ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্প বিপর্যস্ত : অর্ধশত পরিবার মানবেতর জীবন যাপন

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:০৫:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৫
- / ১০৩ বার পঠিত

শীতলপাটি বাংলার সুপ্রাচীর এক কুটিরশিল্প। আমাদের সভ্যতা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অংশ। গ্রামে এর কদর যুগ যুগ ধরে। গ্রীষ্মকালে শীতল পরশের জন্য বেড়ে যায় এর কদর। তাই মানুষের ঘরেও শোভা পায় শীতলপাটি। তবে বড় সংবাদ হলো, বাংলাদেশের শীতল পাটি এখন বিশ^ ঐতিহ্যেরও অংশ। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিক এ স্বীকৃতির ঘোষণা দেয়। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠে বর্ণিল ফুল, ফল, পশুপাখি, প্রিয়জনের অবয়ব, এমনকি জ্যামিতিক নকশাও। শীতলপাটির নকশায় জায়নামাজে ব্যবহৃত হয়েছে মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
শীতলপাটি ঘিরে যুগে যুগে কত গান, কাব্য রচিত হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আগের দিনে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন কাঁথা বা তোশকের ওপর মিহি বেতের নকশি করা এক ধরনের পাটি ব্যবহার হতো, তাতে গা এলিয়ে দিলে শরীর বা মনে শীতল পরশ অনুভূত হতো। তাই বোধ হয়, নাম দেওয়া হয়েছিল শীতলপাটি। এর পাশাপাশি বর্ণিল নকশা সবাইকে মুগ্ধ করে। কিন্ত শীতল পাটির কদর না থাকলেও পূর্ব পুরুষের পেশা ধরে রাখতে ব্যতিক্রম কিছু করার চিন্তা করলেন স্থানীয় কারিগররা। এ পাটি দিয়ে তৈরি করছেন গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত নানান উপকরণ। বর্তমানে রুচি সম্মত এ পাটি দিয়ে পাখির বাসা, টিস্যু বক্স, পেন্সিল বক্স, বাতির শেট, ডাইনিং টেবিলের ম্যাট, কার্পেটের বদলে নকশী মাদুর, স্যুটকেস, ব্যাগ, কলমদানি, ট্রে, ওয়ালম্যাট ইত্যাদি নানা সাজ-সজ্জার উপকরণ তৈরি করে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে শতশত মানুষের। হারাতে বসা এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারি সহায়তায় বেকার নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ পেশা টিকিয়ে রাখা সম্ভব এ দাবি পেশায় জরিতদের।
যে শীতল পাটির হিম পরশে এক সময় শরীর জুড়াত আধুনিকতায়র ছোঁয়ায় সে শীতল পাটি আজ বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে এর বিকল্প ব্যবহার করে এ পাটি দিয়ে গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত নানান উপকরণ তৈরি করে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে কয়েশ পরিবার। সে শীতল পাটির ভরা মৌসুম চলার সময় কারিগররা আর্থিক অনটন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও পাটি শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণের দুষ্প্রাপ্যতা, ক্রেতা সল্পতার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাপ-দাদার এ ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা এখন হুমকির মুখে। এরপরও এ আদি শিল্প সুবিদপুর গ্রামের মানুষ আঁকড়ে ধরে আছে। বছর জুরে কি খাবে কিভাবে পরিবার, পরিজনদের নিয়ে সংসার চালাবে তা ভেবে পারছেন না পাটি শিল্পের সাথে জড়িত অর্ধশত পরিবার। আর্থিক সহায়তা না পেলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে শিল্পটি এবং ৫০টি পরিবারের ২শাতাধিক লোক বেকার হয়ে পড়বে।
শীতল পাটি গ্রাম বাংলার একটি ঐতীহ্যবাহী শিল্প। এক সময় বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এর ব্যবহার ছিল। বাঙালি সংস্কৃতির এ চিরায়ত শিল্পটির কথা বার বার উঠে এসেছে ইতিহাসে। নানান সমস্যায় পড়ে শীতল পাটির খ্যাতি আজ বিলুপ্তির পথে। অথচ এই শিল্পের সম্ভাবনাময় বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিলুপ্ত প্রায় শিল্পটির পৃষ্টপোষকতা করা হলে এ পাটি শিল্প থেকে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। সাথে সাথে দেশের বেকারদের একটি অংশ কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পাবে।
বছরের অর্ধেকটা সময় বিশেষ করে গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমের সময় বাংলাদেশের অনেক মানুষেরই শরীর জুড়ায় একটু শীতল পাটির ছোঁয়ায়। গরম মৌসুম এলেই এই শীতল পাটির কদর বেড়ে যায়। আর এই শীতল পাটির জন্য বিখ্যাত জেলার কাউখালীর সুবিতপুর গ্রাম। সরজমিনে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সুবিদপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের কর্মব্যস্তার শেষ নেই। কেউ উঠানে বসে পাটি বুুনছে, কেউ পাইত্রা কাটছে, আবার কেউবা পাইত্রা গাছের বেত ছড়াচ্ছেন। প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও ঘরে সমান তালে পাটি বুননের কাজ চলছে দিন-রাত।
কিন্তু সাহায্য সহযোগিতা আর পৃষ্টপোষকতার অভাবে গ্রামের প্রায় ৫০ টি পরিবার চরম দুরদিনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাজার উর্ধগতি আর শীতল পাটির ন্যায্য মূল্যের অভাবে পূর্ব পুরুষদের কাজটি ধরে রাখতে পারছেন না। শীতল পাটির তৈরির একমাত্র কাচামাল হচ্ছে পাইত্রা নামক এক জাতীয় গাছ। এই গ্রামে এক সময় প্রায় ৮০-৯০ একর পাইত্রা বন ছিল। এই পাইত্রা বনের মালিক ছিল সুবিদপুর গ্রামের ৪০/৪৫ টি পাটিকর পরিবার। আজ সময়ের আবর্তনে অভাবের তারনায় ও ভূস্বামীদের কলকাঠিতে পাইত্রা বন বিক্রি করতে হয়েছে। আজ তারা নিস্ব অসহায়। এক সময় পরিবারের শিশু কিশোর বৃদ্ধ বৃদ্ধা সহ সবাই সম্মিলিতভাবে পাটি বুননের কাজ করতেন। পাটি শিল্পটি হল জড়িত পরিবার গুলোর আয়ের একমাত্র উৎস। বছরের পর বছর ধরে এ কাজ করে যাওয়া পরিবার গুলো বেশ কিছুদিন যাবৎ মারত্মক সমস্যায় পড়েছে। পাইত্রা বন একদম কমে গেছে। সে বনে এখন ঘর বাড়ি বা অন্য জমি অন্য কিছুর চাষাবাদ চলছে। ফলে পর্যাপ্ত পাইত্রা না পাওয়ার কারনে পেশাটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পূর্বে এক পন পাইত্রা ৫০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন সেই পাইত্রা পন বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকায়।
শীতল পাটির যে সকল শিল্পিরা তাদের পেশাটিকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এদেরই একজন সজল দে, সে বংশ পমামপরায় তৈরি করছেন শীতল পাটি। বাবার কাছেই তার হাতেখড়ি। এক সময় এক একটি পাটি বিক্রি করতে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সে শীতল পাটি আজ বিলুপ্তির পথে। কিন্ত শীতল পাটির কদর না থাকলেও পূর্ব পুরুষের পেশা ধরে রাখতে চিন্তা করলেন ব্যতিক্রম কিছু করার। সেই থেকে তার পথচলা শুরু। সজল এ পাটি দিয়ে তৈরি করছেন গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত নানান উপকরণ তৈরি করে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে শতশত মানুষের। পাটি কারিগর দিপালী রানী, তার পরিবার বহু বছর ধরে বংশানুক্রমে এ পেশাটি চলে আসছে। তিনি খুব ছোট বেলা থেকে এ পেশার সাথে জড়িত আছে। তার পরিবারের সকল সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি পাটি তৈরি করতে কমপক্ষে ৫-৬ দিন সময় লাগে। তাদের তৈরি পাটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যায়। একটি শীতল পাটি ১ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করেন। কিন্তু পাইত্রার আকার চুম্বি দামের কারনে এখন আর ভাল ব্যবসা হয় না।
