ঢাকা, বাংলাদেশ। , বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
মাছের নেশায় তলিয়ে যাচ্ছে সোনালি ধান!

কৃষকের কান্নায় ভিজছে কড়াদাইয়ের বিল

সঞ্জয় মালাকার
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:২৬:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
  • / ৩ বার পঠিত

সঞ্জয় মালাকার:   “কার্ড দিয়া ২ লাখ টেকা দিবা, কিন্তু আমার কোটি টাকার ধান যায় ভাইয়া!”— বুক সমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটারত অবস্থায় এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন রাজনগরের কাউয়াদিঘি এলাকার  কৃষক মোঃ শাহজান মিয়া। মৌলভীবাজারের রাজনগরের ‘শস্যভাণ্ডার’ খ্যাত কাউয়াদিঘি ও কড়াদাইয়ের বিল অঞ্চলে এখন উৎসবের বদলে বিষাদের সুর। মাঠের পর মাঠ সোনালি ধান এখন পানির নিচে। কেউ প্রাণের মায়ায় বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন, আবার কেউ শ্রমিকের অভাবে চোখের সামনেই নিজের সারা বছরের স্বপ্নকে পচে যেতে দেখছেন।

মৎস্য চাষীদের আগ্রাসন ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতা

​সরেজমিনে তদন্ত এবং বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই জলাবদ্ধতা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক শ্রেণির মৎস্য চাষীর স্বার্থ। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, চৈত্র মাসেই প্রভাবশালী মৎস্য চাষীরা বিলে মাছের পোনা ছেড়ে বিলের পানি আটকে রাখে। কড়াদাইয়ের পানির পাম্প স্টেশনটি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা নিজেদের সুবিধামতো পাম্প চালায় এবং বন্ধ করে, যার সরাসরি ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ কৃষকদের। পানি সেচে বের না করার ফলে বিলের পানি বেড়ে গিয়ে ধান তলিয়ে যাচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির চিত্র: কৃষকের নাভিশ্বাস

​কাউয়াদিঘি এলাকাটি ধানের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও এখন তা কৃষকদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

শ্রমিক সংকট: পানির নিচে ধান কাটতে দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।

  • ফসলহানি: অনেক কৃষক ১৬-২০ কিয়ার (বিঘা) জমির ধান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি অনুদান বা কার্ডের চেয়ে বেশি প্রয়োজন এই মুহূর্তে পানি সেচে ধান বাঁচানো।
  • সামাজিক মাধ্যম ও মিডিয়ার প্রতিফলন: ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কৃষকরা কচুরিপানার মতো ভেসে থাকা ধান নৌকায় করে তুলছেন। জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে যে, কৃষি প্রধান এলাকায় কেন মৎস্য চাষীদের আধিপত্যে কৃষিকে বলি দেওয়া হচ্ছে।

প্রশাসনের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি

​বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু ক্ষেত্রে পাম্প স্টেশন পরিদর্শনের কথা শোনা গেলেও, কৃষকদের দাবি— যতক্ষণ না বিলের পানি স্থায়ীভাবে নামানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে, ততক্ষণ এই সংকট কাটবে না। গত কয়েক দিনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রভাব এখনো সামান্য।

সতর্কবাণী ও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ

“ধান না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। মাছের খামারের জন্য কোটি কোটি টাকার ধান নষ্ট হতে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

 

কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রশ্ন:

১. কেন কৃষকদের স্বার্থ বিঘ্নিত করে মৎস্য চাষীদের পাম্প স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হচ্ছে?

২. কৃষকের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?

৩. দ্রুততম সময়ে পানি নিষ্কাশন করে অবশিষ্ট ধানটুকু রক্ষা করতে জরুরি ড্রেনেজ ব্যবস্থা কেন কার্যকর হচ্ছে না?

রাজনগরের এই বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। সেই কৃষির ওপর এমন আঘাত সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। এখনই যদি কড়াদাইয়ের পাম্প স্টেশন পূর্ণ ক্ষমতায় চালিয়ে পানি কমানো না হয়, তবে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে। আমরা আশা করি, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত এই ‘ম্যান-মেইড’ বা কৃত্রিম জলাবদ্ধতা নিরসনে কঠোর ভূমিকা পালন করবেন।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

মাছের নেশায় তলিয়ে যাচ্ছে সোনালি ধান!

