ঢাকা, বাংলাদেশ। , সোমবার, ০৪ মে ২০২৬

৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে বিয়ানীবাজারে শহীদ তিন তরুণ: এক বছরেও মেলেনি বিচারের আলোর মুখ

নাগরিক ভাবনা প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার,
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:৩২:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫
  • / ১২২ বার পঠিত

২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে চলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন শেষ হয় ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। সেনাবাহিনী প্রধানের সরাসরি ঘোষণায় জানা যায়—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেছেন। এরপরই দেশজুড়ে আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে মানুষ। ইতিহাসে এই দিনটিকে নাম দেওয়া হয় ‘৩৬ জুলাই’—নতুন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে।

তবে বিয়ানীবাজারে সেই বিজয়ের দিনই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিন তরুণ—রায়হান আহমদ, ময়নুল ইসলাম ও তারেক আহমদ শহীদ হন পুলিশের গুলিতে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এই তিন হত্যাকাণ্ডের বিচার এগোয়নি খুব একটা, ফলে ক্ষোভ আর হতাশায় দিন কাটছে শহীদ পরিবারের সদস্যদের।

৫ আগস্ট দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে বিয়ানীবাজারে আনন্দ মিছিল শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিছিল বাড়তে থাকে। ছাত্র-জনতা, সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা রাজপথে নামে।

কিন্তু বিকেল গড়াতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিজয় মিছিল থামাতে গিয়ে সংঘর্ষ বাঁধে পুলিশের সঙ্গে। একপর্যায়ে বিয়ানীবাজার থানার ভেতর থেকে গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন রায়হান আহমদ ও ময়নুল ইসলাম। মধ্যরাতে থানা ভবনের অভ্যন্তর থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তারেক আহমদের মরদেহ।

ঘটনার পরদিন থেকেই তিন তরুণের মৃত্যু নিয়ে বিয়ানীবাজারে শুরু হয় শোক ও প্রতিবাদ। বিভিন্ন মানববন্ধন, স্মরণসভা ও প্রতিবাদ মিছিল চলে একটানা কয়েক সপ্তাহ। এ তিনজন ছাড়াও আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে শহীদ হন আরও দুইজন—সাংবাদিক আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব এবং নারায়ণগঞ্জে নিহত প্রবাসী সোহেল আহমদ, যিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন।

রায়হান আহমদের ভাই সিয়াম আহমদ বলেন—

“এক বছরেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। আমার ভাই রাজনীতি করত না, শুধু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আমরা চাই এই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হোক।”

তারেক আহমদের স্ত্রী ছামিয়া আক্তার জানান—

“আমার স্বামী দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু সিআইডি এখনো কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। আমি চাই আমার ছেলে একদিন গর্ব করে বলতে পারে—তার বাবা শহীদ।”

বিয়ানীবাজার থানায় এ পর্যন্ত ৪টি মামলা দায়ের হয়েছে—তিনটি হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত এবং একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে। এজাহারে রয়েছে প্রায় ১৫০ জন আসামির নাম। তাদের মধ্যে রয়েছেন—

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ

জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা নাসির উদ্দিন খান

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব

আরও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও কিছু সাংবাদিক

বিয়ানীবাজার থানার ওসি মো. আশরাফ উজ্জামান বলেন—

“মামলাগুলোর তদন্ত চলমান। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পলাতকদের ধরতে অভিযান চলছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই চার্জশিট দেওয়া হবে।”

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম মুস্তাফা মুন্না জানান—

“জুলাইয়ের শহীদরা আমাদের গর্ব। বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গঠনে তাদের আত্মত্যাগ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। শহীদ পরিবারগুলোর পাশে সরকার রয়েছে।”
বিয়ানীবাজারের শহীদ তিন তরুণের মৃত্যু ‘৩৬ জুলাইয়ের’ বিজয় ইতিহাসে এক মর্মন্তুদ ছাপ রেখে গেছে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারহীনতা আজও এই শহীদ পরিবারগুলোকে কাঁদায়।

