন বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল সম্পদ। এসব মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে নারী মাদক ব্যবসায়ীদের সংখ্যাই বেশী।
তাঁরা মাদকের লাভের টাকায় স্বামীকে কিনে দিয়েছেন প্রাইভেট কার, ট্রাক, অটোরিকশা। কিনেছে বাড়ি-ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদ। তবে আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে মাঝে মধ্যে ছোট কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও বড় ব্যবসায়ী ও মূল হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনেক সময় ছোট হোতাদের গ্রেপ্তার করা হলেও নানা ফাঁকফোকরে জামিনে বের হয়ে আবার একই কারবারে যুক্ত হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মহানগরে মাদকের কারবার বেড়ে যাওয়ায় মাদকাসক্তও বাড়ছে। ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত সন্তানের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ অভিভাবকরা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। মহানগর ব্যাপী বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। অবস্থা এমন যে আসক্তরা মাদকের টাকা জোগাড়ের জন্য নিজের মা-বাবাকেও মারধর করছে। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে তারা। ইতিমধ্যে ছেলের মারধরে অতিষ্ঠ জেলার শ্রীপুরের নানাইয়া গ্রামের এক বাবা গত ২৯ এপ্রিল ঘুমন্ত অবস্থায় মাদকাসক্ত ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। তারপর থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাজীপুরে মাদক কারবারের মূল রাজধানী হচ্ছে টঙ্গী।
টঙ্গীর বিভিন্ন বস্তি ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রধান মাদকের হাট। এর মধ্যে রয়েছে এরশাদনগর বস্তি, ব্যাংকের মাঠ বস্তি, কেরানীর টেক বস্তি। এরই মধ্যে যৌথ বাহিনী দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। তার পরও সেখানে বন্ধ হয়নি কারবার। টঙ্গীর আলোচিত মাদকসম্রাজ্ঞীদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংক মাঠ বস্তির মোমেলা বেগম ও আওয়ামীলীগ মহিলালীগ নেত্রী ময়না বেগম ও তার পরিবারের সদস্যগন । স্থানীয় সূত্র জানায়, তাঁদের সবাই কোটিপতি। এঁদের মধ্যে মোমেলা বেগম মাদক বিক্রির অর্থে  টঙ্গীতে কিনেছেন তিনটি বাড়ি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের মরকুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন কুদ্দুস খলিফা রোডে ‘জাহিদ হাসান ভিলা’ নামে বহুতল বাড়ি রয়েছে তার। একই ওয়ার্ডের সিলমুন পূর্বপাড়া জুগীবাড়ি সড়কে মাতৃকোল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির কর্মকর্তা স্বপন মাস্টারের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকায় কেনেন আরো একটি বাড়ি। পুবাইলের করমতলা পূর্বপাড়া আবাসিক এলাকায় পৌঁনে চার কাঠা জমিতে আরো একটি আধাপাকা বাড়ি রয়েছে তার। এ ছাড়া ব্যাংক মাঠ বস্তিতে রয়েছে একাধিক আধাপাকা ঘর। জানা গেছে, মোমেলা তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে কিনে দিয়েছে চারটি মিনি ট্রাক ও অটোরিকশা। মোমেলার মেয়ের জামাই পুলিশের কথিত সোর্স মো. হৃদয়কে কিনে দিয়েছে ২০ লাখ টাকা দামের প্রাইভেট কার। এ ছাড়া টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মোমেলা মাদক কারবারের টাকায় নামে-বেনামে সম্পদ কিনেছে।
