ঢাকা, বাংলাদেশ || রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220
৩১ লাখ টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ

৭ ঘণ্টা থানায় আটকে রাখার দাবি ব্যবসায়ীর, সংবাদ সম্মেলনে নানা অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী:    রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের দোকানঘর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ৩১ লাখ টাকা জামানত ফেরত না দেওয়া, নির্মাণকাজে নিজের অর্থ ব্যয় করে আরও ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০ টাকা পাওনা থাকা, দোকান দখলের চেষ্টা, মালামাল সরিয়ে নেওয়া ও চুরির অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম। একই সঙ্গে অভিযোগের প্রতিকার চাইতে গিয়ে মোহনপুর থানায় তাকে প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন মোহনপুর উপজেলার বেলনা গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে তিনি লিখিত বক্তব্যে কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন এবং পাওনা অর্থ ফেরতসহ একাধিক দাবির কথা জানান।
লিখিত বক্তব্যে নজরুল ইসলাম বলেন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের একাধিক দোকানঘর নেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তিপত্র ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে তিনি মোট ৩১ লাখ টাকা জামানত হিসেবে প্রদান করেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তিনি দোকানগুলো ছেড়ে দিয়ে জামানতের অর্থ ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
এ বিষয়ে ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের কাছে লিখিতভাবে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়ার আবেদন করেন বলে জানান তিনি। কিন্তু আবেদন করার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তার পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন এই ব্যবসায়ী।
তার দাবি, জামানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করা হয়। পাওনা অর্থের জন্য তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান।
নির্মাণকাজে নিজের অর্থ ব্যয়ের দাবি
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের অসমাপ্ত দোকানঘর এবং মসজিদের দেয়াল নির্মাণের কাজে প্রধান শিক্ষকের মৌখিক নির্দেশে তিনি নিজের অর্থ ব্যয় করেন। এসব কাজ সম্পন্ন করতে তার মোট ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০ টাকা খরচ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার অভিযোগ, ওই অর্থ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করলেও পরবর্তীতে তাকে তা পরিশোধ করা হয়নি। ফলে ৩১ লাখ টাকা জামানতের পাশাপাশি নির্মাণকাজে ব্যয় করা অর্থও তার কাছে পাওনা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্ট্যাম্প জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন নজরুল ইসলাম। তার দাবি, প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে থাকা লোকজন ওই স্ট্যাম্পটি তার কাছ থেকে জোরপূর্বক নিয়ে যায়।
সাব-লেট দেওয়া দোকান দখলের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম জানান, তিনি বাবুল নামে এক ব্যক্তির কাছে একটি দোকানঘর সাব-লেট দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওই দোকানঘরকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম ও বাবুলের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে দোকানটি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, একপর্যায়ে দোকানে থাকা মালামাল বাইরে বের করে দেওয়া হয় এবং সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। এর কয়েকদিন পর রাতের আঁধারে দোকানের ভেতরে থাকা কয়েক লাখ টাকা মূল্যের মেশিনারি ও অন্যান্য মালামাল চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নজরুল ইসলাম বলেন, এসব ঘটনায় তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দোকান দখল, মালামাল সরিয়ে নেওয়া এবং চুরির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানান তিনি।
পানি ঢুকে ১১ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ার দাবি
মার্কেটের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ড দোকানে বর্ষার সময় পানি ঢুকে যেত। কয়েকটি বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবেশের কারণে তার প্রায় ১১ লাখ টাকার ব্যবসায়িক মালামাল নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, মার্কেটের পানি নিষ্কাশন ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো যথাযথভাবে সমাধান করা হয়নি। ফলে বারবার পানি ঢুকে তার ব্যবসায়িক পণ্য নষ্ট হয়েছে এবং তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আদালতে মামলা করার পরও সমাধান হয়নি
প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগে তিনি আদালতে মামলা করেছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান নজরুল ইসলাম।
তার দাবি, মামলা চলার সময় প্রধান শিক্ষক তার পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দেন। ওই আশ্বাসে বিশ্বাস করে তিনি মামলাটি আর এগিয়ে নেননি। পরবর্তীতে আদালতে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
নজরুল ইসলামের অভিযোগ, মামলা খারিজ হওয়ার পর প্রধান শিক্ষক তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়ন করেননি। বরং এরপর থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা শুরু হয় বলে দাবি করেন তিনি।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
নিজের পাওনা অর্থ ও ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধানের জন্য স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানান নজরুল ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তিনি একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে গিয়েছেন। কিন্তু তার অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধান না করে কেউ কেউ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়ে তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
মোহনপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম মোহনপুর থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, নিজের পাওনা টাকা ও দোকান সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য তিনি মোহনপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি প্রত্যাশিত আইনি সহায়তা পাননি।
তার অভিযোগ, মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কোনো অপরাধ না করা সত্ত্বেও তাকে প্রায় সাত ঘণ্টা থানায় আটকে রাখা হয়।
নজরুল ইসলাম আরও দাবি করেন, ওই সময় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। চুক্তিপত্রের অনুলিপি চাইতে গেলে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, কথিত মারধরের ঘটনার ভিডিও ও ছবি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রয়োজন হলে তিনি এসব ছবি ও ভিডিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবেন বলে জানান।
পাঁচ দফা দাবি ব্যবসায়ীর
সংবাদ সম্মেলনে নিজের অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন মো. নজরুল ইসলাম।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. দোকানঘরের বিপরীতে দেওয়া ৩১ লাখ টাকা জামানত এবং মার্কেট ও মসজিদের নির্মাণকাজে ব্যয় করা ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০ টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
২. রাতের আঁধারে দোকান দখলের চেষ্টা, মালামাল সরিয়ে নেওয়া, চুরির অভিযোগ ও মারধরের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. তাকে প্রায় সাত ঘণ্টা থানায় আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করে মোহনপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. আন্ডারগ্রাউন্ড দোকানে পানি ঢুকে প্রায় ১১ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।
৫. হিসাব-নিকাশ ও পাওনা অর্থ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুলিশি হয়রানি এবং জোরপূর্বক দোকান দখলের চেষ্টা বন্ধে তাকে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা দেওয়া।
এ ছাড়া নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পাওনা অর্থ উদ্ধারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রাজশাহী জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন নজরুল ইসলাম।
অভিযোগ অস্বীকার প্রধান শিক্ষকের
ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলামের অভিযোগের বিষয়ে কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
প্রধান শিক্ষক বলেন, “দোকান ছেড়ে দিলে আমি জামানত ফেরত দেব।”
নজরুল ইসলামের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়েও তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেন। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বসা হলেও তিনি তাদের প্রস্তাবিত মীমাংসা মেনে নেননি।
অন্যদিকে নজরুল ইসলাম তার অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, পাওনা অর্থ ফেরত, ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রতিকার এবং কথিত পুলিশি হয়রানির বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয়

দুই ইউনিয়নে দায়িত্বে এক সচিব, সিডিউল না থাকায় নাগরিক সেবায় ভোগান্তি

20 September 2026

মাধবপুর জুনিয়র ক্লাব ডে নাইট প্রাইজ মানি ফুটবল টুর্ণামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত

বিস্তারিত লিংক কমেন্টে |
nagorikbhabna.com
nagorikbhabna

৩১ লাখ টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ

৭ ঘণ্টা থানায় আটকে রাখার দাবি ব্যবসায়ীর, সংবাদ সম্মেলনে নানা অভিযোগ

সর্বশেষ পরিমার্জন : ০৩:১০:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী:    রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের দোকানঘর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ৩১ লাখ টাকা জামানত ফেরত না দেওয়া, নির্মাণকাজে নিজের অর্থ ব্যয় করে আরও ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০ টাকা পাওনা থাকা, দোকান দখলের চেষ্টা, মালামাল সরিয়ে নেওয়া ও চুরির অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম। একই সঙ্গে অভিযোগের প্রতিকার চাইতে গিয়ে মোহনপুর থানায় তাকে প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন মোহনপুর উপজেলার বেলনা গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে তিনি লিখিত বক্তব্যে কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন এবং পাওনা অর্থ ফেরতসহ একাধিক দাবির কথা জানান।
লিখিত বক্তব্যে নজরুল ইসলাম বলেন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের একাধিক দোকানঘর নেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তিপত্র ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে তিনি মোট ৩১ লাখ টাকা জামানত হিসেবে প্রদান করেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তিনি দোকানগুলো ছেড়ে দিয়ে জামানতের অর্থ ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
এ বিষয়ে ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের কাছে লিখিতভাবে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়ার আবেদন করেন বলে জানান তিনি। কিন্তু আবেদন করার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তার পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন এই ব্যবসায়ী।
তার দাবি, জামানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করা হয়। পাওনা অর্থের জন্য তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান।
নির্মাণকাজে নিজের অর্থ ব্যয়ের দাবি
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের অসমাপ্ত দোকানঘর এবং মসজিদের দেয়াল নির্মাণের কাজে প্রধান শিক্ষকের মৌখিক নির্দেশে তিনি নিজের অর্থ ব্যয় করেন। এসব কাজ সম্পন্ন করতে তার মোট ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০ টাকা খরচ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার অভিযোগ, ওই অর্থ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করলেও পরবর্তীতে তাকে তা পরিশোধ করা হয়নি। ফলে ৩১ লাখ টাকা জামানতের পাশাপাশি নির্মাণকাজে ব্যয় করা অর্থও তার কাছে পাওনা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্ট্যাম্প জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন নজরুল ইসলাম। তার দাবি, প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে থাকা লোকজন ওই স্ট্যাম্পটি তার কাছ থেকে জোরপূর্বক নিয়ে যায়।
সাব-লেট দেওয়া দোকান দখলের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম জানান, তিনি বাবুল নামে এক ব্যক্তির কাছে একটি দোকানঘর সাব-লেট দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওই দোকানঘরকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম ও বাবুলের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে দোকানটি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, একপর্যায়ে দোকানে থাকা মালামাল বাইরে বের করে দেওয়া হয় এবং সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। এর কয়েকদিন পর রাতের আঁধারে দোকানের ভেতরে থাকা কয়েক লাখ টাকা মূল্যের মেশিনারি ও অন্যান্য মালামাল চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নজরুল ইসলাম বলেন, এসব ঘটনায় তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দোকান দখল, মালামাল সরিয়ে নেওয়া এবং চুরির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানান তিনি।
পানি ঢুকে ১১ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ার দাবি
মার্কেটের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ড দোকানে বর্ষার সময় পানি ঢুকে যেত। কয়েকটি বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবেশের কারণে তার প্রায় ১১ লাখ টাকার ব্যবসায়িক মালামাল নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, মার্কেটের পানি নিষ্কাশন ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো যথাযথভাবে সমাধান করা হয়নি। ফলে বারবার পানি ঢুকে তার ব্যবসায়িক পণ্য নষ্ট হয়েছে এবং তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আদালতে মামলা করার পরও সমাধান হয়নি
