ঢাকা, বাংলাদেশ। , বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
তাজা খবর
মেধার স্বাক্ষরে দেশসেরা মনিরামপুরের সুরাইয়া ও অরিত্র ব্যারিস্টার জাইমা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করেছেন মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস ২০২৬: টেকসই ভবিষ্যতের জন্য ভূমি সুরক্ষা জরুরি

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:৩৯:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • / ২২ বার পঠিত
বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস ২০২৬: টেকসই ভবিষ্যতের জন্য ভূমি সুরক্ষা জরুরি
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস।  জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো খরা, ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে মানবজীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশকে প্রভাবিত করছে, তাতে এ দিবসের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব, খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো ভূমি। অথচ আজ সেই ভূমিই বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। বন উজাড়, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ ভূমি তার উৎপাদনক্ষমতা হারাচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।
খরা ও মরুকরণ কী?
খরা হলো দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের কারণে পানি সংকট সৃষ্টি হওয়া। অন্যদিকে মরুকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে উর্বর ভূমি ধীরে ধীরে তার উৎপাদনক্ষমতা হারিয়ে অনুর্বর হয়ে পড়ে।
মরুকরণ বলতে কেবল মরুভূমির বিস্তারকে বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে—
* মাটির উর্বরতা হ্রাস
* কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া
* বন ও উদ্ভিদ ধ্বংস হওয়া
* জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়
* পানির উৎস সংকুচিত হওয়া
* পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
অতএব, মরুকরণ একটি পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, যা সরাসরি মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বৈশ্বিক বাস্তবতা ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে অবক্ষয়ের শিকার। এর ফলে প্রায় ৩.২ বিলিয়ন মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি হেক্টর ভূমি উৎপাদনক্ষমতা হারাচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বে ব্যবহৃত মিঠা পানির প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষি খাতে ব্যয় হয়। ফলে খরা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি খাত।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে খরার সংখ্যা ও তীব্রতা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের বহু অঞ্চল আরও শুষ্ক হয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কোটি কোটি মানুষ পরিবেশগত কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে খরা ও মরুকরণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য এবং অভিবাসন সংকটের সঙ্গেও জড়িত।
জলবায়ু পরিবর্তন ও খরার সম্পর্ক
বর্তমানে খরা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। নদী, খাল ও জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যেতে শুরু করে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং পানির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও খরার সম্মিলিত প্রভাবে জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
খরা ও মরুকরণের প্রধান কারণ
খরা ও মরুকরণের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
১. জলবায়ু পরিবর্তন
বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটছে এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২. বন উজাড়
গাছ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে ভূমি দ্রুত অনুর্বর হয়ে পড়ে।
৩. অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন
অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে অনেক এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
৪. অপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থা
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ ভূমির গুণগত মান কমিয়ে দেয়।
৫. নগরায়ণ ও শিল্পায়ন
কৃষিজমি ও জলাভূমি ভরাট করে শিল্প ও আবাসন নির্মাণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশকে সাধারণত বন্যাপ্রবণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও খরার ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর অঞ্চলে মৌসুমি খরা এখন একটি বড় বাস্তবতা।
বারিন্দ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ এবং সেচনির্ভর কৃষি এ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। অনেক এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের অতিরিক্ত সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খরাপ্রবণ এলাকার পরিধি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব
খরা ও মরুকরণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর।
* ফসলের ফলন কমে যায়।
* সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
* খাদ্যশস্যের দাম বাড়ে।
* দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যপ্রাপ্তি কমে যায়।
* অপুষ্টির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।বিশ্বের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ভূমির উৎপাদনক্ষমতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনৈতিক ক্ষতি
ভূমি অবক্ষয় ও খরার কারণে প্রতিবছর বিশ্ব অর্থনীতি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
এর ফলে—
* কৃষকের আয় কমে যায়।
* কৃষিভিত্তিক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
* কর্মসংস্থান হ্রাস পায়।
* দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পায়।
* খাদ্য আমদানির ব্যয় বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে এসব প্রভাব আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক প্রভাব
খরা ও মরুকরণ জনস্বাস্থ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
* বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।
* পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
* তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়।
* অপুষ্টি ও খাদ্যঘাটতি দেখা দেয়।
* মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়।
