
এম.জে.এ মামুন:
আজ ১৭ সেপ্টেম্বর, ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস। শিক্ষার অধিকার, বৈষম্যহীন ও গণমুখী শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে ১৯৬২ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন রক্তাক্ত অধ্যায়ে রূপ নেয়। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান বাবুল, গোলাম মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহসহ অনেকে। সেই আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন শিক্ষাসচিব এস এম শরীফকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্যের জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন পরবর্তীতে যে সুপারিশ দেয়, তার বেশ কিছু বিষয় পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
কমিশনের সুপারিশে ইংরেজিকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার ধারণাকে অবাস্তব হিসেবে দেখানো এবং উচ্চশিক্ষার মেয়াদ ও ব্যয়সংক্রান্ত পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, এসব নীতি সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করতে পারে।
এই সুপারিশের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভা, সমাবেশ ও ধর্মঘট পালিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিনিধিসভা থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রদেশব্যাপী হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি সফল করতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীদের অবস্থান, মিছিল ও পিকেটিং শুরু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হন। মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে এগিয়ে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে বলা হয়েছে, পুলিশের গুলিতে নবকুমার স্কুলের ছাত্র বাবুল ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বাসের কন্ডাক্টর গোলাম মোস্তফা এবং গৃহকর্মী ওয়াজিউল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে মারা যান। এ ঘটনায় বহু মানুষ আহত ও গ্রেপ্তার হন।
তবে ১৭ সেপ্টেম্বরের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। সরকারি হিসাবে একজন নিহত ও ৭৩ জন আহত এবং ৫৯ জন গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়; অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বাবুল, গোলাম মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহ, এই তিনজনের নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বরের রক্তাক্ত ঘটনার পর শিক্ষা আন্দোলন আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য লাভ করে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে শরীফ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন স্থগিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। শিক্ষার অধিকার ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
শিক্ষা দিবস কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণের দিন নয়; এটি শিক্ষার অধিকার ও শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবির প্রতীক। ১৯৬২ সালের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শিক্ষা ছিল, শিক্ষা শুধু নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির জন্য নয়, বরং সমাজের সব মানুষের অধিকার।
আজকের বাংলাদেশে শিক্ষার সুযোগ আগের তুলনায় বিস্তৃত হলেও শিক্ষার মান, বৈষম্য, ঝরে পড়া, দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের সুযোগ, কর্মমুখী শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় সুযোগসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে ১৭ সেপ্টেম্বরের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং শিক্ষার অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে সচেতনতা বাড়ানোও দিবসটির অন্যতম তাৎপর্য।
১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের রাজপথে যে দাবি উচ্চারিত হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের জন্য শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন শিক্ষার সুযোগ। ৬৪ বছর পরও সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতির উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সবার জন্য মানসম্মত ও সুযোগসমৃদ্ধ শিক্ষা।
শিক্ষার জন্য জীবন দেওয়া বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহসহ আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণে আজ পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস। তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 





















