ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
তাজা খবর
কক্সবাজারে গহীন বনে ‘রহস্যময় ঘর’ ঘিরে চাঞ্চল্য
কিশোর গ্যাং সৃষ্টি মাদকেই
“কানাডার এমপি নির্বাচনে জয়ী ডলি বেগমকে গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র অভিনন্দন
উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলো ১৪৪ তম খুলনা দিবস!
চট্রগ্রামের জব্বারের বলি খেলায় হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন হোমনার বাঘা শরীফ
কৃষকের ন্যায্য মূল্য কোথায় যায়?
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত
ছদ্মবেশী অস্ত্র ‘পেনগান’
ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট
যশোরে কৃত্রিম তেল সংকটে দিশেহারা চালক ও সাধারণ মানুষ
গণভোটের নামে সাংবিধানিক কাঠামো দুর্বল করার ঝুঁকি

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৮:২৩:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১১০ বার পঠিত

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা।।
রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দলিল সংবিধান—এটি কোনো দলীয় ইশতেহার বা ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক আবেগের বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘হ্যাঁ ভোট’ নামক একগুচ্ছ প্রস্তাব জনসমক্ষে আলোচিত হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা কাঠামো, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, এসব প্রস্তাবের অনেকগুলো শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়েছে গুরুতর সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি।বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না—এ ধরনের বিধান গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জনগণ যদি বারবার একই নেতৃত্বকে ভোট দিতে চায়, সেখানে কৃত্রিম সীমা আরোপ জনগণের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে। একইভাবে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী আলাদা করার বাধ্যবাধকতা দলীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে হস্তক্ষেপ করতে পারে।বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে—এই দাবি নতুন নয়। সংবিধানেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা স্বীকৃত। কিন্তু প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট স্থাপনের প্রস্তাব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এতে বিচার ব্যবস্থার মানোন্নয়নের বদলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।উপজেলা শহরে সিভিল ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্থানান্তরের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। অবকাঠামো, জনবল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এমন সিদ্ধান্ত নিলে বিচার প্রক্রিয়া আরও ধীর ও অকার্যকর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ পদ্ধতি ‘সম্পূর্ণ সচ্ছ’ করার দাবি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক হলেও বাস্তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—সে বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বদলে শুধু সাংবিধানিক ঘোষণা দিয়ে দলীয় প্রভাব দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা।সবচেয়ে বিতর্কিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় সংবিধানে যুক্ত করা। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই ব্যবস্থা নিজেই রাজনৈতিক সংকট ও অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করেছিল। নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালীকরণ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই টেকসই সমাধান—এমন মত সচেতন মহলের।গণভোট ছাড়া সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে না—এই প্রস্তাব শুনতে গণতান্ত্রিক হলেও বাস্তবে তা রাষ্ট্র পরিচালনাকে অচল করে দিতে পারে। সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় পদ্ধতিই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও কার্যকর ব্যবস্থা।
সচেতন মহলের দৃষ্টিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রস্তাবগুলোর একটি হলো—রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা করতে পারবেন না—এমন ধারণা বা বিধান। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের অধিকার রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থা। এই ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে বাতিল বা অকার্যকর করা মানে কার্যত রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতাকে বিলুপ্ত করা এবং তাঁকে একটি আনুষ্ঠানিক, নামমাত্র পদে পরিণত করা।আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে মানবিক বিবেচনা, বিচারিক ত্রুটি সংশোধন কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি স্বীকৃত উপাদান। বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক সংবিধানেই রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমা প্রদানের এখতিয়ার রয়েছে। ফলে এই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া বা নিষিদ্ধ করা সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।সচেতন নাগরিকদের মতে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের অধিকার সম্পূর্ণ অস্বীকার করা কোনোভাবেই একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের প্রস্তাব একজন সচেতন মানুষ সাংবিধানিকভাবে মেনে নিতে পারেন না এবং এটি সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই বিবেচিত হবে।প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা বলা হলেও, এতে দ্বৈত ক্ষমতা কেন্দ্র তৈরি হয়ে শাসনব্যবস্থায় সংঘাত বাড়তে পারে। একইভাবে ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার ঘোষণা করা ভালো উদ্যোগ হলেও, অবকাঠামো ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এটি কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।রাষ্ট্রধর্ম, বিসমিল্লাহ ও ভাষা বিষয়ে প্রস্তাবগুলো সংবিধানে ইতোমধ্যে বিদ্যমান বা আংশিকভাবে অন্তর্ভুক্ত। নতুন করে এসব বিষয় সামনে আনা সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।সচেতন মহলের অভিমত, এই প্রস্তাবসমূহ মূলত আবেগনির্ভর ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ভারসাম্যকে দুর্বল করতে পারে। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতি—না যে হঠাৎ করে পুরো রাষ্ট্র কাঠামো পাল্টে ফেলার ঝুঁকিপূর্ণ প্রয়াস।অতএব, গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে কোনো প্রস্তাবের আকর্ষণীয় শিরোনামে নয়, বরং তার বাস্তবতা, অতীত অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন সচেতন নাগরিকরা।



















