ঢাকা, বাংলাদেশ। , সোমবার, ১১ মে ২০২৬

মুফতি মুহিব্বুল্লাহ নিজেই নিজের ‘অপহরণ নাটক’ সাজিয়েছেন, পুলিশ বলছে-অভিযুক্ত হবেন খতিবই

প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:৩৭:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১২২ বার পঠিত

মৃণাল চৌধুরী সৈকত, সিনি: স্টাফ রিপোর্টার :
মুফতি মুহিব্বুল্লাহর দাবি করা অপহরণের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ট্র্যাকিং এবং চিকিৎসকের রিপোর্টে চরম অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। তদন্ত শেষে এই খতিবের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দিতে চলেছে পুলিশ।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুরের টঙ্গীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজীর ‘অপহরণের’ ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত নাটক হিসেবেই প্রমাণিত হতে চলেছে। গত ২২ অক্টোবর সকাল ৭টায় তাকে টঙ্গী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরদিন পঞ্চগড়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর দাবি করেছিলেন এই খতিব।
সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশের তদন্ত এবং পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জনের বক্তব্য অনুযায়ী-মুহিব্বুল্লাহর অপহরণের দাবি মিথ্যা এবং পুরো ঘটনাটিই সাঁজানো।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ৬০ বছর বয়সী এই খতিবকে কেউ অপহরণ করেনি। এমনকি অপহরণের দাবি করে তিনি যে ধারায় মামলা করেছেন, সেই ধারায় তদন্ত শেষে খতিব মুহিব্বুল্লাহর বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হবে।
“তিনি নিজেই নিজের পায়ে শিকল লাগিয়েছেন”
ঘটনাটির তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত গাজীপুর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী নিজেকে নিয়ে অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মুহিব্বুল্লাহ নিজেই নিজের পায়ের সঙ্গে শিকল লাগিয়ে শুয়ে ছিলেন। তাকে পঞ্চগড় কেউ নেয়নি। সে নিজের মামলায় নিজেই আসামি হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, খতিব যে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী তার শরীরে আঘাতের কোনো দাগ নেই। পুলিশ বলছে, এই ঘটনা সাঁজানোর সব ভিডিও প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।
মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী গত ২২ অক্টোবর সকাল ৭টায় টঙ্গীর শিলমুন এক্সিস লিংক সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টারের সামনে থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নেওয়ার দাবি করেছিলেন।
কিন্তু অত্র এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ তার সেই দাবীকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে।
ফুটেজে যা দেখা যায়: সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে মুহিব্বুল্লাহকে কথিত অপহরণের স্থান-শিলমুন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দিয়ে দ্রুত গতিতে হেঁটে যেতে দেখা যায়। তার সঙ্গে কেউ ছিল না। তিনি যে সময়ের কথা বলেছেন, তার ১০ মিনিট পরেও ঘটনাস্থলে কোনো অ্যাম্বুলেন্সের দেখা মেলেনি।
দীর্ঘপথ অতিক্রম করে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৬টা ৫৪ মিনিটে মসজিদ থেকে রওনা হওয়ার পর তিনি হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিলিং স্টেশনে পৌঁছান। এরপরও তিনি দ্রুত হেঁটে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা পার হয়ে যান।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ পথ হেঁটে সিসিটিভি ক্যামেরার আড়াল হয়ে মুহিব্বুল্লাহ নিজেই যানবাহনে উঠে চলে গেছেন। মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পেরেছে, তিনি প্রথমে সিরাজগঞ্জ এবং পরে সেখান থেকে পঞ্চগড় যান।
ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. সোলাইমান স্থানীয় পুলিশকে ফুটেজ দিয়েছেন এবং ফুটেজে হুজুরকে একাই হেঁটে যেতে দেখা গেছে, অপহরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মারধরের চিহ্নও মিথ্যা।
মুহিব্বুল্লাহ তার বক্তব্যে দাবি করেছিলেন, তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং কাচের বোতলে পানি ভরে আঘাত করা হয়েছে। এই বিষয়েও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে চিকিৎসকের বক্তব্যে।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। জেলার সিভিল সার্জন মো. মিজানুর রহমান জানান, আপনি যদি জানতে চান, শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে উনাকে মারধর করা হয়েছে ? না, তেমন কিছু আমরা পাইনি।
সিভিল সার্জন আরও জানান, ব্যথা অনুভব করার কথা বলায় তাকে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো জখম বা আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
হুমকি সংক্রান্ত চিঠি প্রেরণ এর নেপথ্য কারণ?
মুহিব্বুল্লাহ অপহরণের কারণ হিসেবে ১১ মাস ধরে আসা বেনামি চিঠির হুমকিকে দায়ী করেন। চিঠিতে তাকে ‘অখণ্ড ভারত মাতা’র পক্ষে কথা বলতে, ইসকনের পক্ষে জনমত গঠন করতে এবং ইসলাম ভিত্তিক দলগুলোর বিরুদ্ধে খুতবা দিতে বলা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এসব চিঠি আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে খতিব প্রচার পেতে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই অপহরণের নাটক সাজিয়ে থাকতে পারেন।
এদিকে অভিযোগ আর সিসিটিভি ফুটেজ ও বক্তব্যে ধারাবাহিকতার অভাবের বিষয়টি সামনে আসার পর পুলিশ মুহিব্বুল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। বর্তমানে তিনি অসুস্থতার কথা বলে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছে, তিনি যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

