ঢাকা, বাংলাদেশ। , রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

পানির অভাব আর তপ্তখরায় কৃষকদের ফসল পুরে স্বপ্ন ধূসর!

বিপ্লব সাহা, খুলনা ব্যুরো
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:৩৩:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১১ বার পঠিত
বিপ্লব সাহা, খুলনা ব্যুরো:   ঋতু গণনা অনুসারে বৈশাখের মাঝামাঝি গৃস্ম মৌসুম চলছে সাথে অন্যতম মৌসুম ফল  আম, কাঁঠাল ও লিচুর মৌসুম। মাঠে মাঠে দুলছে পরিপুষ্ট ধান। এমন সুসময়ে কৃষকের কপালে চিন্তারেখা এঁকে দিয়েছে প্রবল গরম।
মাথার ওপর গনগনে সূর্য প্রকৃতির বুকে যেন আগুন ঢালছে। সকাল থেকেই তপ্ত থাকছে ফসলের মাঠ। খরার কারণে আম-লিচুর গুটি শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ায় কোথাও কোথাও নলকূপেও উঠছে না পানি। ধানের এ সময়টাতে জমিতে পানি থাকতেই হয়। গাছের গোড়া শুকিয়ে গেলে আর্দ্রতার অভাবে ধান চিটা হওয়ার শঙ্কা থাকে।
এবিষয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার দীর্ঘ খরায় হুমকির মুখে পড়তে পারে ফসল উৎপাদন। এতে করে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই হবে   দক্ষিণের কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলেই ধানে চিটা হতে পারে।
সেখানে এবার তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় ধানে ফুল অবস্থায় পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধানগাছের গোড়ায় পানি ধরে রাখা দরকার। সেটা সম্ভব না হলে জমি অবশ্যই ভেজা থাকতে হবে। এ পরিস্থিতিতে তাদের পরামর্শ হলো, ধান, আম, লিচু, কাঁঠাল, জাম, জামরুলসহ ফল গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিশ্চিত করা গেলে রোদের তাপ বাড়লেও ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না।
এ ছাড়া বেগুন, টমেটো, মরিচ, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, পটোল, শসা ও ঢ্যাঁড়স ক্ষেতে তিন-চার দিন অন্তর সেচ দিতে হবে। পাতা জাতীয় সবজি যেমন ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, কলমি ও লাউশাক ক্ষেতে দু-তিন দিন অন্তর সেচ দেওয়া প্রয়োজন।
দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃতির বৈরী আচরণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। আমন ধান সম্পূর্ণ বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় সম্পূরক সেচ দিয়ে এ ধানের ফলন ভালো হবে না। ফলে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা করছেন কৃষক। সড়কের দু’পাশে বিস্তীর্ণ জমিতে ধান ও নানা ফসলের মাঠ। এ অঞ্চলে এখন ভুট্টা চাষের চাহিদা বেড়েছে। সড়কের পাশে শত শত বিঘা জমিতে দেখা মিলল ভুট্টার ক্ষেত। তবে তীব্র গরম ও রোদের কারণে এখানকার অনেক জমিই ঝলছে গেছে। পরিপক্ব হওয়ার আগেই পুড়ে গেছে গাছের পাতা ও ফল।
বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ভুট্টার ক্ষেতের সামনে অপলক দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক আক্কাস আলী বলেন, এনজিও সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় ফসল রোপণ করেছি। খরায় সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। মাটিতে রস নেই, বৃষ্টিও হচ্ছে না। সেজন্য গাছ থেকে ভুট্টা পড়ে যাচ্ছে। সেচে পানি দিলে এক নিমেষেই মাটি শুষে নেয়। গাছের কোনো উন্নতি হয় না। পাশের সবজি ক্ষেতের কৃষক হারেজ বলেন, যে ওষুধ দিচ্ছি, তাতে কাজ হচ্ছে না। ৫০টা বেগুন হলে এর মধ্যে ৪৫টাতেই পোকা। সেচের পানি মাটি ধরে রাখতে পারছে না। তীব্র তাপদাহে সবজি, ভুট্টাসহ অন্য ফসলি জমিতে ঘন ঘন সেচ দিতে গিয়ে খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। পোড়ামাকড়ও বেড়েছে আগের চেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে আমাদের দিশেহারা অবস্থা।
