ঢাকা, বাংলাদেশ। , বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
জানুয়ারি: থাইরয়েড সচেতনতা মাস

নীরব থাইরয়েড-অবহেলায় বাড়ছে ঝুঁকি, জটিলতা

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ ---- 
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:২০:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ৪৩ বার পঠিত
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ —-
জানুয়ারি মাস বিশ্বব্যাপী থাইরয়েড সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। থাইরয়েড একটি ছোট গ্রন্থি হলেও এর কার্যক্রম মানুষের শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, থাইরয়েডজনিত রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেকেই দীর্ঘদিন উপসর্গ নিয়ে ভুগলেও সমস্যার মূল কারণ বুঝতে পারেন না। সময়মতো শনাক্ত না হলে এই রোগ শরীর ও মনে নানাবিধ জটিলতা তৈরি করতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থি: শরীরের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র
থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনের অংশে, কণ্ঠনালির নিচে অবস্থিত একটি প্রজাপতির মতো আকৃতির হরমোনগ্রন্থি। এটি প্রধানত T3 (ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন) ও T4 (থাইরক্সিন) নামক হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হৃদস্পন্দন, হজমক্রিয়া, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যায়, যার প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
থাইরয়েড রোগের প্রধান প্রকারভেদ
১. হাইপোথাইরয়েডিজম
থাইরয়েড গ্রন্থি যখন প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং নারীদের মধ্যে এর হার তুলনামূলক বেশি।
২. হাইপারথাইরয়েডিজম
এ ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ করে। ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং শরীর দ্রুত শক্তি ক্ষয় করতে থাকে।
৩. গয়টার
থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গলায় দৃশ্যমান ফোলাভাব তৈরি করলে তাকে গয়টার বলা হয়। এটি আয়োডিনের ঘাটতি কিংবা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে হতে পারে।
৪. থাইরয়েড নডিউল
থাইরয়েড গ্রন্থির ভেতরে গুটি বা চাকার মতো অংশ তৈরি হওয়াকে থাইরয়েড নডিউল বলা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
৫. থাইরয়েড ক্যান্সার
থাইরয়েড গ্রন্থিতে ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
থাইরয়েড সমস্যার সাধারণ লক্ষণ
থাইরয়েড রোগের উপসর্গগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে দেখা দেয় এবং অন্যান্য সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ
* অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি
* অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অবসন্নতা
* ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা
* ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হওয়া
* চুল পড়ে যাওয়া ও চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
* কোষ্ঠকাঠিন্য
* মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
* বিষণ্নতা
* নারীদের মাসিক অনিয়ম
হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণ
* দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
* বুক ধড়ফড় করা
* অতিরিক্ত ঘাম
* গরম সহ্য না হওয়া
* হাত কাঁপা
* অস্থিরতা ও উদ্বেগ
* ঘুমের সমস্যা
* পায়খানার পরিমাণ ও সংখ্যা বেড়ে যাওয়া
শিশু, কিশোর ও নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের ঝুঁকি
থাইরয়েড রোগ সব বয়সেই হতে পারে, তবে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হলে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েড সমস্যা বন্ধ্যাত্ব, গর্ভধারণে জটিলতা এবং গর্ভকালীন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই নারীস্বাস্থ্যের সঙ্গে থাইরয়েড সচেতনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
থাইরয়েড রোগের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়
থাইরয়েড সমস্যার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে, যেমন—
* আয়োডিনের ঘাটতি বা অতিরিক্ত গ্রহণ
* বংশগত কারণ
* অটোইমিউন রোগ
