নেপথ্যে কি ভুত-জিনের আছর নাকি কোন ষড়যন্ত্র ?
টঙ্গীতে শতশত গার্মেন্টস শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ!

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:৫৫:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২০৪ বার পঠিত

মৃণাল চৌধুরী সৈকত: গাজীপুরের টঙ্গীতে হঠাৎ খিঁচুনি উঠে বড় বড় গার্মেন্টস কারখানার শত শত শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার নেপথ্যে কি ভুত বা চিনের আছর নাকি গার্মেন্টস কারথানা ধ্বংশের কোন ষড়যন্ত্র চলছে সে বিষয়টি সুষ্ট তদন্ত পূর্বক খোজে বের করার দাবী উঠেছে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে।
গত ৪৫ দিনের ব্যবধানে স্থানীয় বৃহৎ বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানায় হঠাৎ শত শত শ্রমিকের জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া, খিচুনী উঠা বা বমি করার মাধ্যমে অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, গত ২৯ নভেম্বর-২০২৫ শনিবার টঙ্গীর হামীম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ কালেকশন লিমিটেড (সিসিএল) নামের পোশাক কারখানায় একাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ এবং আহত হয়ে পড়েন।
পরে তাদের টঙ্গী সরকারি হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ আতঙ্কে কারখানায় কোন শ্রমিক উপস্থিত না থাকায় কর্তৃপক্ষ কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করেন।
৩০ নভেম্বর রবিবার সকাল ১০টায় পূণরায় একই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। ফলে ওইদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত টঙ্গী শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে অর্ধশত অসুস্থ শ্রমিক চিকিৎসার জন্য আসে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানায়।
হাসপাতাল সূত্রটি জানান,২৪ ঘন্টার ব্যবধানে হামিম গ্রপের ৫০ জন শ্রমিক চিকিৎসার জন্য আসে। এছাড়া গাজীপুর, টঙ্গী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অসংখ্য শ্রমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
সে সময় শ্রমিকেরা জানান, হঠাৎ রহস্যজনক ভাবে অজ্ঞান এবং অসুস্থ হয়ে কয়েকদিন আগে দুই জন শ্রমিক মারা যায়। এই খবরে আতঙ্কিত হয়ে ও টেনশনে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
ওই সময় টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইসরাত জাহান জ্নিয়েছিলেন, হামীম গ্রুপের অসুস্থ শ্রমিকেরা টেনশন থেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসছেন। কর্তৃপক্ষের উচিত কারখানায় মানসিক ডাক্তার দিয়ে শ্রমিকদের কাউন্সিলিং করানো।
একই ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিলো টঙ্গীর তিলারগাতি এলাকায় কনসেপ্ট নিটিং লিমিটেড নামক কারখানায়। গত ২৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন বড় দেওড়ার তিলারগাতি এলাকায় কনসেপ্ট নিটিং লিমিটেড নামক কারখানায় ঘটনাটি ঘটে। কারখানায় অর্ধ শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানাটির ছুটি ঘোষণা করেন কর্তৃপক্ষ।
সেই সময় স্থানীয় সূত্র জানিয়েছিলেন, কনসেপ্ট নিটিং লিমিটেড কারখানার তৃতীয় তলায় হঠাৎ কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ খবরে আরও শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে পর্যায়ক্রমে ৪০-৫০ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
শ্রমিকদেরকে চিকিৎসার জন্য টঙ্গীর গুটিয়া ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। চিকিৎসকদের ধারণা শ্রমিকরা প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে কারখানা কর্তৃপক্ষ ওইদিন ছুটি ঘোষণা করেন।
সেই একই ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১২ জানুয়ারী ২০২৬ সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় টঙ্গী বিসিকের মেঘনা রোডের মা টাওয়ারে অবস্থিত অ্যামট্রানেট গ্রুপের গার্মেন্টস এক্সপোর্ট ভিলেইজ লিমিটেডে।
ওইদিন বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অর্ধশত শ্রমিক টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে আসেন। সে দিন দুপুরের পর পর হাসপাতালে আসা রোগীর মধ্যে লাইলি, হেনা, কল্পনা, নুরুজ্জামান, মনি আক্তার, মারুফা বেগম, বিথী, শিল্পী, মিঠু রায়, শাবনুর, ঝুমুর, সাথী, মোর্শেদা, ফারজানা আক্তারের অবস্থা গুরতর ছিলো বলে জানা যায়।
কারখানার অপারেটর, মনি বেগম, আলমসহ কয়েকজন শ্রমিক জানান, এই প্রতিষ্ঠানে ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। বর্তমান মাসের বেতনের জন্য আমরা তিন দিন যাবৎ আন্দোলন করে আসছি। সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে হঠাৎ ৫ম তলায় গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে অসংখ্য শ্রমিকের খিঁচুনি উঠে, বমি করে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসেন।
টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. নাফিয়া শারমিন বলেন, প্যানিক অ্যাটাকে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসেন। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরতর হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে গার্মেন্টস এক্সপোর্ট ভিলেইজ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার সুজন মাহমুদ বলেন, শ্রমিকেরা কাজ করা অবস্থায় মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছে। চোখ জ্বালাপোড়া ও বমির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমরা চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত আছি। আসলে সমস্যাটা কি বুঝতে পারছিনা। তবে শ্রমিক আন্দোলনের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
সেদিন এ বিষয়ে জানতে টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসানের মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও উনাকে পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার যথারীতি কাজ চললেও ১৪ জানুয়ারী ২০২৬ বুধবার সকালে একই কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে গার্মেন্টস এক্সপোর্ট ভিলেইজ লিমিটেডের কারখানায় প্রবেশের পর পরই আবারো প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে বমি এবং খিচুনীসহ অজ্ঞান হওয়ার রোগী বেশী লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৮ জন। ১২ জনকে শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করার পর ৮ জনকে হাসপাতাল থেকে কারখানা কর্তৃপক্ষ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন এবং ৪ জন উপরোক্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার পর পরই কর্তৃপক্ষ গার্মেন্টস কারখানা ছুটি ঘোষনা করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বুধবারের ঘটনা জানতে গার্মেন্টস এক্সপোর্ট ভিলেইজ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার সুজন মাহমুদ এর মুঠোফোনে যোগােযাগ করে উনাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কারখানার শ্রমিকরা বলেন, আমাদের বেতন-ভাতা পরিশোধের আন্দোলন চলাকালে পরপর দুদিনে কারখানার শতাধিক শ্রমিক রহস্যজনক কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কেউ বলছে কারখানায় জিনের তান্ডব চলছে, কেউ বলছে দূষিত পানি খেঢে অসুস্থ হচ্ছে শ্রমিকরা আবার কেউ বলছে কারখানার দুষিত গ্যাস জমে সেই গ্যাসের কারণে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আসলে এসব ঘটনা কেন ঘটছে তার সুষ্ট তদন্ত করে কারণ নির্ণয় করা জরুরী। আসলে এসব ঘটনার নেপথ্য কারণ কি ? কোন ভূত বা জিনের আছর, বিষাক্ত গ্যাস, অতিরিক্ত টেনশন, শ্বাস কষ্ট, নাকি গার্মেন্টস ধ্বংশের কোন ষড়যন্ত্র ?
শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগের ডাক্তার নাহিদ সুলতানা বলছেন,প্যানিক অ্যাটাকের কারনে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর অনেকে বাসায় ফিরে গেছেন। এদের মধ্যে ১২ জনকে ভর্তি করার পর ৮জন চলে যান। ৪ জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।