জীবিকার সংকটে অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়। ফলে নগর এলাকায় জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পায় এবং নতুন সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
ভূমি অবক্ষয়ের কারণে—
* বনভূমি সংকুচিত হয়।
* বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়।
* মাটির জৈব উপাদান কমে যায়।
* কার্বন শোষণের ক্ষমতা হ্রাস পায়।
* পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়।
ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ত্বরান্বিত হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) ও ভূমি সুরক্ষা
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো ভূমি অবক্ষয় রোধ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে SDG-15 “Life on Land” ভূমি, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
ভূমি রক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব
খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা—
* বৃক্ষরোপণে অংশগ্রহণ করতে পারে।
* পানি অপচয় রোধে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে।
* পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে।
* প্লাস্টিক দূষণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
* পরিবেশবান্ধব জীবনধারা অনুসরণ করতে পারে।
করণীয়
খরা ও মরুকরণ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
১. ব্যাপক বৃক্ষরোপণ
* দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো।
* বন উজাড় বন্ধ করা।
* সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ করা।
২. টেকসই কৃষি
* কম পানি প্রয়োজন হয় এমন ফসল চাষ।
* জৈব কৃষির প্রসার।
* ফসল চক্র অনুসরণ।
* আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার।
৩. পানি সংরক্ষণ
* বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ।
* খাল-বিল ও জলাধার পুনরুদ্ধার।
* ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ।
৪. ভূমি ব্যবস্থাপনা
* কৃষিজমি সংরক্ষণ।
* পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা।
* অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধ করা।
৫. জনসচেতনতা বৃদ্ধি
পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা।
গণমাধ্যমে প্রচারণা বৃদ্ধি।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
ইসলাম ও পরিবেশ সংরক্ষণ
ইসলাম পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বৃক্ষরোপণকে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পানি অপচয় না করা, প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ভূমি, বন ও পানি রক্ষা করা শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়; এটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভূমি ও পানি সম্পদ সীমাহীন নয়। আজকের অবহেলা আগামী দিনের ভয়াবহ সংকটের কারণ হতে পারে। খরা ও মরুকরণ মোকাবিলায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষক, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, টেকসই কৃষি, পানি সংরক্ষণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা একটি সবুজ, উর্বর ও বাসযোগ্য পৃথিবী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারি। ভূমি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আর মানুষ বাঁচলেই টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।
লেখক : জনস্বাস্থ্য গবেষক ও পরিবেশবিষয়ক কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস ২০২৬: টেকসই ভবিষ্যতের জন্য ভূমি সুরক্ষা জরুরি

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:৩৯:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস ২০২৬: টেকসই ভবিষ্যতের জন্য ভূমি সুরক্ষা জরুরি
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস।  জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো খরা, ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে মানবজীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশকে প্রভাবিত করছে, তাতে এ দিবসের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব, খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো ভূমি। অথচ আজ সেই ভূমিই বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। বন উজাড়, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ ভূমি তার উৎপাদনক্ষমতা হারাচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।
খরা ও মরুকরণ কী?
খরা হলো দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের কারণে পানি সংকট সৃষ্টি হওয়া। অন্যদিকে মরুকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে উর্বর ভূমি ধীরে ধীরে তার উৎপাদনক্ষমতা হারিয়ে অনুর্বর হয়ে পড়ে।
মরুকরণ বলতে কেবল মরুভূমির বিস্তারকে বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে—
* মাটির উর্বরতা হ্রাস
* কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া
* বন ও উদ্ভিদ ধ্বংস হওয়া
* জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়
* পানির উৎস সংকুচিত হওয়া
* পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
অতএব, মরুকরণ একটি পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, যা সরাসরি মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বৈশ্বিক বাস্তবতা ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে অবক্ষয়ের শিকার। এর ফলে প্রায় ৩.২ বিলিয়ন মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি হেক্টর ভূমি উৎপাদনক্ষমতা হারাচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বে ব্যবহৃত মিঠা পানির প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষি খাতে ব্যয় হয়। ফলে খরা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি খাত।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে খরার সংখ্যা ও তীব্রতা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের বহু অঞ্চল আরও শুষ্ক হয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কোটি কোটি মানুষ পরিবেশগত কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে খরা ও মরুকরণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য এবং অভিবাসন সংকটের সঙ্গেও জড়িত।
জলবায়ু পরিবর্তন ও খরার সম্পর্ক
বর্তমানে খরা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। নদী, খাল ও জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যেতে শুরু করে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং পানির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও খরার সম্মিলিত প্রভাবে জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