* অতিরিক্ত মানসিক চাপ
* দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার
* গর্ভাবস্থা ও প্রসবোত্তর সময়
এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে আগেভাগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব।
থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব ও পদ্ধতি
থাইরয়েড রোগ নির্ণয় বর্তমানে সহজ ও নির্ভরযোগ্য। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা জানা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাসমূহ
* TSH (Thyroid Stimulating Hormone)
* Free T3 ও Free T4
* প্রয়োজনে থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা
* গলার আল্ট্রাসনোগ্রাম
* নডিউলের ক্ষেত্রে বিশেষ পরীক্ষা
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে থাইরয়েড পরীক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগেই রোগ শনাক্ত করা যায়।
জটিলতা
চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে থাইরয়েড রোগ থেকে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে—
* হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমে সমস্যা
* উচ্চ রক্তচাপ
* ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
* হাড় ক্ষয় ও দুর্বলতা
* মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
* কর্মক্ষমতা ও জীবনমান হ্রাস
এসব জটিলতা অনেক সময় ধীরে ধীরে তৈরি হয়, যা পরে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সচেতনতা কেন জরুরি
থাইরয়েড একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। সচেতনতা থাকলে রোগ নির্ণয় সহজ হয়, জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখা যায়। জানুয়ারি মাসের থাইরয়েড সচেতনতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—লক্ষণকে অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা করানো কতটা জরুরি।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা : রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। এজন্য চিকিৎসকে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়নের মাধ্যমে যথোপযুক্ত চিকিৎসা দিতে হয়। এভাবে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হলে থাইরয়েডজনিত সমস্যা থেকে নিরাময় হওয়া হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব।
শরীরে আয়োডিনের অভাবজনিত কারণে যে গলগণ্ড সৃষ্টি হয়, তা প্রতিরোধে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খাদ্যে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের ফলে এ ধরনের গলগণ্ডের প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
উন্নত দেশগুলোতে শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই থাইরয়েডসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগ শনাক্তের জন্য রক্ত পরীক্ষা করার প্রচলন রয়েছে। এ ব্যবস্থাকে ইউনিভার্সাল নিওনেটাল স্ক্রিনিং বলা হয়, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হোমিও মেডিসিন : হোমিওপ্যাথিতে থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসায় থাইরয়েডিনাম ছাড়াও আয়োডিন, নেট্রাম মিউর, লাইকোপোডিয়াম, সাইলেসিয়া, ফিউকাস ভেসিকুলোসাস, থুজা, মেডোরিনামসহ আরও অনেক ওষুধ রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। কারণ চিকিৎসক তাঁর অভিজ্ঞতা ও রোগ নির্ণয়ের আলোকে উপযুক্ত ওষুধ নির্বাচন করে থাকেন, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল ওষুধ বা অনুপযুক্ত প্রয়োগে প্রত্যাশিত উপকারের পরিবর্তে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই,থাইরয়েড কোনো বিরল বা লজ্জার রোগ নয়। এটি একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা সম্পর্কে জানলেই অনেক ঝুঁকি কমানো যায়। গলার ছোট একটি গ্রন্থির ভারসাম্যই নির্ধারণ করে আমাদের শরীর ও মনের সুস্থতা। তাই থাইরয়েড সচেতনতা মানেই সুস্থ জীবনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
জানুয়ারি মাসে অঙ্গীকার হোক—নিজে জানব, অন্যকেও জানাব, থাইরয়েড সম্পর্কে সচেতন হব।
লেখক, কলাম লেখক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রবন্ধকার
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল, drmazed96@gmail.com