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন যে তরুণেরা বুকের রক্ত দিয়ে দেখিয়েছেন, তাদের প্রাপ্য ন্যায়বিচার এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে বিয়ানীবাজারে শহীদ তিন তরুণ: এক বছরেও মেলেনি বিচারের আলোর মুখ

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:৩২:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫

২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে চলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন শেষ হয় ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। সেনাবাহিনী প্রধানের সরাসরি ঘোষণায় জানা যায়—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেছেন। এরপরই দেশজুড়ে আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে মানুষ। ইতিহাসে এই দিনটিকে নাম দেওয়া হয় ‘৩৬ জুলাই’—নতুন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে।

তবে বিয়ানীবাজারে সেই বিজয়ের দিনই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিন তরুণ—রায়হান আহমদ, ময়নুল ইসলাম ও তারেক আহমদ শহীদ হন পুলিশের গুলিতে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এই তিন হত্যাকাণ্ডের বিচার এগোয়নি খুব একটা, ফলে ক্ষোভ আর হতাশায় দিন কাটছে শহীদ পরিবারের সদস্যদের।

৫ আগস্ট দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে বিয়ানীবাজারে আনন্দ মিছিল শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিছিল বাড়তে থাকে। ছাত্র-জনতা, সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা রাজপথে নামে।

কিন্তু বিকেল গড়াতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিজয় মিছিল থামাতে গিয়ে সংঘর্ষ বাঁধে পুলিশের সঙ্গে। একপর্যায়ে বিয়ানীবাজার থানার ভেতর থেকে গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন রায়হান আহমদ ও ময়নুল ইসলাম। মধ্যরাতে থানা ভবনের অভ্যন্তর থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তারেক আহমদের মরদেহ।

ঘটনার পরদিন থেকেই তিন তরুণের মৃত্যু নিয়ে বিয়ানীবাজারে শুরু হয় শোক ও প্রতিবাদ। বিভিন্ন মানববন্ধন, স্মরণসভা ও প্রতিবাদ মিছিল চলে একটানা কয়েক সপ্তাহ। এ তিনজন ছাড়াও আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে শহীদ হন আরও দুইজন—সাংবাদিক আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব এবং নারায়ণগঞ্জে নিহত প্রবাসী সোহেল আহমদ, যিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন।

রায়হান আহমদের ভাই সিয়াম আহমদ বলেন—

“এক বছরেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। আমার ভাই রাজনীতি করত না, শুধু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আমরা চাই এই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হোক।”

তারেক আহমদের স্ত্রী ছামিয়া আক্তার জানান—

“আমার স্বামী দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু সিআইডি এখনো কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। আমি চাই আমার ছেলে একদিন গর্ব করে বলতে পারে—তার বাবা শহীদ।”

বিয়ানীবাজার থানায় এ পর্যন্ত ৪টি মামলা দায়ের হয়েছে—তিনটি হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত এবং একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে। এজাহারে রয়েছে প্রায় ১৫০ জন আসামির নাম। তাদের মধ্যে রয়েছেন—

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ

জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা নাসির উদ্দিন খান

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব

আরও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও কিছু সাংবাদিক

বিয়ানীবাজার থানার ওসি মো. আশরাফ উজ্জামান বলেন—

“মামলাগুলোর তদন্ত চলমান। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পলাতকদের ধরতে অভিযান চলছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই চার্জশিট দেওয়া হবে।”

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম মুস্তাফা মুন্না জানান—

“জুলাইয়ের শহীদরা আমাদের গর্ব। বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গঠনে তাদের আত্মত্যাগ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। শহীদ পরিবারগুলোর পাশে সরকার রয়েছে।”
বিয়ানীবাজারের শহীদ তিন তরুণের মৃত্যু ‘৩৬ জুলাইয়ের’ বিজয় ইতিহাসে এক মর্মন্তুদ ছাপ রেখে গেছে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারহীনতা আজও এই শহীদ পরিবারগুলোকে কাঁদায়।

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন যে তরুণেরা বুকের রক্ত দিয়ে দেখিয়েছেন, তাদের প্রাপ্য ন্যায়বিচার এখন সময়ের দাবি।