ঢাকা, বাংলাদেশ || শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞপ্তি :
পত্রিকা প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন: 09649-230220

জাতীয় দৈনিকের দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়—সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে থাকা

সাইমুম রেজা পিয়াস : একটি সংবাদপত্রের প্রথম পরিচয় তার ছাপা অক্ষরে নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ আমাদের চোখের সামনে আসে। কোনোটি রাজনীতির, কোনোটি অর্থনীতির, কোনোটি মানুষের জীবন-জীবিকার; কোথাও উন্নয়নের গল্প, কোথাও অনিয়মের অভিযোগ, আবার কোথাও নিভৃতে ঘটে যাওয়া এমন কোনো ঘটনা, যার প্রভাব হয়তো একটি পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজে পৌঁছে যায়। কিন্তু সব সংবাদ প্রকাশ করাই একটি জাতীয় দৈনিকের পূর্ণ দায়িত্ব নয়। তার চেয়েও বড় দায়িত্ব হলো—কোন সংবাদ মানুষের জানা প্রয়োজন, কোন তথ্য যাচাই করা জরুরি এবং কোন বিষয়ে জনস্বার্থের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া দরকার, তা নির্ধারণ করা।

গণমাধ্যমকে প্রায়ই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কথাটি শুধু প্রচলিত কোনো উপমা নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর সামাজিক দায়িত্ব। আইনসভা আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্র পরিচালনা করে, বিচার বিভাগ ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করে—আর গণমাধ্যম নাগরিকের জানার অধিকারকে সামনে রেখে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের কার্যক্রমকে প্রশ্নের মুখে আনে। এই প্রশ্ন তোলা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়; বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
একটি জাতীয় দৈনিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পাঠকের আস্থা। সেই আস্থা একদিনে তৈরি হয় না, আবার একটি ভুল সংবাদেই তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়া, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্য ও মতামতের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। দ্রুত সংবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় এই নীতিগুলো বিসর্জন দিলে সংবাদপত্র হয়তো কিছু সময়ের জন্য আলোচনায় আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—বিশ্বাসযোগ্যতা।
বর্তমান সময়ে এই দায়িত্ব আরও কঠিন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সত্যের পাশাপাশি গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, পুরোনো ছবি দিয়ে নতুন ঘটনার বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় সংবাদপত্রের ভূমিকা কেবল ‘কে আগে প্রকাশ করল’—এখানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকে বলতে হবে—‘কোনটি সত্য, কোনটি যাচাই হয়নি এবং কোনটি মিথ্যা।’
এই জায়গাতেই একটি জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পার্থক্য স্পষ্ট। সামাজিক মাধ্যমে যে কেউ তথ্য প্রকাশ করতে পারেন; কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রের রয়েছে সম্পাদকীয় নীতি, পেশাগত দায়িত্ব এবং পাঠকের কাছে জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা। ফলে একটি সংবাদ প্রকাশের অর্থ শুধু একটি তথ্য জানানো নয়; সেই তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির একটি দায়ও গ্রহণ করা।
তবে সত্য প্রকাশের অর্থ কাউকে হেয় করা নয়। সাংবাদিকতার শক্তি কাউকে অপমান করার মধ্যে নয়, বরং সত্যকে এমনভাবে তুলে ধরার মধ্যে—যাতে পাঠক ঘটনার বাস্তবতা বুঝতে পারেন এবং নিজের বিচারবোধ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা, প্রমাণিত বিষয়কে প্রমাণিত হিসেবে বলা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যের সুযোগ রাখা—এগুলো শুধু আইনি সতর্কতা নয়, সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তিও।
জনস্বার্থের প্রশ্নে সংবাদপত্রের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অনিয়ম যেমন সংবাদ, তেমনি একজন সাধারণ শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না পাওয়াও সংবাদ। বড় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি যেমন অনুসন্ধানের বিষয়, তেমনি কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টিও জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যেমন মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, তেমনি দেশের প্রান্তিক মানুষের নীরব সংকটও জাতীয় আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।
একটি সংবাদপত্রের মানবিকতা এখানেই—যেখানে সংবাদে শুধু ক্ষমতাবানদের কণ্ঠ শোনা যাবে না; সাধারণ মানুষের কণ্ঠও সমান গুরুত্ব পাবে।
আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাদের কথা সংবাদপত্রের পাতায় খুব কমই আসে। নদীভাঙনে ঘর হারানো পরিবার, চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারা মানুষ, কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা তরুণ, নিরবে সংগ্রাম করা নারী, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক কিংবা কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষক—তাঁদের জীবনও বাংলাদেশের বাস্তবতার অংশ। জাতীয় দৈনিকের দায়িত্ব হলো সেই বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করা।
