আল–জাজিরায় সাক্ষাৎকার
হরমুজ প্রণালি ও ইরানে শাসক পরিবর্তন নিয়ে মুখ খুললেন মার্কো রুবিও

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:৫৯:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
- / ১৩৯ বার পঠিত

নাগরিক ভাবনা অনলাইন ডেস্ক : মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে। তবে তেহরান নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটন সেখানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রুবিও। গত সোমবার (৩০ মার্চ, ২৬ইং) রুবিও সতর্ক করে আরও বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে হোক’ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হবে এবং ‘কয়েক মাসের মধ্যে নয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে’ যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে তাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করবে।
রুবিও আরও বলেন, সুযোগ সৃষ্টি হলে ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে স্বাগত জানাবে যুক্তরাষ্ট্র, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য নয়। যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানানো ন্যাটো মিত্রদেরও সমালোচনা করেছেন রুবিও। ওয়াশিংটন ঘনিষ্ঠভাবে কিউবা ও ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি।
আল–জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে রুবিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও বক্তব্য পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো—
‘ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে’
রুবিও বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করতে হবে এবং এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বন্ধ করতে হবে, যেগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য হুমকি হতে পারে। ইসরায়েলপন্থী রুবিও জোর দিয়ে আরও বলেন, ‘ইরান সরকার কখনো পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করছে। তাঁর দাবি, ‘তারা যে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করছে, তার একমাত্র লক্ষ্য হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনকে আক্রমণ করা।’
আরব দেশগুলোর কথা বললেও সাক্ষাৎকারে কৌশলে ইসরায়েলের নাম এড়িয়ে যান রুবিও। অথচ এই ইসরায়েল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলায় প্রভাবিত করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে আলোচনা চলছে।
রুবিও বলেন, ইরান বেসামরিক কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে। তবে এমনভাবে নয়, যা দেশটিকে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সুযোগ দেবে।
রুবিওর এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান উল্টো প্রশ্ন করেন, কবে ইরান এ অঞ্চলের জন্য আক্রমণের হুমকি হয়ে উঠেছিল?
হাসান বলেন, ‘গত তিন শতাব্দীর মধ্যে ইরান কবে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করেছে? এখন কেন তারা এমন করছে? কারণ, একটি অসম যুদ্ধে তারা দুর্বল প্রতিপক্ষ। তাই নিজেকে রক্ষা করতে তারা এ যুদ্ধের বিস্তার ঘটাচ্ছে।’
যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হবে উল্লেখ করে রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের দাবি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যা–ই করুক, এই জলপথ খোলা থাকবে।
রুবিও বলেন, ‘কেবল আমরা নয়, বিশ্বের কেউ–ই হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি মেনে নেবে না। এটি একটি অদ্ভুত নজির স্থাপন করবে…বিভিন্ন দেশ এখন আন্তর্জাতিক জলপথ দখল করে তা নিজেদের বলে দাবি করবে। হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে…এটি যেকোনো মূল্যে খোলা থাকবে।’
ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অধিকাংশ আলোচনা পরোক্ষভাবে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলছে; আলোচনা যে চলছে, সে বিষয়টি জোর দিয়ে বলেছেন রুবিও।
রুবিও বলেন, প্রাথমিকভাবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের ভেতরের কিছু পক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং কিছু সরাসরি আলোচনা চলছে। ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট সব সময় কূটনীতি পছন্দ করেন, সব সময় একটি সমাধান চান’, যোগ করেন রুবিও।
রুবিও যখন আলোচনা চলার কথা বলছেন, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ভাষা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প বলেছেন, শিগগিরই যুদ্ধবিরতি না হলে তিনি ‘ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস’ করবেন।
কয়েক মাসে নয়, কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ হবে উল্লেখ করে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দ্রুত এগোচ্ছে। এ যুদ্ধে ওয়াশিংটন যে সামরিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করার চেষ্টা করছে, তা ব্যাখ্যা করেন তিনি।
রুবিও বলেন, ‘লক্ষ্যগুলো হলো তাদের বিমানবাহিনী ধ্বংস করা, যা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে। তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা, যা অনেকটাই অর্জিত হয়েছে।’
রুবিও আরও বলেন, ‘তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যন্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেছে…এবং আমরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনকারী কারখানাগুলোও ধ্বংস করতে যাচ্ছি। আমরা ঠিক সময়ে বা সময়ের আগেই এগোচ্ছি। আমরা কয়েক মাসের মধ্যে নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এগুলো অর্জন করব। এটি কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার। আমি ঠিক কত সপ্তাহ হবে বলব না, তবে এটি কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার, মাসের নয়।’
আল–জাজিরা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সম্পর্কে রুবিওকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান পরিষ্কার নয়, তাঁর অবস্থান এখনো অজানা বা অস্পষ্ট।
রুবিও বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না, তিনি ক্ষমতায় আছেন কি না। এটুকু জানি, তারা দাবি করে, তিনি ক্ষমতায় আছেন। কেউ তাঁকে দেখেনি। কেউ তাঁর কোনো বক্তব্য শোনেনি। এখন পরিস্থিতি খুবই অস্পষ্ট। ইরানের ভেতরে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে স্বাগত জানাবে যুক্তরাষ্ট্র, তবে এটি তাদের সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য নয়। রুবিও বলেন, ‘আমরা সব সময় এমন একটি পরিস্থিতিকে স্বাগত জানাব, যেখানে ইরানের লোকজন এমন নেতৃত্বে থাকবে, যাঁরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। ইরানি জনগণ আরও ভালো নেতৃত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে।’
যদি দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়, যুক্তরাষ্ট্র এতে ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক বলেও রুবিও ইঙ্গিত দেন।
রুবিও বলেন, ‘একে সহজতর করতে যদি আমাদের কিছু করার সুযোগ থাকে, আমরা তা করতে ইচ্ছুক হব, অবশ্যই হব।’
তবে রুবিও যতই দাবি করেন, তাদের লক্ষ্য ইরানে সরকার পরিবর্তন নয়; বিশ্লেষকরা তাঁর সঙ্গে একমত হতে পারছেন না। ইরানে সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে বলেই তাঁদের মনে হচ্ছে। কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রাভ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘মূলত সরকার উৎখাত করাই তাদের লক্ষ্য ছিল; নিজেদের সে অবস্থান থেকে তারা ধীরে ধীরে সরে গেছে।’
এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘এখন আমরা দেখতে পাই, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বলছেন, তিনি এমন কিছু অংশের সঙ্গে আলোচনা করছেন, যাঁরা একটি নতুন সরকারের অংশ হতে পারে। আদতে সেখানে অনেক বিভ্রান্তি আছে, কিন্তু এটি এখন আর প্রধান লক্ষ্য নয়। এটি এমন কিছু নয়, যা তারা স্পষ্টভাবে ঘোষণা বা প্রকাশ করছে।’
-সূত্র: আল জাজিরা























