ঢাকা, বাংলাদেশ , বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220
বিশ্ব মানবতা দিবস ২০২৬

মানবতার জন্য যারা ঝুঁকি নেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ:
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। যুদ্ধের বিভীষিকা, দুর্যোগের ভয়াবহতা, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি কিংবা রোগব্যাধির সংকটে যখন মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কিছু মানুষ নিজের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে পাশে রেখে ছুটে যান বিপন্ন মানুষের কাছে। কারও হাতে থাকে ওষুধ, কারও হাতে খাদ্য, কারও হাতে উদ্ধার সরঞ্জাম; আবার কেউ শুধু একটি আশ্বাসের হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই মানবিকতার বাস্তব রূপ।
প্রতিবছর ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবতা দিবস পালিত হয়। দিনটি শুধু মানবিক কর্মীদের স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেমন নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি যারা এই দায়িত্ব পালন করেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আন্তর্জাতিক সমাজের কর্তব্য।
২০২৬ সালে এসে এই বার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটের পরিধি বাড়ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি কোটি কোটি মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। একই সঙ্গে মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা, অপহরণ ও প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
রক্তাক্ত ইতিহাস থেকে মানবতার অঙ্গীকার
বিশ্ব মানবতা দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বেদনাবিধুর ইতিহাস। ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘের কানাল হোটেলে ভয়াবহ বোমা হামলায় জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সের্গিও ভিয়েরা দ্য মেলোসহ ২২ জন নিহত হন। মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়োজিত এসব কর্মীর মৃত্যু বিশ্বকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে মানবিক কর্মীদের অবদান ও আত্মত্যাগ স্মরণের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিকে সামনে নিয়ে আসে।দুই দশকের বেশি সময় পরও সেই প্রশ্নটি অমীমাংসিত—যারা অন্যের জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যান, তাদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?
বাড়ছে মানবিক সংকট, বাড়ছে প্রয়োজন
২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ নাগাদ বিশ্বের ২৫ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ জরুরি মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষার প্রয়োজনের মধ্যে ছিলেন। বছরের শুরুতে করা হিসাবের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩৬৬ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু মে মাসের শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র প্রায় ৮২১ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থায়নের এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, আশ্রয়, স্যানিটেশন ও শিশু সুরক্ষা কর্মসূচিতে। অর্থের অভাবে কোনো শরণার্থী শিবিরে খাদ্য সহায়তা কমতে পারে, কোনো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম সীমিত হতে পারে, আবার কোনো বাস্তুচ্যুত পরিবার প্রয়োজনীয় আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি মানবিক অংশীদাররা প্রায় ১৪ কোটি ৩২ লাখ মানুষকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত অন্তত এক ধরনের সহায়তা বা সুরক্ষা পেয়েছেন আনুমানিক ৪ কোটি ৫২ লাখ মানুষ। ফলে প্রয়োজন ও সহায়তার মধ্যে ব্যবধান এখনও বিশাল।
মানবতার সেবায় যারা, তারাই যখন আক্রান্ত
মানবিক সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা। যারা যুদ্ধের মধ্যে চিকিৎসা দেন, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকাজ চালান কিংবা ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেন, তারাই অনেক সময় হামলার শিকার হন।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৫ সালে ২১টি দেশে অন্তত ৩২৬ জন মানবিক কর্মী নিহত হয়েছেন। তিন বছরের হিসাবে নিহত মানবিক কর্মীর সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি।
Humanitarian Outcomes-এর Aid Worker Security Database-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৫০ জন মানবিক কর্মী নিহত, ২৩৫ জন অপহৃত এবং ৩২২ জন আহত হয়েছেন। একই বছরে মানবিক কর্মীদের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত বড় ধরনের সহিংস ঘটনার সংখ্যা ছিল ৭১২টি; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৩৪টি।
২০২৪ সালও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ৩৮০ জনের বেশি মানবিক কর্মী নিহত হন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন গাজায় প্রাণ হারান।
প্রতিটি সংখ্যা একটি মানুষের জীবন। একটি সংখ্যা মানে একটি পরিবার তার স্বজনকে হারিয়েছে, কোনো শিশু তার অভিভাবককে হারিয়েছে এবং কোনো সংকটকবলিত জনগোষ্ঠী একজন সহায়তাকারীকে হারিয়েছে।
মানবিক কর্মীরা কোনো পক্ষ নন
যুদ্ধ বা সংঘাতের মধ্যে মানবিক কর্মীরা কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করেন না। তারা অস্ত্র বহন করেন না। তাদের হাতে থাকে ওষুধ, খাদ্য, পানি, উদ্ধার সরঞ্জাম ও জরুরি সহায়তা। তাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু হলো মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো বেসামরিক মানুষ ও মানবিক কাজে নিয়োজিতদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু কাগজে-কলমে আইন থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিচার এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ না হলে সংকটপূর্ণ এলাকায় সহায়তা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোনো সংস্থা যদি একটি এলাকা থেকে কর্মী সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই এলাকার সাধারণ মানুষই।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মানবতা
বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব মানবতা দিবসের গুরুত্ব বিশেষ। কারণ মানবিক সংকট আমাদের কাছে কোনো দূরের বিষয় নয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নিয়মিত বিপদের মুখে পড়ে।
দুর্যোগের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্থানীয় তরুণ এবং সাধারণ মানুষ উদ্ধার ও সহায়তার কাজে এগিয়ে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় মানুষ নিজেদের উদ্যোগে বিপন্নদের পাশে দাঁড়ান।এই স্থানীয় মানবিক শক্তিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘ ছায়া
বাংলাদেশের মানবিক বাস্তবতার আরেকটি বড় অধ্যায় রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন। তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হচ্ছে।
এ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপরও চাপ বাড়ছে। অথচ মানুষের প্রয়োজন কমেনি। তাই শুধু ত্রাণ সহায়তা নয়, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ সমাধানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।
নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন: নতুন মানবিক বিপর্যয়
জলবায়ু পরিবর্তন আগামী দিনের মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে। বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ৩৬৩টি জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
তাই দুর্যোগের পরে শুধু ত্রাণ বিতরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তাও বাড়াতে হবে।
স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করতে হবে
মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু সাহায্যগ্রহীতা হিসেবে দেখার ধারণা বদলাতে হবে। সংকটের প্রথম মুহূর্তে স্থানীয় মানুষই সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দিতে পারেন। তারা জানেন কোথায় ঝুঁকি বেশি, কোন পরিবার বেশি অসহায় এবং কোথায় দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন।
তাই আন্তর্জাতিক মানবিক তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা উচিত। তরুণদের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গড়ে তুললে ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে।
জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি: মানবতার সেবায় একটি দেশীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংগঠনগুলোর অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি ২০২০ সাল থেকে মানবতার সেবায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসহায়তা প্রদান, রোগীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটের সময়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠনটি মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।
মানবিকতার প্রকৃত শক্তি শুধু বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নয়; বরং স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও নিহিত। একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দরিদ্র মানুষের হাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা তুলে দেওয়া কিংবা বিপদের সময়ে একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো—প্রতিটি উদ্যোগই মানবতার বৃহত্তর ধারার অংশ। জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির মতো দেশীয় সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হতে পারে।
অর্থায়নের সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ
মানবিক সংকট বাড়লেও অর্থায়নের ঘাটতি বিশ্ব মানবিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় অর্থ কমে গেলে খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয় ও সুরক্ষা কর্মসূচি সংকুচিত হয়।
মানবিক সহায়তাকে করুণা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। সামর্থ্যবান রাষ্ট্রগুলোর উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী মানবিক তহবিলে অবদান বাড়ানো। একই সঙ্গে তহবিলের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব মানবতা দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য তুলে ধরে—মানবতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় সংকটের সময়। শান্ত পরিবেশে মানবতার কথা বলা সহজ; কিন্তু যুদ্ধ, দুর্যোগ, ক্ষুধা ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়।আর যারা সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু কোনো সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং গোটা মানবসভ্যতার নৈতিক দায়। মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন কার্যকর করতে হবে, অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানবিক তহবিল বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, তরুণ ও সংগঠনগুলোকে মানবিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্ব মানবতা দিবস তাই শুধু স্মরণের দিন নয়; এটি দায়িত্ব, সংহতি ও কার্যকর অঙ্গীকারের দিন। যে হাত বিপন্ন মানুষের দিকে সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই হাত যেন নিরাপত্তাহীনতায় থেমে না যায়। মানবতার রক্ষকরা নিরাপদ থাকলেই বিপন্ন মানুষের কাছে আশার আলো পৌঁছাবে। আর সেই আশার আলোই পারে যুদ্ধ, দুর্যোগ ও সংকটে ক্ষতবিক্ষত পৃথিবীকে আরও মানবিক, নিরাপদ ও সহমর্মী করে তুলতে।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল : drmazed96@gmail.com