প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগে তিনি আদালতে মামলা করেছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান নজরুল ইসলাম।
তার দাবি, মামলা চলার সময় প্রধান শিক্ষক তার পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দেন। ওই আশ্বাসে বিশ্বাস করে তিনি মামলাটি আর এগিয়ে নেননি। পরবর্তীতে আদালতে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
নজরুল ইসলামের অভিযোগ, মামলা খারিজ হওয়ার পর প্রধান শিক্ষক তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়ন করেননি। বরং এরপর থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা শুরু হয় বলে দাবি করেন তিনি।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
নিজের পাওনা অর্থ ও ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধানের জন্য স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানান নজরুল ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তিনি একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে গিয়েছেন। কিন্তু তার অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধান না করে কেউ কেউ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়ে তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
মোহনপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম মোহনপুর থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, নিজের পাওনা টাকা ও দোকান সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য তিনি মোহনপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি প্রত্যাশিত আইনি সহায়তা পাননি।
তার অভিযোগ, মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কোনো অপরাধ না করা সত্ত্বেও তাকে প্রায় সাত ঘণ্টা থানায় আটকে রাখা হয়।
নজরুল ইসলাম আরও দাবি করেন, ওই সময় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। চুক্তিপত্রের অনুলিপি চাইতে গেলে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, কথিত মারধরের ঘটনার ভিডিও ও ছবি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রয়োজন হলে তিনি এসব ছবি ও ভিডিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবেন বলে জানান।
পাঁচ দফা দাবি ব্যবসায়ীর
সংবাদ সম্মেলনে নিজের অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন মো. নজরুল ইসলাম।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. দোকানঘরের বিপরীতে দেওয়া ৩১ লাখ টাকা জামানত এবং মার্কেট ও মসজিদের নির্মাণকাজে ব্যয় করা ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০ টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
২. রাতের আঁধারে দোকান দখলের চেষ্টা, মালামাল সরিয়ে নেওয়া, চুরির অভিযোগ ও মারধরের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. তাকে প্রায় সাত ঘণ্টা থানায় আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করে মোহনপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. আন্ডারগ্রাউন্ড দোকানে পানি ঢুকে প্রায় ১১ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।
৫. হিসাব-নিকাশ ও পাওনা অর্থ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুলিশি হয়রানি এবং জোরপূর্বক দোকান দখলের চেষ্টা বন্ধে তাকে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা দেওয়া।
এ ছাড়া নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পাওনা অর্থ উদ্ধারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রাজশাহী জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন নজরুল ইসলাম।
অভিযোগ অস্বীকার প্রধান শিক্ষকের
ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলামের অভিযোগের বিষয়ে কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
প্রধান শিক্ষক বলেন, “দোকান ছেড়ে দিলে আমি জামানত ফেরত দেব।”
নজরুল ইসলামের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়েও তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেন। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বসা হলেও তিনি তাদের প্রস্তাবিত মীমাংসা মেনে নেননি।
অন্যদিকে নজরুল ইসলাম তার অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, পাওনা অর্থ ফেরত, ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রতিকার এবং কথিত পুলিশি হয়রানির বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

Share this news as a Photo Card