ঢাকা, বাংলাদেশ। , সোমবার, ১১ মে ২০২৬

মাদক ও বিলাসপণ্যের চোরাচালান বেড়েছে ভয়াবহভাবে — মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

 মোঃ শাহ্ আলম, ঝিনাইগাতী, শেরপুর প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:৪৮:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১১৬ বার পঠিত

শেরপুর জেলার গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তাঞ্চলে ভয়াবহ আকারে বেড়ে গেছে ভারতীয় পণ্য ও মাদক চোরাচালান। প্রতিদিনই সীমান্ত পেরিয়ে আসছে কোটি কোটি টাকার পণ্য— যার মধ্যে রয়েছে ফেনসিডিল, মদ, ইয়াবা, কম্বল, শাড়ি, থ্রি-পিস, চিনি, গরুর মাংস, জিরা, এলাচ ও মোবাইল সরঞ্জামসহ নানা বিলাসপণ্য। বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও চোরাকারবারিদের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিজিবির তথ্য: ৯ মাসে জব্দ ৮০ কোটি টাকার পণ্য। ৩৯ বিজিবি ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের একাধিক সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গারো পাহাড় সীমান্ত এলাকা থেকে অন্তত ৮০ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে মদ, চিনি ও পোশাকজাত পণ্য। বিজিবি জানিয়েছে, এই সময়কালে বিভিন্ন অভিযানে একাধিক গাড়ি, নৌযান এবং স্থানীয় বাহক গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২৫ সেপ্টেম্বরের অভিযানে ৫০ লাখ টাকার পণ্য জব্দ। সবশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিজিবির একটি বিশেষ অভিযানে ঝিনাইগাতীর ফাকরাবাদ ও হালুয়াঘাটের নামছাপাড়া ও ডুমনিকুড়া সীমান্ত থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে ছিল ৩৮৮ বোতল মদ, ২ হাজার ১৬০ প্যাকেট বিস্কুট, ৮০ প্যাকেট ফুচকা, ২ হাজার ৮৩০টি নেভিয়া সফট ক্রিম এবং ১ লাখ ৩০ হাজার জিলেট ব্লেড। এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে, আতঙ্কে সীমান্তবাসী।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, মাঝে মাঝে কয়েকজন ছোটখাটো বাহক বা দালাল ধরা পড়লেও আসল চক্রের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত এসব সিন্ডিকেটের প্রভাবে সীমান্ত এলাকায় বেড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্র। গত কয়েক মাসে এ নিয়ে প্রতিবেদন করায় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন বলেও জানা গেছে।

ভৌগোলিক অবস্থান চোরাচালানের বড় কারণ । শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্ত মেঘালয় রাজ্যের সংলগ্ন। বিস্তীর্ণ পাহাড়ি বনাঞ্চল আর শতাধিক অরক্ষিত গলিপথের কারণে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, একসময় সীমান্ত দিয়ে শুধু গরু ও মদ আসত, কিন্তু এখন প্রতিদিনই প্রবেশ করছে কোটি টাকার বিলাসপণ্য ও মাদক।

বিজিবির কঠোর অবস্থান । ৩৯ বিজিবি ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদি হাসান বলেন, “চোরাকারবারিরা একবার ধরা পড়লেও দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজে যুক্ত হচ্ছে। দ্রুত ধনী হওয়ার লোভে অনেকে এই অবৈধ ব্যবসায় জড়াচ্ছে। আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি, তবে সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতায় এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।”

প্রশাসনের নজরদারি বাড়ছে । ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চোরাচালান প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, “প্রতিটি সভায় বিজিবিকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভারতীয় পণ্য আটক ও তৎপরতার পর্যালোচনা নিয়মিতভাবে করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে

স্থানীয়দের দাবি ও বিশ্লেষণ । স্থানীয়দের মতে, শুধু বিজিবির অভিযান নয় — প্রশাসন, পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত পদক্ষেপ ছাড়া সীমান্তের চোরাচালান বন্ধ সম্ভব নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর সীমান্তের গারো পাহাড় এখন মাদক ও বিলাসপণ্যের নতুন করিডোরে পরিণত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের সামাজিক কাঠামোর জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