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

জানুয়ারি: থাইরয়েড সচেতনতা মাস

নীরব থাইরয়েড-অবহেলায় বাড়ছে ঝুঁকি, জটিলতা

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:২০:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ —-
জানুয়ারি মাস বিশ্বব্যাপী থাইরয়েড সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। থাইরয়েড একটি ছোট গ্রন্থি হলেও এর কার্যক্রম মানুষের শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, থাইরয়েডজনিত রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেকেই দীর্ঘদিন উপসর্গ নিয়ে ভুগলেও সমস্যার মূল কারণ বুঝতে পারেন না। সময়মতো শনাক্ত না হলে এই রোগ শরীর ও মনে নানাবিধ জটিলতা তৈরি করতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থি: শরীরের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র
থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনের অংশে, কণ্ঠনালির নিচে অবস্থিত একটি প্রজাপতির মতো আকৃতির হরমোনগ্রন্থি। এটি প্রধানত T3 (ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন) ও T4 (থাইরক্সিন) নামক হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হৃদস্পন্দন, হজমক্রিয়া, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যায়, যার প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
থাইরয়েড রোগের প্রধান প্রকারভেদ
১. হাইপোথাইরয়েডিজম
থাইরয়েড গ্রন্থি যখন প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং নারীদের মধ্যে এর হার তুলনামূলক বেশি।
২. হাইপারথাইরয়েডিজম
এ ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ করে। ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং শরীর দ্রুত শক্তি ক্ষয় করতে থাকে।
৩. গয়টার
থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গলায় দৃশ্যমান ফোলাভাব তৈরি করলে তাকে গয়টার বলা হয়। এটি আয়োডিনের ঘাটতি কিংবা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে হতে পারে।
৪. থাইরয়েড নডিউল
থাইরয়েড গ্রন্থির ভেতরে গুটি বা চাকার মতো অংশ তৈরি হওয়াকে থাইরয়েড নডিউল বলা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
৫. থাইরয়েড ক্যান্সার
থাইরয়েড গ্রন্থিতে ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
থাইরয়েড সমস্যার সাধারণ লক্ষণ
থাইরয়েড রোগের উপসর্গগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে দেখা দেয় এবং অন্যান্য সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ
* অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি
* অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অবসন্নতা
* ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা
* ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হওয়া
* চুল পড়ে যাওয়া ও চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
* কোষ্ঠকাঠিন্য
* মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
* বিষণ্নতা
* নারীদের মাসিক অনিয়ম
হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণ
* দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
* বুক ধড়ফড় করা
* অতিরিক্ত ঘাম
* গরম সহ্য না হওয়া
* হাত কাঁপা
* অস্থিরতা ও উদ্বেগ
* ঘুমের সমস্যা
* পায়খানার পরিমাণ ও সংখ্যা বেড়ে যাওয়া
শিশু, কিশোর ও নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের ঝুঁকি
থাইরয়েড রোগ সব বয়সেই হতে পারে, তবে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হলে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েড সমস্যা বন্ধ্যাত্ব, গর্ভধারণে জটিলতা এবং গর্ভকালীন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই নারীস্বাস্থ্যের সঙ্গে থাইরয়েড সচেতনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
থাইরয়েড রোগের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়
থাইরয়েড সমস্যার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে, যেমন—
* আয়োডিনের ঘাটতি বা অতিরিক্ত গ্রহণ
* বংশগত কারণ
* অটোইমিউন রোগ
* অতিরিক্ত মানসিক চাপ
* দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার
* গর্ভাবস্থা ও প্রসবোত্তর সময়
এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে আগেভাগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব।
থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব ও পদ্ধতি
থাইরয়েড রোগ নির্ণয় বর্তমানে সহজ ও নির্ভরযোগ্য। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা জানা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাসমূহ
* TSH (Thyroid Stimulating Hormone)
* Free T3 ও Free T4
* প্রয়োজনে থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা
* গলার আল্ট্রাসনোগ্রাম
* নডিউলের ক্ষেত্রে বিশেষ পরীক্ষা
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে থাইরয়েড পরীক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগেই রোগ শনাক্ত করা যায়।
জটিলতা
চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে থাইরয়েড রোগ থেকে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে—
* হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমে সমস্যা
* উচ্চ রক্তচাপ
* ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
* হাড় ক্ষয় ও দুর্বলতা
* মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
* কর্মক্ষমতা ও জীবনমান হ্রাস
এসব জটিলতা অনেক সময় ধীরে ধীরে তৈরি হয়, যা পরে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সচেতনতা কেন জরুরি
থাইরয়েড একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। সচেতনতা থাকলে রোগ নির্ণয় সহজ হয়, জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখা যায়। জানুয়ারি মাসের থাইরয়েড সচেতনতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—লক্ষণকে অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা করানো কতটা জরুরি।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা : রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। এজন্য চিকিৎসকে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়নের মাধ্যমে যথোপযুক্ত চিকিৎসা দিতে হয়। এভাবে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হলে থাইরয়েডজনিত সমস্যা থেকে নিরাময় হওয়া হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব।
শরীরে আয়োডিনের অভাবজনিত কারণে যে গলগণ্ড সৃষ্টি হয়, তা প্রতিরোধে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খাদ্যে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের ফলে এ ধরনের গলগণ্ডের প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
উন্নত দেশগুলোতে শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই থাইরয়েডসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগ শনাক্তের জন্য রক্ত পরীক্ষা করার প্রচলন রয়েছে। এ ব্যবস্থাকে ইউনিভার্সাল নিওনেটাল স্ক্রিনিং বলা হয়, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হোমিও মেডিসিন : হোমিওপ্যাথিতে থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসায় থাইরয়েডিনাম ছাড়াও আয়োডিন, নেট্রাম মিউর, লাইকোপোডিয়াম, সাইলেসিয়া, ফিউকাস ভেসিকুলোসাস, থুজা, মেডোরিনামসহ আরও অনেক ওষুধ রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। কারণ চিকিৎসক তাঁর অভিজ্ঞতা ও রোগ নির্ণয়ের আলোকে উপযুক্ত ওষুধ নির্বাচন করে থাকেন, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল ওষুধ বা অনুপযুক্ত প্রয়োগে প্রত্যাশিত উপকারের পরিবর্তে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই,থাইরয়েড কোনো বিরল বা লজ্জার রোগ নয়। এটি একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা সম্পর্কে জানলেই অনেক ঝুঁকি কমানো যায়। গলার ছোট একটি গ্রন্থির ভারসাম্যই নির্ধারণ করে আমাদের শরীর ও মনের সুস্থতা। তাই থাইরয়েড সচেতনতা মানেই সুস্থ জীবনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
জানুয়ারি মাসে অঙ্গীকার হোক—নিজে জানব, অন্যকেও জানাব, থাইরয়েড সম্পর্কে সচেতন হব।
লেখক, কলাম লেখক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রবন্ধকার
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল, drmazed96@gmail.com