ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
তাজা খবর
যশোরে কৃত্রিম তেল সংকটে দিশেহারা চালক ও সাধারণ মানুষ
জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন
ফুয়েল পাস নিতে নিবন্ধনের নিয়ম
গ্রামীণ আবহ আর কারুপণ্যের সম্ভার নিয়ে চলছে বৈশাখী মেলা
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন
বরেণ্য গীতিকবি,সুরকার,লেখক ও সংগীত গুরু ইউনুস আলী মোল্লার
স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে মাদারীপুরে ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ
গণধর্ষেণের শিকার ৬-বছরের শিশু ও ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী: গ্রেফতার-১
জাল টাকার কারখানায় অভিযান, আটক-১
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিডনি রোগ
নীরব ঘাতকের বিস্তার, ব্যয়বহুল চিকিৎসা ও প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:১৪:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
- / ১০ বার পঠিত

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ:
মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি আমাদের জীবন রক্ষায় প্রতিনিয়ত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এটি রক্ত পরিশোধন করে, শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য ঠিক রাখে এবং ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়। একই সঙ্গে এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, লোহিত রক্তকণিকা তৈরি এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু নানা কারণে কিডনি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সমস্যা হলো—প্রাথমিক পর্যায়ে এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে রোগী অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তার কিডনি ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যাচ্ছে। যখন লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই রোগটি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ কারণেই কিডনি রোগকে বলা হয় “নীরব ঘাতক”।
আজকের আধুনিক জীবনে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, কম পানি পান, এবং দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এখন অত্যন্ত জরুরি।
কিডনি রোগের প্রধান কারণ
কিডনি রোগ সাধারণত দীর্ঘদিনের কিছু শারীরিক সমস্যার ফল। প্রধান কারণগুলো হলো—
* বহুমূত্র রোগ (রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন বেশি থাকা)
* উচ্চ রক্তচাপ
* কিডনির ছাঁকনি অংশে প্রদাহ
* বংশগত কিডনি রোগ
* দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন
* কিডনি সংক্রমণ ও পাথর
* অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন (কম পানি পান, অতিরিক্ত লবণ, ধূমপান)
এছাড়াও দীর্ঘদিনের স্থূলতা, রাসায়নিক বিষক্রিয়া এবং বারবার সংক্রমণ কিডনি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।
ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধি: নীরব সতর্ক সংকেত
ক্রিয়েটিনিন হলো শরীরের স্বাভাবিক বর্জ্য পদার্থ, যা পেশির কাজের ফলে তৈরি হয় এবং কিডনি তা বের করে দেয়। কিডনি দুর্বল হলে এটি রক্তে জমে যায়।
এর প্রধান কারণ—
* কিডনির ছাঁকনি নষ্ট হওয়া
* দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
* পানিশূন্যতা
* কিডনি সংক্রমণ।কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
রক্তে ক্রিয়েটিনিন বাড়া মানেই কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।
প্রাথমিক লক্ষণ: অবহেলা নয়
কিডনি রোগের শুরুতে লক্ষণগুলো খুব সাধারণ মনে হয়—
* প্রস্রাব কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া
* শরীর, মুখ ও পা ফুলে যাওয়া
* দুর্বলতা ও ক্লান্তি
* বমি ভাব ও ক্ষুধামন্দা
* প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা রক্ত দেখা।এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি ক্ষতি
উচ্চ রক্তচাপ ধীরে ধীরে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে—
* রক্ত প্রবাহ কমে যায়
* বর্জ্য ছাঁকার ক্ষমতা কমে যায়
* দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল হতে পারে।অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।
বহুমূত্র রোগ ও কিডনি বিকল
বর্তমানে কিডনি বিকলের সবচেয়ে বড় কারণ বহুমূত্র রোগ। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কিডনির ছাঁকনি নষ্ট হয়ে যায়।
লক্ষণ— * প্রস্রাবে প্রোটিন
* শরীর ফুলে যাওয়া * দুর্বলতা
* কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস।শেষ পর্যায়ে কিডনি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং তখন ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়।
ডায়ালাইসিস: জীবন বাঁচানোর সহায়তা
ডায়ালাইসিস হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে যন্ত্রের মাধ্যমে রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি বের করা হয়। এটি কিডনি বিকলের শেষ পর্যায়ের রোগীদের জন্য অপরিহার্য।