খরা ও মরুকরণের প্রধান কারণ
খরা ও মরুকরণের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
১. জলবায়ু পরিবর্তন
বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটছে এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২. বন উজাড়
গাছ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে ভূমি দ্রুত অনুর্বর হয়ে পড়ে।
৩. অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন
অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে অনেক এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
৪. অপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থা
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ ভূমির গুণগত মান কমিয়ে দেয়।
৫. নগরায়ণ ও শিল্পায়ন
কৃষিজমি ও জলাভূমি ভরাট করে শিল্প ও আবাসন নির্মাণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশকে সাধারণত বন্যাপ্রবণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও খরার ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর অঞ্চলে মৌসুমি খরা এখন একটি বড় বাস্তবতা।
বারিন্দ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ এবং সেচনির্ভর কৃষি এ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। অনেক এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের অতিরিক্ত সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খরাপ্রবণ এলাকার পরিধি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব
খরা ও মরুকরণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর।
* ফসলের ফলন কমে যায়।
* সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
* খাদ্যশস্যের দাম বাড়ে।
* দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যপ্রাপ্তি কমে যায়।
* অপুষ্টির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।বিশ্বের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ভূমির উৎপাদনক্ষমতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনৈতিক ক্ষতি
ভূমি অবক্ষয় ও খরার কারণে প্রতিবছর বিশ্ব অর্থনীতি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
এর ফলে—
* কৃষকের আয় কমে যায়।
* কৃষিভিত্তিক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
* কর্মসংস্থান হ্রাস পায়।
* দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পায়।
* খাদ্য আমদানির ব্যয় বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে এসব প্রভাব আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক প্রভাব
খরা ও মরুকরণ জনস্বাস্থ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
* বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।
* পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
* তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়।
* অপুষ্টি ও খাদ্যঘাটতি দেখা দেয়।
* মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়।
জীবিকার সংকটে অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়। ফলে নগর এলাকায় জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পায় এবং নতুন সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
ভূমি অবক্ষয়ের কারণে—
* বনভূমি সংকুচিত হয়।
* বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়।
* মাটির জৈব উপাদান কমে যায়।
* কার্বন শোষণের ক্ষমতা হ্রাস পায়।
* পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়।
ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ত্বরান্বিত হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) ও ভূমি সুরক্ষা
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো ভূমি অবক্ষয় রোধ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে SDG-15 “Life on Land” ভূমি, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
ভূমি রক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব
খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা—
* বৃক্ষরোপণে অংশগ্রহণ করতে পারে।
* পানি অপচয় রোধে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে।
* পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে।
* প্লাস্টিক দূষণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
* পরিবেশবান্ধব জীবনধারা অনুসরণ করতে পারে।
করণীয়
খরা ও মরুকরণ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
১. ব্যাপক বৃক্ষরোপণ
* দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো।
* বন উজাড় বন্ধ করা।
* সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ করা।
২. টেকসই কৃষি
* কম পানি প্রয়োজন হয় এমন ফসল চাষ।
* জৈব কৃষির প্রসার।
* ফসল চক্র অনুসরণ।
* আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার।
৩. পানি সংরক্ষণ
* বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ।
* খাল-বিল ও জলাধার পুনরুদ্ধার।
* ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ।
৪. ভূমি ব্যবস্থাপনা
* কৃষিজমি সংরক্ষণ।
* পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা।
* অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধ করা।
৫. জনসচেতনতা বৃদ্ধি
পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা।
গণমাধ্যমে প্রচারণা বৃদ্ধি।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
ইসলাম ও পরিবেশ সংরক্ষণ
ইসলাম পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বৃক্ষরোপণকে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পানি অপচয় না করা, প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ভূমি, বন ও পানি রক্ষা করা শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়; এটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভূমি ও পানি সম্পদ সীমাহীন নয়। আজকের অবহেলা আগামী দিনের ভয়াবহ সংকটের কারণ হতে পারে। খরা ও মরুকরণ মোকাবিলায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষক, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, টেকসই কৃষি, পানি সংরক্ষণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা একটি সবুজ, উর্বর ও বাসযোগ্য পৃথিবী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারি। ভূমি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আর মানুষ বাঁচলেই টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।
লেখক : জনস্বাস্থ্য গবেষক ও পরিবেশবিষয়ক কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি