বিপ্লব সাহা, খুলনা
গেল কয়েক বছর সহ এ বছরও ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে মৎস্য চাষীরা হাজার হাজার ঘের ডুবে পানির নিচে ফলে কয়েকশো কোটি টাকার মাছ চাষ করেও অধিক বৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে মাছ ভেসে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দক্ষিণ বাংলার মৎস্য শিল্প ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে এখানকার ঘের ব্যবসায়ীরা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গুলো মধ্যে রয়েছে বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মোংলা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, চুকনগর, রামপাল, রুপসা,তেরোখাদা সহ চার জেলায় প্রায় ৫ হাজারের অধিক মৎস্য চাষিরা ঘের প্রকল্পের মাধ্যমে পানির সোনা চিংড়ি মাছ উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব খাতে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করে দিতে সক্ষম হয়। আর দক্ষিণ বাংলার উল্লেখযোগ্য চিংড়ি মাছের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চার জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে হাজারের উর্ধ্বে সি ফুড কোম্পানি যেখানে বিভিন্ন এলাকার ঘের থেকে চিংড়ি মাছ এনে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এতে লাভবান হয় স্থানীয় ঘের ব্যবসায়ী সহ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের রাজস্ব খাত। তবে চলতি বছর মুনাফার পরিবর্তে দেশের প্রান্তিক মৎস্য চাষী সহ ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হবে প্রায় হাজার কোটি টাকার ঊর্ধ্বে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খুলনা বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
এ সময় তিনি আরো বলেন বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক বেসামাল অবলীলায় ঋতু বৈচিত্র্যের পট পাল্টিয়ে সময় ছেড়ে অসময়ে বিক্ষিপ্ত রূপ ধারণ করে চলতি বছর আবহাওয়ার বৈষম্য নীতির কারনে নদীগুলোতে জলোচ্ছ্বাস ভেরিবাঁধ ভাঙ্গন সহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের তিস্তা ব্যারেজের বাধসহ অধিকাংশ সময় ফারাক্কার সব কয়টি গেট উন্মুক্ত করে দেওয়ার কারণে উজানের পানি ধেয়ে এসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের ১৯ টি জেলাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে প্রায় অর্ধ কোটির বেশি মানুষ। যার কারনে নদীতে অধিক জলোচ্ছ্বাস বৃদ্ধি পেলে উজানে ধেয়ে আসা পানির স্রোতে ভেসে যায় ঘরবাড়ি সহ গবাদিপশু সাথে রেহাই পায় না রবি শস্য। তবে এবছর ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টির প্রভাব না থাকলেও দাকোপ, কয়রা, বেদকাশী, সহ বেশ কিছু স্পর্শকাতর এলাকার ভেরি বাঁধ ভেঙে খুলনা সহ আশেপাশে জেলাগুলোর নদীতে বিপদ সীমানার উপর দিয়ে পানি বয়ে যাওয়ার কারণে লোকালয় পানি ঢুকে ঘের প্লাবিত হয়ে মৎস্য চাষীদের স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারণে বিনিয়োগকৃত পুঁজি হারানোর শঙ্কায় মৎস্য চাষিরা। খুলনা জেলা ডুমুরিয়া উপজেলার বিল ডাকাতিয়া এলাকার মৎস্য চাষি মিজানুর রহমান বলেন আমি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে চিংড়ির ঘের করেছিলাম কিন্তু সম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে মাছে ভাইরাস লেগে অনেক ক্ষতি হয়েছে । তিনি আরো বলেন প্রতিবছরই ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়ে ঘের ভেসে মাছ বেরিয়ে নিয়ে যায় সেই কারণে এ বছর আগে থেকেই দেড় লাখ টাকা খরচ করে ঘেরের আইল উঁচু করেছি। তারপরও ভাইরাসের হাত থেকে রেহাই পায়নি আমার সাড়ে তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ওইবিলের আর একঘের মালিক আসলাম শেখ বলেন গত বছর আমার ৪ বিঘার চিংড়িঘের পানিতে তলিয়ে আমার বড় ক্ষতি হয়েছিল এবারও পারমিশূন্যতা ভাইরাসের কারণে গেল বছরের ন্যয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তাছাড়া আশেপাশের অনেকে চিংড়ি সহ অন্যান্য মাছের ঘেরে ক্ষতি হয়ে তারা সর্বশ্রান্ত হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে খাল গুলোর খনন না করায় বিলের পানি ঠিকমতো নিষ্কাশিত হতে পারে না। শুধু এই দুই জনই নয় সাম্প্রতিক পাইকগাছার ভেড়ি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে প্রায় আড়াই হাজার চিংড়িঘের ভেসে গিয়ে ঘের থেকে মাছ বেরিয়ে গেছে । ফলে বিপুল অংকের আর্থিক লোকসানের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছে চাষিরা।
পাশাপাশি পাইকগাছা উপজেলার কালিনগর গ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেড়িবাদ ভেঙ্গে ১৩ টি গ্রামের চিংড়িঘের তলিয়ে গেছে। খুলনা জেলার মৎস্যকর্মকর্তা জয়দেব পাল জানান পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া উপজেলা ১৩ শত ৪৬ হেক্টর আয়তনের ২০০ টি চিংড়িঘের এবং ৭৫৪ হেক্টর আয়তনের ৪৬৫ টি পুকুরদিঘী ও খামার ভেসে গেছে। ঘের ও খামার থেকে আনুমানিক ৬৭২ মেট্রিক টন চিংড়ি বেরিয়ে গেছে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। চাষিরা জানান বেশ কয়েকটি নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় চাষিরা অনেক ঘেরে লবণ পানি তুলতে পারছে না অনেকে স্বেচ্ছায় চিংড়ি চাষ ছেড়ে অন্যান্য ফসল চাষ করছেন। অপরদিকে পুজিসঙ্কটে ভাইরাস ও দাবাডোহে চিংড়ির মড়কের কারণে অনেকে চিংড়ি চাষ ছেড়ে দিয়েছেন। এছাড়া চিংড়ি ঘেরের বেশ কিছু জমিতে ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে।তার ওপর এবারের বিপর্যয়ের কারণে চলতি অর্থ বছরে চিংড়ির উৎপাদন কমে যাবে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে খুলনায় বাগদা ও গলদা চিংড়ির ঘের কমেছে চার হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমিতে।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিস সূত্রে জানা গেছে খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা থেকে ২০২২ -২৩ অর্থ বছরে হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানি হয় ২৮ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন। যা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় ২ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা।২০২৩ -২৪ অর্থবছরের রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ১৯৬ মেট্রিক টনে। যা থেকে আয় হয় ২ হাজাা ১৯৬ কোটি টাকা । সে লক্ষ্যে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ১৯৬ মেট্রিক টনে। যা থেকে আয় হয় ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মাছ রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৩ হাজার ১২০ মেট্রিক টন এবং আয় কমেছে ৬৭৭ কোটি টাকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানির পরিমাণ কম হওয়ার আশঙ্কাতো রয়েছেই পাশাপাশি ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা লোকসান হবে বলে জানিয়েছেন চিংড়ি চাষী ও রপ্তানিকারকরা

নাগরিক ডেস্ক রিপোর্ট 



