ডায়ালাইসিসের খরচ
* প্রতি সেশন: ২,৫০০ – ৫,০০০ টাকা
* সপ্তাহে ২–৩ বার প্রয়োজন
* মাসিক খরচ: ২৫,০০০ – ৬০,০০০ টাকা
* বার্ষিক খরচ: ৩–৭ লাখ টাকা বা তার বেশি।এর সঙ্গে যুক্ত হয় ওষুধ, পরীক্ষা, যাতায়াত ও খাদ্য ব্যয়। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা।
কিডনি প্রতিস্থাপন: স্থায়ী সমাধানের পথ
কিডনি প্রতিস্থাপন হলো একটি অস্ত্রোপচার, যেখানে অসুস্থ কিডনির পরিবর্তে সুস্থ কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
খরচ
* বাংলাদেশ (সরকারি): ৩ – ৮ লাখ টাকা
* বেসরকারি: ৮ – ১৫ লাখ টাকা
* বিদেশে: ২০ – ৫০ লাখ টাকা বা তার বেশি
পরবর্তী ব্যয়
* মাসিক ওষুধ: ১০,০০০ – ৩০,০০০ টাকা
নিয়মিত পরীক্ষা
তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে রোগীর জন্য তুলনামূলকভাবে ভালো জীবনযাপন নিশ্চিত করে।
ডায়ালাইসিস বনাম প্রতিস্থাপন
ডায়ালাইসিস: জীবন রক্ষা করে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়
প্রতিস্থাপন: দীর্ঘমেয়াদে ভালো জীবন দেয়।
ডায়ালাইসিসে খরচ ধারাবাহিক, প্রতিস্থাপনে শুরুতে বেশি
কিডনি রোগে চোখের প্রভাব
* ঝাপসা দেখা * দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া * চোখ ফুলে যাওয়া
* রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
ঝুঁকিপূর্ণ বয়স ও গোষ্ঠী
* ৪০ বছরের পর ঝুঁকি বাড়ে
* ৬০ বছরের পর কিডনি দুর্বল হয়
* শিশুদের জন্মগত সমস্যা
* নারীদের সংক্রমণ ও গর্ভকালীন ঝুঁকি
বিশ্ব ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সচেতনতার অভাব, দেরিতে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল। বাংলাদেশেও লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।
প্রতিরোধের উপায়
১. ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
২. পর্যাপ্ত পানি পান
৩. লবণ কম খাওয়া
৪. ধূমপান বর্জন
৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
৬. অপ্রয়োজনীয় ওষুধ এড়িয়ে চলা
৭. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
হোমিও সমাধান
হোমিওপ্যাথির মূলনীতি হল—রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা করা হয়।” এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কোনো রোগের নাম দেখে সরাসরি চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয় না। বরং রোগীর সম্পূর্ণ শারীরিক লক্ষণ, মানসিক অবস্থা, জীবনযাপন, পারিবারিক ইতিহাস এবং পরিবেশগত প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
কিডনি রোগ বা ডায়ালাইসিসের মতো জটিল অবস্থায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে সহায়ক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর প্রতিটি লক্ষণ বিশ্লেষণ করে ধীরে ধীরে শরীরের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও রোগীর সার্বিক অবস্থার উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
কিডনি ও ডায়ালাইসিস রোগীর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য হোমিওপ্যাথিক ঔষধ লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তবে এগুলো কোনো নির্দিষ্ট রোগের জন্য নয়—শুধু রোগীর ব্যক্তিগত উপসর্গ অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয়:-আর্সেনিক অ্যালবাম,ক্যালকারিয়া কার্ব,লাইকোপোডিয়াম,সালফার, বেলাডোনা, নাক্স ভোমিকা, ক্যান্থারিস,ট্যারাক্সাকাম, কলোসিন্থ,বার্বেরিস ভালগারিস,এপিস মেলিফিকা, সেকাল কোরনাটাম, ইউপাটোরিয়াম পারফ, রাস টক্স,ফসফরাস, ইগনেশিয়া, সালেসিয়া, ক্যালি মিউর, ক্যালি ফস,ক্যালি সালফ,মারকিউরিয়াস সল,কস্টিকাম, ইউরেনিয়াম নাইট্রিকাম, নাট্রাম মিউর,এলুমিনা, হেলেবোরাস, ডিজিটালিস,একোনাইট, কার্ডাস মারিয়ানাস,আর্টিকা ইউরেন্স
সতর্কতা
উপরোক্ত ঔষধগুলো কোনো নির্দিষ্ট রোগের ভিত্তিতে নয়, বরং রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ, উপসর্গের ধরন, মানসিক অবস্থা, সময়কাল এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন করা হয়।
অতএব—নিজে নিজে কোনো ঔষধ সেবন করা উচিত নয় অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।ভুল প্রয়োগে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, কিডনি রোগ একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি ধীরে ধীরে শরীরকে দুর্বল করে দেয় এবং অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে। তবে সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।ডায়ালাইসিস রোগীকে বাঁচিয়ে রাখে, আর কিডনি প্রতিস্থাপন তাকে নতুন জীবনের সুযোগ দেয়। তাই সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আমাদের মনে রাখতে হবে—“সচেতনতা ও প্রতিরোধই কিডনি সুরক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল: drmazed96@gmail.com
আরও পড়ুন:
ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ





