বটিয়াঘাটা এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আগে বৈশাখের শুরুতে ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি হতো। এখন বর্ষায়ও আশানুরূপ বৃষ্টি হয় না। আমাদের মতো ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া অতিরিক্ত টাকা খরচ করে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করা কঠিন।
একই সাথে কৃষক আবুল হোসেন জানান, শরীর ঘামছে সব সময়, কাজ করতে গেলে শরীর দুর্বল লাগে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বৃষ্টি না হলে খরা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। এখানকার মাটি আঠালো। পানির অভাবে মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে।
এদিকে খরায় খুলনার দক্ষিণ অঞ্চলের  বেশির ভাগ নদী শুকিয়ে গেছে।তবে এ ব্যাপারে একজন বিজ্ঞ পরিবেশবিদ জানান,খুলনা  বিভাগের প্রায় সব নদনদীই এখন পানি স্বল্পতায় ভুগছে  আগে এসব নদীতে চাহিদা অনুরূপ  পানি থাকত।তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে  নদনদীর পানির প্রবাহ এখন নেই বললেই চলে। অথচ এসব নদীর ওপর ভরসা করেই চলে অনেক কৃষকের জীবন-জীবিকা।
এদিকে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে বৃষ্টি একেবারেই অপ্রতুল। তবে এবারও বৈশাখের শুরু থেকে চোখ রাঙাচ্ছে সূর্য। তাপমাত্রা ওঠানামা করছে ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। এতে মাঠে ফসল ফলানো নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষক।
আরো একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ জানান, পানির অভাবে ধান চিটা হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। এখন চারদিকে রিং টাইপ গর্ত করে পানি দিতে পারলে ভালো। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বালাইনাশক পানিতে মিশিয়ে পরিমাণমতো গাছের পাতায় ছিটানো গেলে কিছুটা হলেও রক্ষা মিলবে বলে তারা ধারণা দিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

পানির অভাব আর তপ্তখরায় কৃষকদের ফসল পুরে স্বপ্ন ধূসর!

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:৩৩:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
বিপ্লব সাহা, খুলনা ব্যুরো:   ঋতু গণনা অনুসারে বৈশাখের মাঝামাঝি গৃস্ম মৌসুম চলছে সাথে অন্যতম মৌসুম ফল  আম, কাঁঠাল ও লিচুর মৌসুম। মাঠে মাঠে দুলছে পরিপুষ্ট ধান। এমন সুসময়ে কৃষকের কপালে চিন্তারেখা এঁকে দিয়েছে প্রবল গরম।
মাথার ওপর গনগনে সূর্য প্রকৃতির বুকে যেন আগুন ঢালছে। সকাল থেকেই তপ্ত থাকছে ফসলের মাঠ। খরার কারণে আম-লিচুর গুটি শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ায় কোথাও কোথাও নলকূপেও উঠছে না পানি। ধানের এ সময়টাতে জমিতে পানি থাকতেই হয়। গাছের গোড়া শুকিয়ে গেলে আর্দ্রতার অভাবে ধান চিটা হওয়ার শঙ্কা থাকে।
এবিষয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার দীর্ঘ খরায় হুমকির মুখে পড়তে পারে ফসল উৎপাদন। এতে করে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই হবে   দক্ষিণের কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলেই ধানে চিটা হতে পারে।
সেখানে এবার তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় ধানে ফুল অবস্থায় পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধানগাছের গোড়ায় পানি ধরে রাখা দরকার। সেটা সম্ভব না হলে জমি অবশ্যই ভেজা থাকতে হবে। এ পরিস্থিতিতে তাদের পরামর্শ হলো, ধান, আম, লিচু, কাঁঠাল, জাম, জামরুলসহ ফল গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিশ্চিত করা গেলে রোদের তাপ বাড়লেও ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না।
