জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর : যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রকাশিত এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার ফলাফলে মণিরামপুর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। উপজেলার ১১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩ হাজার ১৯৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ২১২ জন অকৃতকার্য হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি তিনজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় একজন ফেল করেছে। সামগ্রিক পাসের হার ৬২ দশমিক ০৬ শতাংশ হলেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, মণিরামপুর উপজেলার ১১০টি বিদ্যালয় থেকে ৩ হাজার ১৯৪ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে পাস করেছে ১ হাজার ৯৮২ জন এবং ফেল করেছে ১ হাজার ২১২ জন। ফলে উপজেলার ফেলের হার দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি উপজেলার প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার চিত্র নয়, বরং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতারও একটি প্রতিফলন।
ফলাফলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একই উপজেলার মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি চিত্র। উপজেলার বাগডাঙ্গা দহাকুলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থীই কৃতকার্য হয়েছে। অন্যদিকে উপজেলার দুটি বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। শতভাগ ফেল করা এসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, একই ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এমন চরম বৈষম্য শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি, প্রশাসনিক তদারকি এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়। তারা মনে করেন, শুধুমাত্র পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; বরং কোন প্রতিষ্ঠান কেন ভালো করছে এবং কোন প্রতিষ্ঠান কেন ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। কোথাও দুইজন, কোথাও তিনজন কিংবা পাঁচজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি গ্রামীণ শিক্ষার জন্য একটি অশনিসংকেত। শিক্ষার্থী সংকট, ঝরে পড়ার প্রবণতা এবং মানসম্মত শিক্ষার অভাব অনেক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে তুলছে।
স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, কিছু বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়, আবার কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠদানের মান উন্নয়ন ছাড়া কেবল কোচিংনির্ভর শিক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়।
অভিভাবকদের একটি অংশের অভিযোগ, অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও তাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তা দেওয়া হয় না। ফলে এসএসসি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় গিয়ে তারা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়ক কার্যক্রমের অভাব প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে।
এদিকে শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরীক্ষার ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীর মেধার প্রতিফলন নয়; বরং একটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক শিক্ষা পরিবেশেরও প্রতিচ্ছবি। তাই যেখানে শতভাগ ফেলের মতো ঘটনা ঘটছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষক উপস্থিতি, পরিচালনা কমিটির ভূমিকা এবং প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর শিক্ষা পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা অন্য বিদ্যালয়গুলোতেও অনুসরণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা প্রশাসন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এসএসসি-২০২৬ এর ফলাফল মণিরামপুরের জন্য তাই কেবল একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একদিকে শতভাগ পাসের উজ্জ্বল সাফল্য, অন্যদিকে শতভাগ ফেল ও প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষায় এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ফলাফলকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষা সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 


