মাদক ও বিলাসপণ্যের চোরাচালান বেড়েছে ভয়াবহভাবে — মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:৪৮:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫

শেরপুর জেলার গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তাঞ্চলে ভয়াবহ আকারে বেড়ে গেছে ভারতীয় পণ্য ও মাদক চোরাচালান। প্রতিদিনই সীমান্ত পেরিয়ে আসছে কোটি কোটি টাকার পণ্য— যার মধ্যে রয়েছে ফেনসিডিল, মদ, ইয়াবা, কম্বল, শাড়ি, থ্রি-পিস, চিনি, গরুর মাংস, জিরা, এলাচ ও মোবাইল সরঞ্জামসহ নানা বিলাসপণ্য। বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও চোরাকারবারিদের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিজিবির তথ্য: ৯ মাসে জব্দ ৮০ কোটি টাকার পণ্য। ৩৯ বিজিবি ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের একাধিক সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গারো পাহাড় সীমান্ত এলাকা থেকে অন্তত ৮০ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে মদ, চিনি ও পোশাকজাত পণ্য। বিজিবি জানিয়েছে, এই সময়কালে বিভিন্ন অভিযানে একাধিক গাড়ি, নৌযান এবং স্থানীয় বাহক গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২৫ সেপ্টেম্বরের অভিযানে ৫০ লাখ টাকার পণ্য জব্দ। সবশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিজিবির একটি বিশেষ অভিযানে ঝিনাইগাতীর ফাকরাবাদ ও হালুয়াঘাটের নামছাপাড়া ও ডুমনিকুড়া সীমান্ত থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে ছিল ৩৮৮ বোতল মদ, ২ হাজার ১৬০ প্যাকেট বিস্কুট, ৮০ প্যাকেট ফুচকা, ২ হাজার ৮৩০টি নেভিয়া সফট ক্রিম এবং ১ লাখ ৩০ হাজার জিলেট ব্লেড। এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে, আতঙ্কে সীমান্তবাসী।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, মাঝে মাঝে কয়েকজন ছোটখাটো বাহক বা দালাল ধরা পড়লেও আসল চক্রের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত এসব সিন্ডিকেটের প্রভাবে সীমান্ত এলাকায় বেড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্র। গত কয়েক মাসে এ নিয়ে প্রতিবেদন করায় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন বলেও জানা গেছে।

ভৌগোলিক অবস্থান চোরাচালানের বড় কারণ । শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্ত মেঘালয় রাজ্যের সংলগ্ন। বিস্তীর্ণ পাহাড়ি বনাঞ্চল আর শতাধিক অরক্ষিত গলিপথের কারণে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, একসময় সীমান্ত দিয়ে শুধু গরু ও মদ আসত, কিন্তু এখন প্রতিদিনই প্রবেশ করছে কোটি টাকার বিলাসপণ্য ও মাদক।

বিজিবির কঠোর অবস্থান । ৩৯ বিজিবি ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদি হাসান বলেন, “চোরাকারবারিরা একবার ধরা পড়লেও দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজে যুক্ত হচ্ছে। দ্রুত ধনী হওয়ার লোভে অনেকে এই অবৈধ ব্যবসায় জড়াচ্ছে। আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি, তবে সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতায় এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।”

প্রশাসনের নজরদারি বাড়ছে । ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চোরাচালান প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, “প্রতিটি সভায় বিজিবিকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভারতীয় পণ্য আটক ও তৎপরতার পর্যালোচনা নিয়মিতভাবে করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে

স্থানীয়দের দাবি ও বিশ্লেষণ । স্থানীয়দের মতে, শুধু বিজিবির অভিযান নয় — প্রশাসন, পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত পদক্ষেপ ছাড়া সীমান্তের চোরাচালান বন্ধ সম্ভব নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর সীমান্তের গারো পাহাড় এখন মাদক ও বিলাসপণ্যের নতুন করিডোরে পরিণত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের সামাজিক কাঠামোর জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।