একই সঙ্গে সংবাদপত্রকে উন্নয়নের ইতিবাচক দিকও তুলে ধরতে হবে। সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালো উদ্যোগের স্বীকৃতিও প্রয়োজন। কোথাও একটি বিদ্যালয় স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে বদলে গেছে, কোথাও তরুণেরা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, কোথাও একজন চিকিৎসক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন—এসব ঘটনাও সমাজকে অনুপ্রাণিত করে। সংবাদপত্র কেবল ভুল খুঁজবে না; ভালো কাজকেও আলোয় আনবে। কারণ গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু সমস্যার আয়না হওয়া নয়, সম্ভাবনার জানালাও খুলে দেওয়া।
একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় অবস্থান তাই কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের ওপর দাঁড়াতে পারে না। তার আনুগত্য হওয়া উচিত সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতি। ক্ষমতা যারই হোক, প্রশ্ন করার সাহস থাকতে হবে। আবার অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, সত্যতা যাচাইয়ের ধৈর্যও থাকতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি সেই স্বাধীনতার দায়িত্বশীল ব্যবহারও সমান জরুরি।
কারণ সংবাদপত্রের কলম কখনো কখনো আদালতের রায়ের চেয়েও আগে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। একটি অনুসন্ধান অনেক দিনের অনিয়ম সামনে আনতে পারে, একটি মানবিক প্রতিবেদন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, একটি সত্য সংবাদ কোনো নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। আবার একটি ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ নির্দোষ মানুষের জীবনেও ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই সাংবাদিকতার প্রতিটি শব্দের সঙ্গে দায়িত্ব জড়িয়ে থাকে।
আমরা মনে করি, একটি জাতীয় দৈনিকের সাফল্য শুধু তার প্রচারসংখ্যা, ওয়েবসাইটের ভিউ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন পাঠক মনে করেন—‘এই সংবাদপত্রটি আমাকে বিভ্রান্ত করবে না; যা জানে, যাচাই করে জানাবে; যা জানে না, তা জানার ভান করবে না।’
বিশ্বাস অর্জনের এই পথ কঠিন। এখানে শর্টকাট নেই। আছে তথ্য যাচাইয়ের শ্রম, মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকের ঝুঁকি, সম্পাদকের বিবেক, প্রতিবেদকের সততা এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থান। কখনো কখনো একটি সত্য প্রকাশ জনপ্রিয় নাও হতে পারে। কখনো সত্য কথা বললে ক্ষমতাবান কেউ অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তবু জনস্বার্থের প্রশ্নে সংবাদপত্রকে জনপ্রিয়তার চেয়ে সত্যকে বড় করে দেখতে হবে।
আজকের বাংলাদেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নাগরিক জীবনে প্রতিনিয়ত নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে গণমাধ্যমের দায়িত্বও বদলাচ্ছে। শুধু খবর পৌঁছে দেওয়া নয়, খবরের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা, তথ্য যাচাই করা, নাগরিককে সচেতন করা এবং সমাজের দুর্বল কণ্ঠগুলোকে সামনে আনা—এসব দায়িত্বও সংবাদপত্রের ওপর বর্তায়।
একটি জাতীয় দৈনিক তাই শুধু কাগজের পাতায় মুদ্রিত কিছু খবরের সমষ্টি নয়। এটি সমাজের বিবেকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার কলমে থাকবে সত্যের সাহস, প্রতিবেদনে থাকবে তথ্যের দৃঢ়তা, ভাষায় থাকবে সংযম এবং মানুষের প্রতি থাকবে দায়বদ্ধতা।
আমরা বিশ্বাস করি—সংবাদপত্র কারও বিরুদ্ধে নয়; সংবাদপত্র সত্যের পক্ষে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অন্ধ সমর্থক নয়; জনস্বার্থের দায়িত্বশীল প্রহরী। ভুল হলে সংশোধনের সাহস থাকবে, অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করার সাহস থাকবে, আর মানুষের কষ্ট দেখলে নীরব না থাকার মানবিকতা থাকবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতীয় দৈনিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নাম নয়, তার অবস্থান। সে কোথায় দাঁড়ায়—ক্ষমতার পাশে, নাকি সত্যের পাশে; সুবিধার পাশে, নাকি জনস্বার্থের পাশে—সেটিই তাকে আলাদা করে।
একটি জাতীয় দৈনিকের দায়িত্ব তাই শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়। তার দায়িত্ব সত্যকে খুঁজে বের করা, সত্যকে দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করা এবং মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থের প্রশ্নে প্রয়োজনের সময় দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়ানো।
এই দায়িত্ব যতদিন থাকবে, সংবাদপত্র শুধু সংবাদপত্র হয়ে থাকবে না—মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠবে।

-লেথক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয়
10 September 2026

পেকুয়ায় ইউসুফ আলী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা: আসামী-১০

বিস্তারিত পড়তে কমেন্টে লিংক ... |
nagorikbhabna.com

জাতীয় দৈনিকের দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়—সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে থাকা

সর্বশেষ পরিমার্জন : ১২:০১:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাইমুম রেজা পিয়াস : একটি সংবাদপত্রের প্রথম পরিচয় তার ছাপা অক্ষরে নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ আমাদের চোখের সামনে আসে। কোনোটি রাজনীতির, কোনোটি অর্থনীতির, কোনোটি মানুষের জীবন-জীবিকার; কোথাও উন্নয়নের গল্প, কোথাও অনিয়মের অভিযোগ, আবার কোথাও নিভৃতে ঘটে যাওয়া এমন কোনো ঘটনা, যার প্রভাব হয়তো একটি পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজে পৌঁছে যায়। কিন্তু সব সংবাদ প্রকাশ করাই একটি জাতীয় দৈনিকের পূর্ণ দায়িত্ব নয়। তার চেয়েও বড় দায়িত্ব হলো—কোন সংবাদ মানুষের জানা প্রয়োজন, কোন তথ্য যাচাই করা জরুরি এবং কোন বিষয়ে জনস্বার্থের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া দরকার, তা নির্ধারণ করা।

গণমাধ্যমকে প্রায়ই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কথাটি শুধু প্রচলিত কোনো উপমা নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর সামাজিক দায়িত্ব। আইনসভা আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্র পরিচালনা করে, বিচার বিভাগ ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করে—আর গণমাধ্যম নাগরিকের জানার অধিকারকে সামনে রেখে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের কার্যক্রমকে প্রশ্নের মুখে আনে। এই প্রশ্ন তোলা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়; বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
একটি জাতীয় দৈনিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পাঠকের আস্থা। সেই আস্থা একদিনে তৈরি হয় না, আবার একটি ভুল সংবাদেই তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়া, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্য ও মতামতের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। দ্রুত সংবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় এই নীতিগুলো বিসর্জন দিলে সংবাদপত্র হয়তো কিছু সময়ের জন্য আলোচনায় আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—বিশ্বাসযোগ্যতা।
বর্তমান সময়ে এই দায়িত্ব আরও কঠিন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সত্যের পাশাপাশি গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, পুরোনো ছবি দিয়ে নতুন ঘটনার বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় সংবাদপত্রের ভূমিকা কেবল ‘কে আগে প্রকাশ করল’—এখানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকে বলতে হবে—‘কোনটি সত্য, কোনটি যাচাই হয়নি এবং কোনটি মিথ্যা।’
এই জায়গাতেই একটি জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পার্থক্য স্পষ্ট। সামাজিক মাধ্যমে যে কেউ তথ্য প্রকাশ করতে পারেন; কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রের রয়েছে সম্পাদকীয় নীতি, পেশাগত দায়িত্ব এবং পাঠকের কাছে জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা। ফলে একটি সংবাদ প্রকাশের অর্থ শুধু একটি তথ্য জানানো নয়; সেই তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির একটি দায়ও গ্রহণ করা।
তবে সত্য প্রকাশের অর্থ কাউকে হেয় করা নয়। সাংবাদিকতার শক্তি কাউকে অপমান করার মধ্যে নয়, বরং সত্যকে এমনভাবে তুলে ধরার মধ্যে—যাতে পাঠক ঘটনার বাস্তবতা বুঝতে পারেন এবং নিজের বিচারবোধ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা, প্রমাণিত বিষয়কে প্রমাণিত হিসেবে বলা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যের সুযোগ রাখা—এগুলো শুধু আইনি সতর্কতা নয়, সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তিও।
জনস্বার্থের প্রশ্নে সংবাদপত্রের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অনিয়ম যেমন সংবাদ, তেমনি একজন সাধারণ শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না পাওয়াও সংবাদ। বড় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি যেমন অনুসন্ধানের বিষয়, তেমনি কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টিও জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যেমন মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, তেমনি দেশের প্রান্তিক মানুষের নীরব সংকটও জাতীয় আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।
একটি সংবাদপত্রের মানবিকতা এখানেই—যেখানে সংবাদে শুধু ক্ষমতাবানদের কণ্ঠ শোনা যাবে না; সাধারণ মানুষের কণ্ঠও সমান গুরুত্ব পাবে।
আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাদের কথা সংবাদপত্রের পাতায় খুব কমই আসে। নদীভাঙনে ঘর হারানো পরিবার, চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারা মানুষ, কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা তরুণ, নিরবে সংগ্রাম করা নারী, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক কিংবা কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষক—তাঁদের জীবনও বাংলাদেশের বাস্তবতার অংশ। জাতীয় দৈনিকের দায়িত্ব হলো সেই বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করা।