পুলিশ জানায়, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোমেলার বিরুদ্ধে টঙ্গী পূর্ব থানাসহ বিভিন্ন থানায় ১৭টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়। এ ছাড়া মাদক কারবারি ময়না বেগমের হয়ে ব্যবসা করে তার ভাই একাধিক মাদক মামলার আসামি শফিকুল ইসলাম, তার মেয়ে ছয় মাদক মামলার আসামি নার্গিস আক্তার, একাধিক মাদক মামলার আসামি ছেলে তাজুল ইসলাম তাজু। ময়না ও তাজুল মাদকের টাকায় আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে গাজীপুর ও মাদারীপুরে গড়েছে বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদ। আরেক মাদকসম্রাজ্ঞী রানী বেগম ও তার ছেলে রাব্বানি ছাড়াও কারবারি রিপন মিয়া, রত্না, আমির কানাসহ শতাধিক কারবারি টঙ্গীর মাদকের হাট নিয়ন্ত্রণ করছে। গাজীপুর সদর থানায় সবচেয়ে বড় মাদকের হাট ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীপুরায়। সেখানে দেড় দশক আগে শূন্য হাতে ঢাকার ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন চাঁনপাড়া বস্তি থেকে এসে ঘাঁটি গেড়েছিল তাহমিনা আক্তার। পরে হয়ে ওঠে মাদকসম্রাজ্ঞী। তার স্বামী মো. জুলহাস। তাহমিনা গাজীপুর মহানগরের বড় হেরোইন ও ইয়াবার ডিলার। তার তিন মেয়ে ও এক ছেলেও মাদক কারবারে জড়িত। মাদকের টাকায় তারা এলাকায় গড়েছে চারতলা বাড়ি। তাহমিনার বিরুদ্ধে হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা রাখার অভিযোগে সাতটি মামলা রয়েছে। তার ছেলে মো. জুয়েলের সখ্য ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। ওই নেতাদের প্রভাবে তাদের পুরো পরিবার কারবারে হয়ে ওঠে বেপরোয়া।
এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরায় মাদক কারবারে কোটিপতি হয়েছে মো. হারুন ও তার স্ত্রী আশা। তাদের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মাদক মামলা রয়েছে সদর ও বাসনসহ বিভিন্ন থানায়। হারুনের ছেলে যুবলীগকর্মী মিনহাজুল আবেদীন কনক পুলিশের সোর্স। মাদকের টাকায় কনক এলাকায় গড়ে তুলেছে বহুতল বাড়ি।
পুলিশ জানায়, গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বোর্ডবাজার, ভোগড়া, সালনা ও পুবাইলে রয়েছে মাদকের পাইকারি হাট। জেলার পাঁচ উপজেলার অলিগলিতেও চলছে মাদক ব্যবসা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহানগরে দিনে কমপক্ষে শত কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হচ্ছে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হলেও বহু কারবারি জামিনে বের হয়ে আবার এ কারবারে যুক্ত হচ্ছে। যেমন, গত ৯ মার্চ টঙ্গী পূর্ব থানা এলাকা থেকে আট হাজার পিস ইয়াবাসহ মিনারা আক্তার, রুনা আক্তারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গত ১৪ এপ্রিল কালীগঞ্জ থেকে ১২ হাজার পিস ইয়াবাসহ রায়হান মিয়া ও হানিফ মিয়া এবং  ১৬ এপ্রিল তিন হাজার ৮০০ ইয়াবাসহ কালিয়াকৈর থেকে মোসলিম ভূইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। জানা গেছে, গ্রেপ্তারের ১৪ দিন পর মোসলিম ভূইয়া, ১৩ দিন পর রায়হান মিয়া, হানিফ মিয়া, মিনারা আক্তার ও ১৮ দিনের মাথায় রুনা আক্তার উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়। এভাবে গ্রেপ্তারের কিছুদিনের মধ্যে উচ্চ আদালত থেকে বহু মাদক কারবারি জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই ব্যবসায় জড়িয়েছে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. হাসান যাবের সাদেক জানান, জেলার প্রতিটি থানায় মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলছে। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. এমদাদুল ইসলাম মিঠুনও জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।
মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত মাদক, ছিনতাই রোধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি অভিযানে মাদক কারবারী এবং ছিনতাইকারীদের হ্রেফতার করে আদালতে পাছানো হচ্ছে। মাদক এবং ছিনতাই রোধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

গাজীপুরের জেলা ও মহানগরে চলে মাসে শত শত কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা, নেপথ্যে কারা ?