জমা সব টাকাই পাইত্রা কিনতে চলে যায়। মাসে আয় হয় মাত্র ৫-৬ হাজার টাকা। সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয় দিপালী রানীকে। কারিগর অনিল চন্দ্র পাটিকর জানান, পাটি তৈরি করে যা আয় করি তা দিয়ে সংসার চালাতে খুবই কষ্টসাধ্য। আরতি রানী পাটিকর জানান, শিশু বয়স থেকেই এ কাজ করে আসছি। বাবার সংসারেও এ কাজ করতাম। আবার স্বামীর সংসারে এসেও এ কাজ করছি। কিন্তু বর্তমানে আমরা বড় সমস্যার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আগে পাইত্রার কোন জোড়া না দিয়েই একটি ৫-৬ হাঁত পাটি তৈরি করতাম। কিন্তু এখন ভাল লম্বা পাইত্রার অভাবে পাইত্রা জোড়া দিয়ে পাটি তৈরি করতে হয়। আর এজন্য পাটির ভাল দাম পাই না। আগে নিজেদের পাইত্রার জমি ছিল। এখন আর তা নেই। অভাবের তারনায় পাইত্রা জমি বিক্রি দিয়েছি। পাইত্রা বাহির থেকে কিনে ভাল ব্যবসা করতে পারি না।
সময়ের আবর্তনে এই সুবিতপুর গ্রামের পাটি শিল্পের বয়স অনেক হয়েছে। নামকরন হয়েছে পাটিপাড়া বা পাটিকর গ্রাম সুবিদপুর। ১৯৭০ সালে সম্মিলিত সবার প্রচেষ্টায় গঠিত হয়েছে সুবিদপুর শিতলপাটি সমবায় সমিতি। এই সমিতির মাধ্যমে পার্টিকরকে যে সংখ্যক কিস্তিতে ঋণসম্পৃর্ণ পরিশোধযোগ্য দেয়া কোন প্রতিষ্ঠান বা সরকার এবং সরকারি সহায়তায় বেকার নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরো পৃষ্টপোষকতা করে তবে এই শিল্পটি আরো উজ্জল সম্ভাবনাময় হতে পারে। অর্জিত হতে পারে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
এ ব্যাপারে কাউখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এস. এম আহসান কবীর জানান, সুবিদপুরে গ্রামে শতাধিক পরিবার শীতল পাটি বুননের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তিনি বলেন, শীতল পাটির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সরকার যদি ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করেণ তাহলে তারা হারাণো ঐতিহ্যকে আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। কাউখালী সদর ইউনিয়ন সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুর রসিদ মিল্টন জানান, এই শিল্পকে বহির্বিশ্বের দরবারে আরো ব্যপক পরিচিতির লক্ষে রাজধানী ঢাকা শহরে একটি শো-রুম করা প্রয়োজন। এতে এই শিল্পে আরো ব্যপক পরিচিতি লাভ করবে, আর এ থেকে বছরে আয় কয়েক কোটি টাকা তিনি মনে করেন।
এ শিল্পের সাথে জরিত কয়েকশ পরিবার শীতলপাটি সহ তৈরি করছে গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত নানান উপকরণ। যা ইতিমধ্যে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছে। এশিল্প টিকিয়ে রাখতে এ পেশায় জড়িতদের প্রশিক্ষন ও সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার আশ্বাস বিসিকের।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন বিসিক পিরোজপুর কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এইচ এম ফাইজুর রহমান জানান, এ পেশায় জরিত শতাধীক পরিবার শীতলপাটি ছাড়াও পাটি দিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ আইটেমের শোপিস তৈরি করেণ।






















