ভোটের বছরে স্তব্ধ সংস্কৃতি
মধুসূদনের জন্মদিনে প্রশ্নের মুখে রাষ্ট্র

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৬:৩৪:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৮৯ বার পঠিত

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।। নির্বাচনের বছর এলেই রাষ্ট্র যেন এক ধরনের একমুখী ব্যস্ততায় ডুবে যায়। প্রশাসনের প্রায় সব শক্তি তখন নিবদ্ধ থাকে ভোট, নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা আর ক্ষমতার হিসাব–নিকাশে। এই ব্যস্ততার ভিড়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে নীরবে পিছিয়ে পড়ে, সেটি হলো সংস্কৃতি। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মজয়ন্তীতে ঐতিহ্যবাহী মধুমেলা স্থগিত হওয়ার ঘটনাটি সেই নীরব উপেক্ষারই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। এটি কেবল একটি মেলা না হওয়ার খবর নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে শুধু একজন কবি নন, তিনি একটি চিন্তার মোড় ঘোরানো নাম। তিনি এসেছিলেন ভাঙতে—ছন্দ ভেঙেছেন, ভাষার প্রচলিত কাঠামো ভেঙেছেন, ভেঙেছেন সমাজ ও নৈতিকতার আরামদায়ক ব্যাখ্যাগুলো। অমিত্রাক্ষর ছন্দের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন, বাংলা ভাষাও আধুনিক হতে পারে, প্রতিবাদী হতে পারে। তাঁর সাহিত্য ছিল প্রশ্নমুখর, অনেক সময় অস্বস্তিকর, কিন্তু গভীরভাবে সত্যের সন্ধানী। সমাজ, ধর্ম ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক কণ্ঠস্বর।
এই কবির জন্মভিটা সাগরদাঁড়ি তাই নিছক একটি গ্রাম নয়। এটি বাংলা সাহিত্য ও মননের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বছরের পর বছর ধরে সেখানেই মধুমেলা হয়ে উঠেছিল সাহিত্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের এক বিরল মিলনক্ষেত্র। কবিতা সেখানে শুধু মঞ্চের বিষয় ছিল না; তা মিশে যেত গ্রামের মানুষের জীবনের সঙ্গে। গবেষণা আর লোকজ সংস্কৃতি একই জায়গায় এসে দাঁড়াত। মধুমেলা প্রমাণ করেছিল, সাহিত্য যদি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, তবে তা উৎসবে পরিণত হয়।
কিন্তু এবছর সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে মধুমেলা আয়োজন করা হচ্ছে না—এমন সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যাযোগ্য হলেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি ক্ষতি। নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। সরকার বদলায়, প্রশাসনিক ব্যস্ততাও বদলায়। কিন্তু সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়লে তার প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যায়। বারবার যদি এমন বার্তা দেওয়া হয় যে নির্বাচন এলেই সংস্কৃতি অপেক্ষমাণ হয়ে পড়বে, তাহলে একসময় সংস্কৃতি নিজেই গৌণ হয়ে যায়।
একদিনের সংক্ষিপ্ত কর্মসূচির মাধ্যমে মহাকবির জন্মজয়ন্তী পালনের সিদ্ধান্ত দায়িত্ব পালনের একটি ন্যূনতম প্রয়াস মাত্র। ফুল দেওয়া, আলোচনা সভা আর কয়েকটি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একজন কবিকে স্মরণ করা যায়, কিন্তু তাঁকে উপলব্ধি করা যায় না। মাইকেল মধুসূদন দত্তকে স্মরণ করার অর্থ তাঁর প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে আনা—আমাদের সমাজ, আমাদের ভাষা, আমাদের মানসিকতার ভেতরে সেই প্রশ্নগুলো এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক, তা ভেবে দেখা। একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সেই গভীরতা পাওয়া কঠিন।
মধুমেলা না হওয়ার আরেকটি দিক প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। এই মেলা ছিল কেবল সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি ছিল স্থানীয় মানুষের জীবিকার একটি অংশ। সাগরদাঁড়ি ও আশপাশের এলাকার অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পী, দিনমজুর ও পরিবহন শ্রমিক বছরের এই সময়টির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। মেলা মানে ছিল কাজ, আয়, জীবনযাত্রার একটু স্বস্তি। সংস্কৃতি এখানে সৌন্দর্যের পাশাপাশি অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিল। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা মানে সংস্কৃতির সামাজিক ভিত্তিকেও দুর্বল করা।
সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর ক্ষতিটি পড়ে তরুণ প্রজন্মের ওপর। মধুমেলা ছিল এমন একটি জায়গা, যেখানে পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে জানা যেত। নাটক, গান, কবিতা পাঠ, আলোচনা—এসবের মধ্য দিয়ে কবি হয়ে উঠতেন জীবন্ত। একদিনের সংক্ষিপ্ত আয়োজন সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে না। ফলে কবি থেকে যান পরীক্ষার খাতার উত্তর বা জন্মতারিখের তথ্য হয়ে, চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে নয়।
এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা কি এখনও সংস্কৃতিকে গৌণ বিষয় হিসেবেই দেখছি? নির্বাচন এলেই কি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংকুচিত হয়ে যাবে? মাইকেল মধুসূদন দত্ত কোনো দল বা সরকারের সম্পদ নন। তিনি এই সমাজের, এই ভাষার উত্তরাধিকার। তাঁকে স্মরণ করা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, দায়িত্ব।
তবু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আশা থাকে। একদিনের অনুষ্ঠান যদি আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যদি সেখানে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে, যদি কবির জীবন ও চিন্তাকে আজকের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে সেই একদিনও মূল্য পেতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা—শুধু নিয়মরক্ষার আয়োজন নয়।
মধুমেলা হয়তো এবছর হচ্ছে না। কপোতাক্ষের তীরে হয়তো উৎসবের আলো জ্বলবে না। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়—আমরা কি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে কেবল স্মরণ করছি, নাকি তাঁর উত্তরাধিকার বহন করছি? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে, সংস্কৃতি আমাদের কাছে কেবল আয়োজন, নাকি সত্যিকারের চেতনা।
লেখক : জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।



