একই সঙ্গে সংবাদপত্রকে উন্নয়নের ইতিবাচক দিকও তুলে ধরতে হবে। সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালো উদ্যোগের স্বীকৃতিও প্রয়োজন। কোথাও একটি বিদ্যালয় স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে বদলে গেছে, কোথাও তরুণেরা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, কোথাও একজন চিকিৎসক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন—এসব ঘটনাও সমাজকে অনুপ্রাণিত করে। সংবাদপত্র কেবল ভুল খুঁজবে না; ভালো কাজকেও আলোয় আনবে। কারণ গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু সমস্যার আয়না হওয়া নয়, সম্ভাবনার জানালাও খুলে দেওয়া।
একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় অবস্থান তাই কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের ওপর দাঁড়াতে পারে না। তার আনুগত্য হওয়া উচিত সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতি। ক্ষমতা যারই হোক, প্রশ্ন করার সাহস থাকতে হবে। আবার অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, সত্যতা যাচাইয়ের ধৈর্যও থাকতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি সেই স্বাধীনতার দায়িত্বশীল ব্যবহারও সমান জরুরি।
কারণ সংবাদপত্রের কলম কখনো কখনো আদালতের রায়ের চেয়েও আগে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। একটি অনুসন্ধান অনেক দিনের অনিয়ম সামনে আনতে পারে, একটি মানবিক প্রতিবেদন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, একটি সত্য সংবাদ কোনো নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। আবার একটি ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ নির্দোষ মানুষের জীবনেও ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই সাংবাদিকতার প্রতিটি শব্দের সঙ্গে দায়িত্ব জড়িয়ে থাকে।
আমরা মনে করি, একটি জাতীয় দৈনিকের সাফল্য শুধু তার প্রচারসংখ্যা, ওয়েবসাইটের ভিউ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন পাঠক মনে করেন—‘এই সংবাদপত্রটি আমাকে বিভ্রান্ত করবে না; যা জানে, যাচাই করে জানাবে; যা জানে না, তা জানার ভান করবে না।’
বিশ্বাস অর্জনের এই পথ কঠিন। এখানে শর্টকাট নেই। আছে তথ্য যাচাইয়ের শ্রম, মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকের ঝুঁকি, সম্পাদকের বিবেক, প্রতিবেদকের সততা এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থান। কখনো কখনো একটি সত্য প্রকাশ জনপ্রিয় নাও হতে পারে। কখনো সত্য কথা বললে ক্ষমতাবান কেউ অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তবু জনস্বার্থের প্রশ্নে সংবাদপত্রকে জনপ্রিয়তার চেয়ে সত্যকে বড় করে দেখতে হবে।
আজকের বাংলাদেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নাগরিক জীবনে প্রতিনিয়ত নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে গণমাধ্যমের দায়িত্বও বদলাচ্ছে। শুধু খবর পৌঁছে দেওয়া নয়, খবরের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা, তথ্য যাচাই করা, নাগরিককে সচেতন করা এবং সমাজের দুর্বল কণ্ঠগুলোকে সামনে আনা—এসব দায়িত্বও সংবাদপত্রের ওপর বর্তায়।
একটি জাতীয় দৈনিক তাই শুধু কাগজের পাতায় মুদ্রিত কিছু খবরের সমষ্টি নয়। এটি সমাজের বিবেকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার কলমে থাকবে সত্যের সাহস, প্রতিবেদনে থাকবে তথ্যের দৃঢ়তা, ভাষায় থাকবে সংযম এবং মানুষের প্রতি থাকবে দায়বদ্ধতা।
আমরা বিশ্বাস করি—সংবাদপত্র কারও বিরুদ্ধে নয়; সংবাদপত্র সত্যের পক্ষে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অন্ধ সমর্থক নয়; জনস্বার্থের দায়িত্বশীল প্রহরী। ভুল হলে সংশোধনের সাহস থাকবে, অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করার সাহস থাকবে, আর মানুষের কষ্ট দেখলে নীরব না থাকার মানবিকতা থাকবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতীয় দৈনিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নাম নয়, তার অবস্থান। সে কোথায় দাঁড়ায়—ক্ষমতার পাশে, নাকি সত্যের পাশে; সুবিধার পাশে, নাকি জনস্বার্থের পাশে—সেটিই তাকে আলাদা করে।
একটি জাতীয় দৈনিকের দায়িত্ব তাই শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়। তার দায়িত্ব সত্যকে খুঁজে বের করা, সত্যকে দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করা এবং মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থের প্রশ্নে প্রয়োজনের সময় দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়ানো।
এই দায়িত্ব যতদিন থাকবে, সংবাদপত্র শুধু সংবাদপত্র হয়ে থাকবে না—মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠবে।

-লেথক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা

Share this news as a Photo Card