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:৩৯:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫

রাজধানী ঢাকার কাছের শিল্পনগরী গাজীপুর মহানগরে মাদকের কারবার জমজমাট হয়ে উঠেছে। মাদক ব্যবসায়ীরা কোটিপতি আর মাদকাসক্তরা সর্বস্ব হারিয়ে জড়াচ্ছে বিভিন্ন অপরাধে, ফলে অভিভাবকরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে।
রাজধানী ঢাকার কাছের শিল্পনগরী গাজীপুরে টঙ্গীসহ আশপাশের বিভিন্ন থানা এলাকায় চলে এ ব্যবসা । মহানগরের টঙ্গী অঞ্চলের কেরানীরটেক এবং কো-অপারেটিভ ব্যাংক মাঠ বস্তিসহ এরশাদ নগর বস্তির প্রায় দেড়শতাধিক স্থানে রয়েছে মাদকের হাট। সেখানে পাইকারি কারবারিই আছেন প্রায় ৫০ জনের মতো আর বিক্রেতা রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। এছাড়া গাছা বাসন ও সদর থানা এলাকায় রয়েছে আরো দুই শকাধিক মাদকের হাট। স্থানীয় প্রভাবশালী কতিপয় রাজনৈতিক দলের পদ-পদবীহীন নামধারী নেতাদের ছায়াতলে মাদক বাণিজ্যের টাকায় এসব ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছেন বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল সম্পদ। এসব মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে নারী মাদক ব্যবসায়ীদের সংখ্যাই বেশী।
তাঁরা মাদকের লাভের টাকায় স্বামীকে কিনে দিয়েছেন প্রাইভেট কার, ট্রাক, অটোরিকশা। কিনেছে বাড়ি-ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদ। তবে আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে মাঝে মধ্যে ছোট কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও বড় ব্যবসায়ী ও মূল হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনেক সময় ছোট হোতাদের গ্রেপ্তার করা হলেও নানা ফাঁকফোকরে জামিনে বের হয়ে আবার একই কারবারে যুক্ত হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মহানগরে মাদকের কারবার বেড়ে যাওয়ায় মাদকাসক্তও বাড়ছে। ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত সন্তানের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ অভিভাবকরা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। মহানগর ব্যাপী বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। অবস্থা এমন যে আসক্তরা মাদকের টাকা জোগাড়ের জন্য নিজের মা-বাবাকেও মারধর করছে। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে তারা। ইতিমধ্যে ছেলের মারধরে অতিষ্ঠ জেলার শ্রীপুরের নানাইয়া গ্রামের এক বাবা গত ২৯ এপ্রিল ঘুমন্ত অবস্থায় মাদকাসক্ত ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। তারপর থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাজীপুরে মাদক কারবারের মূল রাজধানী হচ্ছে টঙ্গী।
টঙ্গীর বিভিন্ন বস্তি ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রধান মাদকের হাট। এর মধ্যে রয়েছে এরশাদনগর বস্তি, ব্যাংকের মাঠ বস্তি, কেরানীর টেক বস্তি। এরই মধ্যে যৌথ বাহিনী দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। তার পরও সেখানে বন্ধ হয়নি কারবার। টঙ্গীর আলোচিত মাদকসম্রাজ্ঞীদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংক মাঠ বস্তির মোমেলা বেগম ও আওয়ামীলীগ মহিলালীগ নেত্রী ময়না বেগম ও তার পরিবারের সদস্যগন । স্থানীয় সূত্র জানায়, তাঁদের সবাই কোটিপতি। এঁদের মধ্যে মোমেলা বেগম মাদক বিক্রির অর্থে  টঙ্গীতে কিনেছেন তিনটি বাড়ি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের মরকুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন কুদ্দুস খলিফা রোডে ‘জাহিদ হাসান ভিলা’ নামে বহুতল বাড়ি রয়েছে তার। একই ওয়ার্ডের সিলমুন পূর্বপাড়া জুগীবাড়ি সড়কে মাতৃকোল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির কর্মকর্তা স্বপন মাস্টারের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকায় কেনেন আরো একটি বাড়ি। পুবাইলের করমতলা পূর্বপাড়া আবাসিক এলাকায় পৌঁনে চার কাঠা জমিতে আরো একটি আধাপাকা বাড়ি রয়েছে তার। এ ছাড়া ব্যাংক মাঠ বস্তিতে রয়েছে একাধিক আধাপাকা ঘর। জানা গেছে, মোমেলা তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে কিনে দিয়েছে চারটি মিনি ট্রাক ও অটোরিকশা। মোমেলার মেয়ের জামাই পুলিশের কথিত সোর্স মো. হৃদয়কে কিনে দিয়েছে ২০ লাখ টাকা দামের প্রাইভেট কার। এ ছাড়া টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মোমেলা মাদক কারবারের টাকায় নামে-বেনামে সম্পদ কিনেছে।
