
তৌফিকুর রহমান হাবিব, সিলেট: ইতিহাসের নিজস্ব একটি হৃদস্পন্দন আছে। সে কখনো উচ্চকণ্ঠে কথা বলে না, কিন্তু তার নীরবতারও একটি ভাষা আছে। সেই ভাষা লেখা থাকে মানুষের অশ্রুজলে, বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাসে, অগণিত স্বপ্নে, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষায় এবং একটি জাতির সম্মিলিত বিবেকে। ৫ আগস্ট তেমনই এক দিন—যে দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি সময়ের বুকে খোদাই হয়ে থাকা এক অনিবার্য স্মৃতি, এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, এক অনিঃশেষ প্রতিধ্বনি।
কিছু দিন আসে, তারপর চলে যায়। আবার কিছু দিন চলে গেলেও কখনো বিদায় নেয় না। তারা মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়, ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখায়। ৫ আগস্ট সেই বিরল দিনগুলোর একটি। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনো জাতির ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদলের গল্প নয়; ইতিহাস মূলত মানুষের আশা, বেদনা, সংগ্রাম এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিরন্তর অভিযাত্রার নাম।
সময়ের সবচেয়ে বড় নির্মমতা হলো—সে কারও জন্য অপেক্ষা করে না। কিন্তু সময়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যও এটাই যে, সে প্রতিটি জাতিকে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ দেয়। ৫ আগস্ট সেই সুযোগের প্রতীক। এটি আমাদের শেখায়, রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার ভিত্তি গড়ে ওঠে মানুষের বিশ্বাসের ওপর; ক্ষমতার অহংকারের ওপর নয়। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ আসনে বসাতে পারে, সেই রাষ্ট্রই ইতিহাসে সম্মানিত হয়।
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কিছু প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আমরা কি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছি? আমরা কি সত্যকে সত্য বলার সাহস অর্জন করেছি? আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে মতের ভিন্নতা বিভেদের কারণ নয়, বরং গণতন্ত্রের সৌন্দর্য? এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল রাষ্ট্রের নয়; আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের কাছেও দায়বদ্ধ।
আজ যখন আমরা ৫ আগস্টের দিকে ফিরে তাকাই, তখন শুধু একটি ঘটনার স্মৃতি নয়, বরং একটি জাতির দীর্ঘ পথচলাকেই দেখি। সেই পথে আছে ত্যাগ, আছে অশ্রু, আছে অপূর্ণতা, আছে অগণিত মানুষের অদম্য স্বপ্ন। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে থাকে সাধারণ মানুষের অসাধারণ সাহস। সেই সাহসই একটি জাতিকে বাঁচিয়ে রাখে, এগিয়ে নিয়ে যায়, নতুন ভোরের অপেক্ষা করতে শেখায়।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন নয়, তার অর্থনীতির পরিসংখ্যানও নয়। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ন্যায়বিচারে, মানবিকতায়, জবাবদিহিতে এবং নাগরিকের স্বাধীনতাকে কতটা মর্যাদা দেওয়া হয়, তার মধ্য দিয়ে। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার কেন্দ্রে থাকে মানুষ; যখন ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের জয় হয়; যখন ভয় নয়, আস্থা মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাস প্রতিশোধকে দীর্ঘস্থায়ী করে না; ইতিহাস টিকিয়ে রাখে শিক্ষা, প্রজ্ঞা এবং আত্মশুদ্ধিকে। অতীতের ক্ষত যদি ভবিষ্যতের প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত না হয়, তবে সেই ইতিহাস কেবল বেদনার ভারই বাড়ায়। কিন্তু যদি সেই ক্ষত আমাদের আরও মানবিক, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও ন্যায়পরায়ণ হতে শেখায়, তবে ইতিহাসের বেদনা একদিন জাতির শক্তিতে পরিণত হয়।
আজ ৫ আগস্টের এই ক্ষণে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হোক—এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ, যেখানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে ন্যায়বিচার; যেখানে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিরাপদ থাকবে; যেখানে আইন কারও পরিচয়ের দিকে তাকাবে না; যেখানে রাজনীতি বিভাজনের নয়, জনকল্যাণের প্রতিযোগিতা হবে; আর যেখানে প্রতিটি শিশু বিশ্বাস নিয়ে বড় হবে যে, এই দেশ তারও।
ইতিহাস কখনো শেষ হয় না। প্রতিটি প্রজন্ম তার নিজস্ব অধ্যায় লিখে যায়। প্রশ্ন শুধু একটাই—আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যেতে চাই? বিভেদের উত্তরাধিকার, নাকি সহমর্মিতার? প্রতিহিংসার আগুন, নাকি ন্যায় ও মানবিকতার আলো?
৫ আগস্ট তাই কেবল স্মরণের দিন নয়; এটি শপথের দিন। এটি আত্মসমালোচনার দিন। এটি নতুন করে মানুষ হওয়ার দিন। কারণ একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে জেগে ওঠে, যখন সে তার অতীতকে ভুলে যায় না, আবার অতীতের অন্ধকারে ভবিষ্যৎকেও বন্দি করে রাখে না।
ইতিহাসের পাতা একদিন হলুদ হয়ে যাবে, সময়ের সাক্ষীরা একে একে হারিয়ে যাবেন। কিন্তু সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কখনো পুরোনো হয় না। সেই চিরন্তন মূল্যবোধের আলোতেই ৫ আগস্ট বেঁচে থাকুক—একটি তারিখ হিসেবে নয়, একটি জাতির জাগ্রত বিবেক হিসেবে।

তৌফিকুর রহমান হাবিব, সিলেট 



