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয়

উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশই আরও শক্তিশালী করবে দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতি

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০ | ফোন: ০৯৬৪৯২৩০২২০, ০১৯১৫৭০৮১৮৭, ই-মেইল: info.nagorikvabna@gmail.com

.nv-address-bar { background-color: #1565C0 !important; padding: 10px 20px !important; text-align: center !important; width: 100% !important; display: block !important; } .nv-address-bar p { color: #ffffff !important; font-size: 13px !important; margin: 0 !important; line-height: 1.6 !important; }
25 August 2026

বুড়িচং প্রেস ক্লাবের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত সভাপতি খোরশেদ, সম্পাদক জহিরুল, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির

বিস্তারিত পড়তে কমেন্টে লিংক ... |
nagorikbhabna.com

বিশ্ব মানবতা দিবস ২০২৬

মানবতার জন্য যারা ঝুঁকি নেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০২:১৬:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ:
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। যুদ্ধের বিভীষিকা, দুর্যোগের ভয়াবহতা, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি কিংবা রোগব্যাধির সংকটে যখন মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কিছু মানুষ নিজের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে পাশে রেখে ছুটে যান বিপন্ন মানুষের কাছে। কারও হাতে থাকে ওষুধ, কারও হাতে খাদ্য, কারও হাতে উদ্ধার সরঞ্জাম; আবার কেউ শুধু একটি আশ্বাসের হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই মানবিকতার বাস্তব রূপ।
প্রতিবছর ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবতা দিবস পালিত হয়। দিনটি শুধু মানবিক কর্মীদের স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেমন নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি যারা এই দায়িত্ব পালন করেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আন্তর্জাতিক সমাজের কর্তব্য।
২০২৬ সালে এসে এই বার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটের পরিধি বাড়ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি কোটি কোটি মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। একই সঙ্গে মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা, অপহরণ ও প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
রক্তাক্ত ইতিহাস থেকে মানবতার অঙ্গীকার
বিশ্ব মানবতা দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বেদনাবিধুর ইতিহাস। ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘের কানাল হোটেলে ভয়াবহ বোমা হামলায় জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সের্গিও ভিয়েরা দ্য মেলোসহ ২২ জন নিহত হন। মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়োজিত এসব কর্মীর মৃত্যু বিশ্বকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে মানবিক কর্মীদের অবদান ও আত্মত্যাগ স্মরণের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিকে সামনে নিয়ে আসে।দুই দশকের বেশি সময় পরও সেই প্রশ্নটি অমীমাংসিত—যারা অন্যের জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যান, তাদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?
বাড়ছে মানবিক সংকট, বাড়ছে প্রয়োজন
২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ নাগাদ বিশ্বের ২৫ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ জরুরি মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষার প্রয়োজনের মধ্যে ছিলেন। বছরের শুরুতে করা হিসাবের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩৬৬ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু মে মাসের শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র প্রায় ৮২১ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থায়নের এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, আশ্রয়, স্যানিটেশন ও শিশু সুরক্ষা কর্মসূচিতে। অর্থের অভাবে কোনো শরণার্থী শিবিরে খাদ্য সহায়তা কমতে পারে, কোনো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম সীমিত হতে পারে, আবার কোনো বাস্তুচ্যুত পরিবার প্রয়োজনীয় আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি মানবিক অংশীদাররা প্রায় ১৪ কোটি ৩২ লাখ মানুষকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত অন্তত এক ধরনের সহায়তা বা সুরক্ষা পেয়েছেন আনুমানিক ৪ কোটি ৫২ লাখ মানুষ। ফলে প্রয়োজন ও সহায়তার মধ্যে ব্যবধান এখনও বিশাল।
মানবতার সেবায় যারা, তারাই যখন আক্রান্ত
মানবিক সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা। যারা যুদ্ধের মধ্যে চিকিৎসা দেন, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকাজ চালান কিংবা ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেন, তারাই অনেক সময় হামলার শিকার হন।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৫ সালে ২১টি দেশে অন্তত ৩২৬ জন মানবিক কর্মী নিহত হয়েছেন। তিন বছরের হিসাবে নিহত মানবিক কর্মীর সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি।
Humanitarian Outcomes-এর Aid Worker Security Database-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৫০ জন মানবিক কর্মী নিহত, ২৩৫ জন অপহৃত এবং ৩২২ জন আহত হয়েছেন। একই বছরে মানবিক কর্মীদের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত বড় ধরনের সহিংস ঘটনার সংখ্যা ছিল ৭১২টি; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৩৪টি।
২০২৪ সালও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ৩৮০ জনের বেশি মানবিক কর্মী নিহত হন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন গাজায় প্রাণ হারান।
প্রতিটি সংখ্যা একটি মানুষের জীবন। একটি সংখ্যা মানে একটি পরিবার তার স্বজনকে হারিয়েছে, কোনো শিশু তার অভিভাবককে হারিয়েছে এবং কোনো সংকটকবলিত জনগোষ্ঠী একজন সহায়তাকারীকে হারিয়েছে।
মানবিক কর্মীরা কোনো পক্ষ নন
