আব্দুল হান্নান, শাজাহানপুর (বগুড়া): মক্তব হলো মুসলিম শিশুদের প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষার আদি ও মৌলিক কেন্দ্র। শিশুদের সুপ্ত নৈতিকতা ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রথম সূতিকাগার হলো মক্তব। আরবি হরফ চেনা, তাজবিদসহ সহিহভাবে কুরআন পাঠ ও হিফজের প্রাথমিক প্রস্তুতি এখান থেকেই শুরু হয়। এছাড়াও প্রাথমিক দ্বীনি জ্ঞান ওজু, সালাত ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সংক্ষিপ্ত দোয়া ও মাসনুন আমল মক্তবেই শেখানো হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মসজিদভিত্তিক সুফফাহ ও দরসের মাধ্যমে এর সূচনা হয়। পরবর্তীতে খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলে সুশৃঙ্খলভাবে মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর থেকেই ভারতবর্ষে মুসলমানদের হাত ধরে মক্তব ও মাদরাসা শিক্ষার সূচনা হয়। পরবর্তীতে দ্বাদশ শতকে মুসলিম শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হলে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। সুলতানি ও মুঘল আমল হয়ে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলায় ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।
এক যুগ আগেও প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মসজিদ থেকে সকালে কানে আওয়াজ আসতো আলিফ, বা, তা, ছা আর কালেমা পাঠের মিষ্টি মধুর সুর। শিশু-কিশোরের মুখ থেকে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সেই আওয়াজে তখন মুখরিত থাকতো মক্তবগুলো। ভোরে ঘুম থেকে উঠে শিশুরা আরবি কায়দা, আমপারা এবং পবিত্র কুরআন বুকে নিয়ে মক্তবে ছুটে যেতো। পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে শহর তো বটেই, গ্রামের পরিবেশেও মক্তবের সেই দৃশ্য বিরল। বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে রয়েছে।
সকালের মক্তব বন্ধ হওয়ার পেছনে কিন্ডারগার্টেন স্কুলসমূহকে দায়ী করছেন অনেকেই। কারণ এখন শিশুরা মক্তবে পড়ার সময় পায় না; সকাল থেকে ব্যাগ নিয়ে ছুটে কোচিংয়ে কিংবা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। সকাল-বিকাল, সন্ধ্যা প্রাইভেট, কোচিং এবং হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। ন্যাশনাল কারিকুলাম অনুযায়ী পরিচালিত দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই পর্যাপ্ত পরিমাণ ইসলাম শিক্ষা। তৃতীয় শ্রেণি থেকে ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ নামে একটি পাঠ্যপুস্তক পাঠ্যসূচিতে থাকলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ ধর্মীয় শিক্ষা নেই।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কুরআন এবং ধর্মীয় মৌলিক জ্ঞান শেখার ব্যাপারে মুসলিম সমাজে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে তেমন আগ্রহ নেই। একজন মুসলিম নর-নারী হিসেবে কুরআন শিক্ষা এবং পাঠের প্রতি আগ্রহ না থাকা খুব দুঃখজনক বিষয়। তবে কিছু শিক্ষার্থী আগ্রহী হলেও সকাল থেকেই স্কুল, কোচিং এবং প্রাইভেট শিক্ষকদের ব্যস্ততার কারণে তাও সম্ভব হচ্ছে না।
তাছাড়া অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে নেই আরবি পড়ার বিশেষ সুব্যবস্থা। আজ থেকে এক যুগ আগেও মক্তবগুলোতে কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি সালাত-সিয়ামের নিয়ম-কানুন, জরুরি মাসআলা-মাসায়েল ও মাসনুন দোয়া শেখানো হতো। সকালের মক্তব বিলীন হওয়ার কারণেই আরবি এবং ধর্মীয় শিক্ষা থেকে এ প্রজন্মের শিশু-কিশোররা বঞ্চিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থী এবং সচেতন অভিভাবক সূত্রে জানা যায়, সকাল ৬টা থেকে ৭টার মধ্যেই ছেলে-মেয়েদের কোচিং শিক্ষকের কাছে পড়তে হয় এবং দুপুরে বাসার প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়তে হচ্ছে। কুরআন শিক্ষা কোর্সের মূল সময়টুকু কোচিং এবং প্রাইভেটের শিক্ষকরা বরাদ্দ রেখে শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষার প্রশিক্ষণ কোর্স থেকে বঞ্চিত করছেন।
মক্তবকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার ফলে নতুন প্রজন্ম কেবল শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে না, বরং শৈশব থেকে প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল, সালাত-সিয়ামের নিয়ম-কানুন এবং মৌলিক ইসলামিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মক্তব শিক্ষা পুনর্বহাল এবং শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সচেতন অভিভাবক, মসজিদ কমিটি ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আব্দুল হান্নান, শাজাহানপুর (বগুড়া) 


















