মাহফুজুর রহমান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা): সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন খ্যাত গাবুরা ইউনিয়নে যৌথ বাহিনীর অভিযানে অবৈধ নাইটি পাইপ অপসারণ করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নোনা পানির সঙ্গে লড়াই করেই এখানকার মানুষের বসবাস। গত কয়েক দশকে আইলা, আম্পানসহ ১৪/১৫ টি বড় ও মাঝারি দুর্যোগ আঘাত হেনেছে এই ইউনিয়নে। কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি আর প্রাণহানির পরও টিকে থাকার জন্য সরকার মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করছে। অথচ, সেই বাঁধই কেটে অবৈধভাবে লবণ পানি ঢুকাচ্ছিল একটি প্রভাবশালী মহল।
বাঁধ নির্মাণের শুরু থেকে গাবুরার বিভিন্ন পয়েন্টে নির্মাণাধিন বাঁধ কেটে “নাইটি পাইপ” স্থাপনের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে বেশ কয়েকটি সংবাদও প্রকাশিত হয়। কিন্তু গাবুরার প্রভাবশালী মহলের কঠোর মনোভাবের কারণে ইচ্ছে থাকার সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চোখে পড়ার মতো কোন পদক্ষেপ নিতে পারিনি।
গত (২ জুলাই) ব্যাক্তিগত সফরে বাংলাদেশের প্রথম সারির সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিম গাবুরাতে আসেন। সুন্দরবন বন্ধে বনজীবীদের সার্বিক খোঁজ খবর ও মেগা প্রকল্পের বাঁধ পরিদর্শনের সময় বাঁধ কাঁটার ভিডিও ধারণ করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের পাশাপাশি বাঁধ কাটা ও পাইপ স্থাপনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন।
পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সুশীল সমাজ সবাই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। গাবুরার সর্বস্তরের মানুষ মানবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে।
জনরোষ ও গণমাধ্যমের চাপের মুখে অবশেষে নড়েচড়ে বসে উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (৭জুলাই) সকাল থেকে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক -এর নেতৃত্বে যৌথ অভিযান শুরু হয়। এসময় অভিযানে অংশ নেন উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন, শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ শফিউল পাটোয়ারী,পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান হোসেন,গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ ছাড়াও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় গাবুরা ইউনিয়নের উপকূলজুড়ে চলে অবৈধ নাইটি পাইপ উচ্ছেদ কার্যক্রম। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি পাইপও অবশিষ্ট থাকতে অভিযান বন্ধ হবে না।
গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম বলেন,উপকূল রক্ষায় মেগা প্রকল্পের বিকল্প নেই। কেউ যদি ব্যক্তি স্বার্থে তা নষ্ট করে, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক বলেন, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্টের অপরাধ। এই অপরাধ নির্মূলে আমরা অভিযান শুরু করেছি এবং এটি চলমান থাকবে। পুনরায় যদি কেউ এ ধরনের অপরাধের সাথে যুক্ত হয় তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শ্যামনগর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারি প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম জানান, গাবুরাতে অবৈধ নাইনটি উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে এবং এটি চলমান থাকবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুন বলেন, গাবুরার মতো দ্বীপ ইউনিয়নে একটি ছিদ্রই পুরা বাঁধকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এটি শুধু অপরাধ না, এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নাশকতা।
সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিম বলেন, মানুষের অধিকারের জন্য কলম ধরেছি,সেটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চলবে। গাবুরাবাসী চায় সর্বশেষ পাইপটি উচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে অভিযান শেষ হোক,সংশ্লিষ্ট ও প্রশাসনের কাছে আমিও এটাই প্রত্যাশা করি।
এত শত প্রতিশ্রুতি, সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিমের সাহসী প্রতিবেদন আর প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে গাবুরার মানুষ। তাদের একটাই দাবি — উপকূল রক্ষার এই লড়াই যেন থেমে না যায়। আবার যেন নাইনটি নামক অভিশাপ আর লোনা পানির ওঠানামার খেলায় ধংস না হয় উপকূলীয় জনপদ।

মাহফুজুর রহমান, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) 


















