অপু দাস : বৈষম্যমূলক করনীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে রাজশাহীর আবাসন খাত বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে রাজশাহীর আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিডা। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, দ্রুত নীতিগত সংস্কার না হলে স্থানীয় আবাসন ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শত শত শিল্প ও লাখো মানুষের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে। শনিবার দুপুর ১২টায় নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রিডার সাধারণ সম্পাদক আ. স. ম. মিজানুর রহমান কাজী।
তিনি বলেন, রাজশাহী একটি চাকরিজীবী ও শিক্ষাকেন্দ্রিক শহর। রাজধানী বা বন্দরনগরীর মতো এখানে বড় কর্পোরেট বিনিয়োগকারী নেই। এ অঞ্চলের আবাসন বাজার মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয়, অবসরকালীন অর্থ এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক করনীতির কারণে সেই বাজার এখন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রবর্তিত করনীতিতে যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট) পদ্ধতিতে জমির মালিকদের ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স আরোপের পর থেকে অধিকাংশ জমির মালিক ডেভেলপারদের সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহ হারিয়েছেন। ফলে নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। জমি হস্তান্তর, সাইনিং মানি, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি এবং পরবর্তী বিক্রয়—প্রতিটি ধাপেই করের চাপ বেড়ে যাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আবাসন নির্মাণ ব্যয়ও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রড ও সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট নির্মাণে অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৬ শতাংশ এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় প্রায় ১৩ শতাংশ হওয়ায় সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য নিজস্ব ফ্ল্যাট কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
রিডার নেতারা জানান, নতুন শুল্ক আরোপ এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় নির্মিত ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না এবং আর্থিক সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
সংগঠনটির দাবি, আবাসন শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এ খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৬৯টি সহযোগী শিল্প জড়িত। আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিলে নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন, বৈদ্যুতিক পণ্য, স্যানিটারি সামগ্রী, আসবাবপত্রসহ অসংখ্য খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, আবাসন খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে এবং পোশাক শিল্পের পর এটি অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থানমুখী খাত। এই খাত মারাত্মক সংকটে পড়লে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তারা আরও দাবি করেন, অতিরিক্ত নিবন্ধন ব্যয় ও করের কারণে অনেক ক্রেতা যথাসময়ে সম্পত্তির নিবন্ধন সম্পন্ন করছেন না। এর ফলে সরকারও সম্ভাব্য বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংকট নিরসনে সরকারের প্রতি দুটি প্রধান দাবি জানায় রিডা। প্রথমত, জমি হস্তান্তর, সাইনিং মানি এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ওপর আরোপিত কর ও ভ্যাটের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা। দ্বিতীয়ত, মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসনের সুযোগ বাড়াতে এক অঙ্কের (সিঙ্গেল ডিজিট) সুদে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ গৃহঋণ চালু করা।
সংগঠনের নেতারা বলেন, সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা হলে রাজশাহীর আবাসন খাতের বর্তমান স্থবিরতা ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রিডার সভাপতি তৌফিকুর রহমান লাভলু, সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইরশাদ আলী ইশা, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ কবির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মেজবাউল বারীসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

অপু দাস 


