পুলিশ জানায়, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোমেলার বিরুদ্ধে টঙ্গী পূর্ব থানাসহ বিভিন্ন থানায় ১৭টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়। এ ছাড়া মাদক কারবারি ময়না বেগমের হয়ে ব্যবসা করে তার ভাই একাধিক মাদক মামলার আসামি শফিকুল ইসলাম, তার মেয়ে ছয় মাদক মামলার আসামি নার্গিস আক্তার, একাধিক মাদক মামলার আসামি ছেলে তাজুল ইসলাম তাজু। ময়না ও তাজুল মাদকের টাকায় আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে গাজীপুর ও মাদারীপুরে গড়েছে বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদ। আরেক মাদকসম্রাজ্ঞী রানী বেগম ও তার ছেলে রাব্বানি ছাড়াও কারবারি রিপন মিয়া, রত্না, আমির কানাসহ শতাধিক কারবারি টঙ্গীর মাদকের হাট নিয়ন্ত্রণ করছে। গাজীপুর সদর থানায় সবচেয়ে বড় মাদকের হাট ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীপুরায়। সেখানে দেড় দশক আগে শূন্য হাতে ঢাকার ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন চাঁনপাড়া বস্তি থেকে এসে ঘাঁটি গেড়েছিল তাহমিনা আক্তার। পরে হয়ে ওঠে মাদকসম্রাজ্ঞী। তার স্বামী মো. জুলহাস। তাহমিনা গাজীপুর মহানগরের বড় হেরোইন ও ইয়াবার ডিলার। তার তিন মেয়ে ও এক ছেলেও মাদক কারবারে জড়িত। মাদকের টাকায় তারা এলাকায় গড়েছে চারতলা বাড়ি। তাহমিনার বিরুদ্ধে হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা রাখার অভিযোগে সাতটি মামলা রয়েছে। তার ছেলে মো. জুয়েলের সখ্য ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। ওই নেতাদের প্রভাবে তাদের পুরো পরিবার কারবারে হয়ে ওঠে বেপরোয়া।
এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরায় মাদক কারবারে কোটিপতি হয়েছে মো. হারুন ও তার স্ত্রী আশা। তাদের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মাদক মামলা রয়েছে সদর ও বাসনসহ বিভিন্ন থানায়। হারুনের ছেলে যুবলীগকর্মী মিনহাজুল আবেদীন কনক পুলিশের সোর্স। মাদকের টাকায় কনক এলাকায় গড়ে তুলেছে বহুতল বাড়ি।
পুলিশ জানায়, গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বোর্ডবাজার, ভোগড়া, সালনা ও পুবাইলে রয়েছে মাদকের পাইকারি হাট। জেলার পাঁচ উপজেলার অলিগলিতেও চলছে মাদক ব্যবসা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহানগরে দিনে কমপক্ষে শত কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হচ্ছে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হলেও বহু কারবারি জামিনে বের হয়ে আবার এ কারবারে যুক্ত হচ্ছে। যেমন, গত ৯ মার্চ টঙ্গী পূর্ব থানা এলাকা থেকে আট হাজার পিস ইয়াবাসহ মিনারা আক্তার, রুনা আক্তারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গত ১৪ এপ্রিল কালীগঞ্জ থেকে ১২ হাজার পিস ইয়াবাসহ রায়হান মিয়া ও হানিফ মিয়া এবং  ১৬ এপ্রিল তিন হাজার ৮০০ ইয়াবাসহ কালিয়াকৈর থেকে মোসলিম ভূইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। জানা গেছে, গ্রেপ্তারের ১৪ দিন পর মোসলিম ভূইয়া, ১৩ দিন পর রায়হান মিয়া, হানিফ মিয়া, মিনারা আক্তার ও ১৮ দিনের মাথায় রুনা আক্তার উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়। এভাবে গ্রেপ্তারের কিছুদিনের মধ্যে উচ্চ আদালত থেকে বহু মাদক কারবারি জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই ব্যবসায় জড়িয়েছে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. হাসান যাবের সাদেক জানান, জেলার প্রতিটি থানায় মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলছে। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. এমদাদুল ইসলাম মিঠুনও জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।
মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত মাদক, ছিনতাই রোধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি অভিযানে মাদক কারবারী এবং ছিনতাইকারীদের হ্রেফতার করে আদালতে পাছানো হচ্ছে। মাদক এবং ছিনতাই রোধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।