মুফতি মুহিব্বুল্লাহ নিজেই নিজের ‘অপহরণ নাটক’ সাজিয়েছেন, পুলিশ বলছে-অভিযুক্ত হবেন খতিবই

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:৩৭:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

মৃণাল চৌধুরী সৈকত, সিনি: স্টাফ রিপোর্টার :
মুফতি মুহিব্বুল্লাহর দাবি করা অপহরণের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ট্র্যাকিং এবং চিকিৎসকের রিপোর্টে চরম অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। তদন্ত শেষে এই খতিবের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দিতে চলেছে পুলিশ।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুরের টঙ্গীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজীর ‘অপহরণের’ ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত নাটক হিসেবেই প্রমাণিত হতে চলেছে। গত ২২ অক্টোবর সকাল ৭টায় তাকে টঙ্গী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরদিন পঞ্চগড়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর দাবি করেছিলেন এই খতিব।
সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশের তদন্ত এবং পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জনের বক্তব্য অনুযায়ী-মুহিব্বুল্লাহর অপহরণের দাবি মিথ্যা এবং পুরো ঘটনাটিই সাঁজানো।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ৬০ বছর বয়সী এই খতিবকে কেউ অপহরণ করেনি। এমনকি অপহরণের দাবি করে তিনি যে ধারায় মামলা করেছেন, সেই ধারায় তদন্ত শেষে খতিব মুহিব্বুল্লাহর বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হবে।
“তিনি নিজেই নিজের পায়ে শিকল লাগিয়েছেন”
ঘটনাটির তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত গাজীপুর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী নিজেকে নিয়ে অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মুহিব্বুল্লাহ নিজেই নিজের পায়ের সঙ্গে শিকল লাগিয়ে শুয়ে ছিলেন। তাকে পঞ্চগড় কেউ নেয়নি। সে নিজের মামলায় নিজেই আসামি হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, খতিব যে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী তার শরীরে আঘাতের কোনো দাগ নেই। পুলিশ বলছে, এই ঘটনা সাঁজানোর সব ভিডিও প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।
মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী গত ২২ অক্টোবর সকাল ৭টায় টঙ্গীর শিলমুন এক্সিস লিংক সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টারের সামনে থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নেওয়ার দাবি করেছিলেন।
কিন্তু অত্র এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ তার সেই দাবীকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে।
ফুটেজে যা দেখা যায়: সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে মুহিব্বুল্লাহকে কথিত অপহরণের স্থান-শিলমুন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দিয়ে দ্রুত গতিতে হেঁটে যেতে দেখা যায়। তার সঙ্গে কেউ ছিল না। তিনি যে সময়ের কথা বলেছেন, তার ১০ মিনিট পরেও ঘটনাস্থলে কোনো অ্যাম্বুলেন্সের দেখা মেলেনি।
দীর্ঘপথ অতিক্রম করে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৬টা ৫৪ মিনিটে মসজিদ থেকে রওনা হওয়ার পর তিনি হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিলিং স্টেশনে পৌঁছান। এরপরও তিনি দ্রুত হেঁটে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা পার হয়ে যান।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ পথ হেঁটে সিসিটিভি ক্যামেরার আড়াল হয়ে মুহিব্বুল্লাহ নিজেই যানবাহনে উঠে চলে গেছেন। মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পেরেছে, তিনি প্রথমে সিরাজগঞ্জ এবং পরে সেখান থেকে পঞ্চগড় যান।
ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. সোলাইমান স্থানীয় পুলিশকে ফুটেজ দিয়েছেন এবং ফুটেজে হুজুরকে একাই হেঁটে যেতে দেখা গেছে, অপহরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মারধরের চিহ্নও মিথ্যা।
মুহিব্বুল্লাহ তার বক্তব্যে দাবি করেছিলেন, তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং কাচের বোতলে পানি ভরে আঘাত করা হয়েছে। এই বিষয়েও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে চিকিৎসকের বক্তব্যে।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। জেলার সিভিল সার্জন মো. মিজানুর রহমান জানান, আপনি যদি জানতে চান, শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে উনাকে মারধর করা হয়েছে ? না, তেমন কিছু আমরা পাইনি।
সিভিল সার্জন আরও জানান, ব্যথা অনুভব করার কথা বলায় তাকে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো জখম বা আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
হুমকি সংক্রান্ত চিঠি প্রেরণ এর নেপথ্য কারণ?
মুহিব্বুল্লাহ অপহরণের কারণ হিসেবে ১১ মাস ধরে আসা বেনামি চিঠির হুমকিকে দায়ী করেন। চিঠিতে তাকে ‘অখণ্ড ভারত মাতা’র পক্ষে কথা বলতে, ইসকনের পক্ষে জনমত গঠন করতে এবং ইসলাম ভিত্তিক দলগুলোর বিরুদ্ধে খুতবা দিতে বলা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এসব চিঠি আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে খতিব প্রচার পেতে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই অপহরণের নাটক সাজিয়ে থাকতে পারেন।
এদিকে অভিযোগ আর সিসিটিভি ফুটেজ ও বক্তব্যে ধারাবাহিকতার অভাবের বিষয়টি সামনে আসার পর পুলিশ মুহিব্বুল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। বর্তমানে তিনি অসুস্থতার কথা বলে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছে, তিনি যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।