ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তাজা খবর
ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন
১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর
ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
বৃষ্টিতে পানির নিচে পেঁয়াজ: কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা
হরমুজ প্রণালি ও ইরানে শাসক পরিবর্তন নিয়ে মুখ খুললেন মার্কো রুবিও
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার
মাদারীপুরে যুবলীগ নেতার রমরমা বালু ব্যবসা
প্রশাসনের নীরবতায় ঝুঁকির মুখে শত কোটি টাকার সেতু

গাউছ-উর রহমান, মাদারীপুর
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৭:৩১:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫
- / ৯৬ বার পঠিত

মাদারীপুর সদর উপজেলার হবিগঞ্জ সেতুর মাত্র ৫০ মিটার দূরেই রমরমা বালু ব্যবসা করছে বাহাদুরপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও ওয়ার্ড মেম্বার শফিকুল বেপারী দেদুল। সেতুর কিছুটা দূরে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে সেতুর সঙ্গেই দুটো বেজ নির্মাণ করে বালুর ব্যবসা করে যাচ্ছেন। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন রমরমা ব্যবসা করলেও অজ্ঞাত কারণে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ফলে নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দিতে পারে। বালু ব্যবসার কারনে শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি ঝুকির মুখে রয়েছে বলে মনে করছোন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হবিগঞ্জ সেতুর পূর্ব পাশ সংলগ্ন বালু রাখার জন্যে বড় আকারের দুটো বেজ নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে বাল্কহেডের মাধ্যমে আনলোড করা হচ্ছে। যে স্থানে বালু জমানো হচ্ছে, তার মাত্র ৫০ ফুট দূরেই রয়েছে শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি। ফলে বালু উত্তোলন ও আনলোডের কারণে বড় বড় ঢেউয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে নদীর পিলারের স্থানে। একের পর এক বাল্কহেড বালু নিয়ে আসছে, তা ফেলে আবারো যাচ্ছে। অন্যদিকে সেই বালু পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় টাকার বিনিময়ে ভরাট করছে। এমনই হুলুস্থুল কাণ্ড দেখা যাচ্ছে গত দুই মাস ধরে।
স্থানীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সেতুর সঙ্গে বালু স্তূপ করা বেজ দুটো বছর দুই আগেও নিয়ন্ত্রণ ছিল মাদারীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের সভাপতি ও বাহাদুরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন সেলিম ও তার ছেলে সৈয়দ রাজিবের। তারা এই স্থানে বালুর স্তূপ করে রমরমা ব্যবসা করতেন। এদের স্থানীয়ভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন দক্ষিণ বিরাঙ্গল গ্রামের ফজলুল হক বেপারীর ছেলে ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি শফিকুল বেপার দেদুল। যিনি বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার। এরা মিলেই বালুর অবৈধ ব্যবসা করে আসছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পরে আত্মগোপনে চলে যান সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন সেলিম ও তার ছেলে সৈয়দ রাজিব। এরপরে বেশ কিছু দিন বালু ব্যবসা বন্ধ ছিল। কিন্তু গত দুই মাস ধরে পুনরায় ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেয় শফিকুর বেপারী দেদুল। তার নিয়ন্ত্রণেই চলছে ব্যবসা। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আরও কয়েকজন স্থানীয় লোক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের মামুন নামে এক ব্যক্তির ড্রেজার দিয়ে আড়িয়াল খাঁ নদের অন্তত পাঁচটি স্থান থেকে দিন-রাত বালু উত্তোলন করা হয়। আর সেই বালু ফেলা হচ্ছে দেদুলের বেজে। পরে এসব বালু রাতের আঁধারে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। অবৈধভাবে উত্তোলন করা এসব বালু বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বালু পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রাক্টরও। ফলে ভেঙে যাচ্ছে চলাচলের রাস্তা। অন্যদিকে সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিন সেতু দিয়ে হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করায় স্থানটি সকলেই চোখে পড়ছে। কিন্তু এরপরেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, দেদুল মেম্বার এতোটাই প্রভাবশালী যে, তার উপরে কেউ কথা বলতে ভয় পায়। কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা করা হয়। সপ্তাহখানের আগে দক্ষিণ বিরাঙ্গল গ্রামের ইঞ্জিল হকের ছেলে লিয়াকত এতে প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করে দেদুলের লোকজন। ফলে অন্যরা কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। অলিখিত এলাকার ত্রাস দেদুল মেম্বার।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, ইতোমধ্যে দেদুলের মাধ্যমের দক্ষিণ বিরাঙ্গল গ্রামের ফারুক মাতুব্বর, মিজান মাতুব্বর, সেলিম বেপারী, মনির বেপারী, বিল্লাল সরদার, মুকাই হোসেনসহ অন্তত ১৫ থেকে ২০ জনের বাড়িতে লাখ লাখ টাকার বালু বিক্রি করেছে দেদুল সিন্ডিকেট। ফলে এর একটি অংশ প্রশাসনের দায়িত্বশীলদেরও দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও জেলা ও উপজেলা প্রশাসন মাঝে মাঝে অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীদের জরিমানা করছেন। কিন্তু তারপরেও এসব অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনুচ্ছিক এক ব্যক্তি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলেও ছাত্রলীগ যুবলীগের নেতারা বালুর ব্যবসা করতো, এখনো তারাই কৌশলে বালুর ব্যবসা করছে। এখন আর আগের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়। বরং এখন প্রশাসন ম্যানেজ করেই তারা কাজ করতে পারছে। বালু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম কমে নাই বরং আগের চেয়ে বাড়ছে।’
এলজিইডির অর্থায়নে প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে আড়িয়াল খাঁ নদের উপর হবিগঞ্জ ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। যার অন্তত দুই হাজার মিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন করার নিয়ম নেই। কিন্তু ব্রিজের মাত্র ৫০০ মিটার দূরেই অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ব্রিজেরও ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুললেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান। তিনি বলেন, ‘নিয়ম হলো সেতুর অন্তত দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মিটার দূরে নদীর পলি অপসারণ করার। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করায় সেতুর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রশাসনের ব্যবস্থা নেয়া খুবই জরুরি। না হলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুর ক্ষতি হবে।’
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাবাব ওয়াদিয়া বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এখন যেহেতু জেনেছি, খুবই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া আমরা প্রায় প্রতিনিয়ত অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বালু ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা করছি। আশা রাখি, এসবও বন্ধ করা হবে।’
অভিযোগের বিষয় শফিকুল বেপারী দেদুলের বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি। মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা দিয়েও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।


