যুদ্ধ বা সংঘাতের মধ্যে মানবিক কর্মীরা কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করেন না। তারা অস্ত্র বহন করেন না। তাদের হাতে থাকে ওষুধ, খাদ্য, পানি, উদ্ধার সরঞ্জাম ও জরুরি সহায়তা। তাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু হলো মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো বেসামরিক মানুষ ও মানবিক কাজে নিয়োজিতদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু কাগজে-কলমে আইন থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিচার এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ না হলে সংকটপূর্ণ এলাকায় সহায়তা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোনো সংস্থা যদি একটি এলাকা থেকে কর্মী সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই এলাকার সাধারণ মানুষই।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মানবতা
বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব মানবতা দিবসের গুরুত্ব বিশেষ। কারণ মানবিক সংকট আমাদের কাছে কোনো দূরের বিষয় নয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নিয়মিত বিপদের মুখে পড়ে।
দুর্যোগের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্থানীয় তরুণ এবং সাধারণ মানুষ উদ্ধার ও সহায়তার কাজে এগিয়ে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় মানুষ নিজেদের উদ্যোগে বিপন্নদের পাশে দাঁড়ান।এই স্থানীয় মানবিক শক্তিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘ ছায়া
বাংলাদেশের মানবিক বাস্তবতার আরেকটি বড় অধ্যায় রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন। তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হচ্ছে।
এ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপরও চাপ বাড়ছে। অথচ মানুষের প্রয়োজন কমেনি। তাই শুধু ত্রাণ সহায়তা নয়, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ সমাধানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।
নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন: নতুন মানবিক বিপর্যয়
জলবায়ু পরিবর্তন আগামী দিনের মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে। বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ৩৬৩টি জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
তাই দুর্যোগের পরে শুধু ত্রাণ বিতরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তাও বাড়াতে হবে।
স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করতে হবে
মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু সাহায্যগ্রহীতা হিসেবে দেখার ধারণা বদলাতে হবে। সংকটের প্রথম মুহূর্তে স্থানীয় মানুষই সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দিতে পারেন। তারা জানেন কোথায় ঝুঁকি বেশি, কোন পরিবার বেশি অসহায় এবং কোথায় দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন।
তাই আন্তর্জাতিক মানবিক তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা উচিত। তরুণদের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গড়ে তুললে ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে।
জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি: মানবতার সেবায় একটি দেশীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংগঠনগুলোর অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি ২০২০ সাল থেকে মানবতার সেবায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসহায়তা প্রদান, রোগীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটের সময়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠনটি মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।
মানবিকতার প্রকৃত শক্তি শুধু বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নয়; বরং স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও নিহিত। একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দরিদ্র মানুষের হাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা তুলে দেওয়া কিংবা বিপদের সময়ে একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো—প্রতিটি উদ্যোগই মানবতার বৃহত্তর ধারার অংশ। জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির মতো দেশীয় সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হতে পারে।
অর্থায়নের সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ
মানবিক সংকট বাড়লেও অর্থায়নের ঘাটতি বিশ্ব মানবিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় অর্থ কমে গেলে খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয় ও সুরক্ষা কর্মসূচি সংকুচিত হয়।
মানবিক সহায়তাকে করুণা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। সামর্থ্যবান রাষ্ট্রগুলোর উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী মানবিক তহবিলে অবদান বাড়ানো। একই সঙ্গে তহবিলের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব মানবতা দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য তুলে ধরে—মানবতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় সংকটের সময়। শান্ত পরিবেশে মানবতার কথা বলা সহজ; কিন্তু যুদ্ধ, দুর্যোগ, ক্ষুধা ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়।আর যারা সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু কোনো সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং গোটা মানবসভ্যতার নৈতিক দায়। মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন কার্যকর করতে হবে, অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানবিক তহবিল বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, তরুণ ও সংগঠনগুলোকে মানবিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্ব মানবতা দিবস তাই শুধু স্মরণের দিন নয়; এটি দায়িত্ব, সংহতি ও কার্যকর অঙ্গীকারের দিন। যে হাত বিপন্ন মানুষের দিকে সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই হাত যেন নিরাপত্তাহীনতায় থেমে না যায়। মানবতার রক্ষকরা নিরাপদ থাকলেই বিপন্ন মানুষের কাছে আশার আলো পৌঁছাবে। আর সেই আশার আলোই পারে যুদ্ধ, দুর্যোগ ও সংকটে ক্ষতবিক্ষত পৃথিবীকে আরও মানবিক, নিরাপদ ও সহমর্মী করে তুলতে।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল : drmazed96@gmail.com

Share this news as a Photo Card