এ ছাড়া বেগুন, টমেটো, মরিচ, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, পটোল, শসা ও ঢ্যাঁড়স ক্ষেতে তিন-চার দিন অন্তর সেচ দিতে হবে। পাতা জাতীয় সবজি যেমন ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, কলমি ও লাউশাক ক্ষেতে দু-তিন দিন অন্তর সেচ দেওয়া প্রয়োজন।
দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃতির বৈরী আচরণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। আমন ধান সম্পূর্ণ বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় সম্পূরক সেচ দিয়ে এ ধানের ফলন ভালো হবে না। ফলে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা করছেন কৃষক। সড়কের দু’পাশে বিস্তীর্ণ জমিতে ধান ও নানা ফসলের মাঠ। এ অঞ্চলে এখন ভুট্টা চাষের চাহিদা বেড়েছে। সড়কের পাশে শত শত বিঘা জমিতে দেখা মিলল ভুট্টার ক্ষেত। তবে তীব্র গরম ও রোদের কারণে এখানকার অনেক জমিই ঝলছে গেছে। পরিপক্ব হওয়ার আগেই পুড়ে গেছে গাছের পাতা ও ফল।
বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ভুট্টার ক্ষেতের সামনে অপলক দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক আক্কাস আলী বলেন, এনজিও সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় ফসল রোপণ করেছি। খরায় সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। মাটিতে রস নেই, বৃষ্টিও হচ্ছে না। সেজন্য গাছ থেকে ভুট্টা পড়ে যাচ্ছে। সেচে পানি দিলে এক নিমেষেই মাটি শুষে নেয়। গাছের কোনো উন্নতি হয় না। পাশের সবজি ক্ষেতের কৃষক হারেজ বলেন, যে ওষুধ দিচ্ছি, তাতে কাজ হচ্ছে না। ৫০টা বেগুন হলে এর মধ্যে ৪৫টাতেই পোকা। সেচের পানি মাটি ধরে রাখতে পারছে না। তীব্র তাপদাহে সবজি, ভুট্টাসহ অন্য ফসলি জমিতে ঘন ঘন সেচ দিতে গিয়ে খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। পোড়ামাকড়ও বেড়েছে আগের চেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে আমাদের দিশেহারা অবস্থা।
বটিয়াঘাটা এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আগে বৈশাখের শুরুতে ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি হতো। এখন বর্ষায়ও আশানুরূপ বৃষ্টি হয় না। আমাদের মতো ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া অতিরিক্ত টাকা খরচ করে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করা কঠিন।
একই সাথে কৃষক আবুল হোসেন জানান, শরীর ঘামছে সব সময়, কাজ করতে গেলে শরীর দুর্বল লাগে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বৃষ্টি না হলে খরা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। এখানকার মাটি আঠালো। পানির অভাবে মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে।
এদিকে খরায় খুলনার দক্ষিণ অঞ্চলের  বেশির ভাগ নদী শুকিয়ে গেছে।তবে এ ব্যাপারে একজন বিজ্ঞ পরিবেশবিদ জানান,খুলনা  বিভাগের প্রায় সব নদনদীই এখন পানি স্বল্পতায় ভুগছে  আগে এসব নদীতে চাহিদা অনুরূপ  পানি থাকত।তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে  নদনদীর পানির প্রবাহ এখন নেই বললেই চলে। অথচ এসব নদীর ওপর ভরসা করেই চলে অনেক কৃষকের জীবন-জীবিকা।
এদিকে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে বৃষ্টি একেবারেই অপ্রতুল। তবে এবারও বৈশাখের শুরু থেকে চোখ রাঙাচ্ছে সূর্য। তাপমাত্রা ওঠানামা করছে ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। এতে মাঠে ফসল ফলানো নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষক।
আরো একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ জানান, পানির অভাবে ধান চিটা হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। এখন চারদিকে রিং টাইপ গর্ত করে পানি দিতে পারলে ভালো। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বালাইনাশক পানিতে মিশিয়ে পরিমাণমতো গাছের পাতায় ছিটানো গেলে কিছুটা হলেও রক্ষা মিলবে বলে তারা ধারণা দিয়েছে।