কৃষকের কান্নায় ভিজছে কড়াদাইয়ের বিল

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:২৬:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

সঞ্জয় মালাকার:   “কার্ড দিয়া ২ লাখ টেকা দিবা, কিন্তু আমার কোটি টাকার ধান যায় ভাইয়া!”— বুক সমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটারত অবস্থায় এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন রাজনগরের কাউয়াদিঘি এলাকার  কৃষক মোঃ শাহজান মিয়া। মৌলভীবাজারের রাজনগরের ‘শস্যভাণ্ডার’ খ্যাত কাউয়াদিঘি ও কড়াদাইয়ের বিল অঞ্চলে এখন উৎসবের বদলে বিষাদের সুর। মাঠের পর মাঠ সোনালি ধান এখন পানির নিচে। কেউ প্রাণের মায়ায় বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন, আবার কেউ শ্রমিকের অভাবে চোখের সামনেই নিজের সারা বছরের স্বপ্নকে পচে যেতে দেখছেন।

মৎস্য চাষীদের আগ্রাসন ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতা

​সরেজমিনে তদন্ত এবং বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই জলাবদ্ধতা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক শ্রেণির মৎস্য চাষীর স্বার্থ। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, চৈত্র মাসেই প্রভাবশালী মৎস্য চাষীরা বিলে মাছের পোনা ছেড়ে বিলের পানি আটকে রাখে। কড়াদাইয়ের পানির পাম্প স্টেশনটি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা নিজেদের সুবিধামতো পাম্প চালায় এবং বন্ধ করে, যার সরাসরি ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ কৃষকদের। পানি সেচে বের না করার ফলে বিলের পানি বেড়ে গিয়ে ধান তলিয়ে যাচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির চিত্র: কৃষকের নাভিশ্বাস

​কাউয়াদিঘি এলাকাটি ধানের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও এখন তা কৃষকদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

শ্রমিক সংকট: পানির নিচে ধান কাটতে দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।

  • ফসলহানি: অনেক কৃষক ১৬-২০ কিয়ার (বিঘা) জমির ধান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি অনুদান বা কার্ডের চেয়ে বেশি প্রয়োজন এই মুহূর্তে পানি সেচে ধান বাঁচানো।
  • সামাজিক মাধ্যম ও মিডিয়ার প্রতিফলন: ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কৃষকরা কচুরিপানার মতো ভেসে থাকা ধান নৌকায় করে তুলছেন। জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে যে, কৃষি প্রধান এলাকায় কেন মৎস্য চাষীদের আধিপত্যে কৃষিকে বলি দেওয়া হচ্ছে।

প্রশাসনের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি

​বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু ক্ষেত্রে পাম্প স্টেশন পরিদর্শনের কথা শোনা গেলেও, কৃষকদের দাবি— যতক্ষণ না বিলের পানি স্থায়ীভাবে নামানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে, ততক্ষণ এই সংকট কাটবে না। গত কয়েক দিনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রভাব এখনো সামান্য।

সতর্কবাণী ও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ

“ধান না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। মাছের খামারের জন্য কোটি কোটি টাকার ধান নষ্ট হতে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

 

কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রশ্ন:

১. কেন কৃষকদের স্বার্থ বিঘ্নিত করে মৎস্য চাষীদের পাম্প স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হচ্ছে?

২. কৃষকের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?

৩. দ্রুততম সময়ে পানি নিষ্কাশন করে অবশিষ্ট ধানটুকু রক্ষা করতে জরুরি ড্রেনেজ ব্যবস্থা কেন কার্যকর হচ্ছে না?

রাজনগরের এই বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। সেই কৃষির ওপর এমন আঘাত সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। এখনই যদি কড়াদাইয়ের পাম্প স্টেশন পূর্ণ ক্ষমতায় চালিয়ে পানি কমানো না হয়, তবে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে। আমরা আশা করি, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত এই ‘ম্যান-মেইড’ বা কৃত্রিম জলাবদ্ধতা নিরসনে কঠোর ভূমিকা পালন করবেন।