ঢাকা, বাংলাদেশ। , সোমবার, ১১ মে ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকট : মানবতা আর মানবিক আশ্রয় থেকে বিষফোঁড়া-এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী

প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:১৫:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১৭১ বার পঠিত
শ.ম.গফুর,কক্সবাজার
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমন ১৯৩২ সাল থেকে।১৯৭৮ সালেও স্রোত নেমেছিল।এরপর ১৯৯১ সালেও ঢ্ল নামে।২০১৬ সালে একাংশ বিচ্ছিন্ন ভাবে এদেশে পাড়ি জমান।এরপর ২০১৭ সালে ফের ঢল নামে।২০২৪-২৫ সাল,গত দুই বছরেও বিচ্ছিন্ন ভাবে রোহিঙ্গারা এদেশে পাড়ি জমান।এভাবে অন্তত ১৫ বার রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটে বাংলাদেশে।যদিও এসব তথ্য বুড়া-বুড়িদের মুখ থেকে শোনা।কিন্তু ২০১৭ সাল ছিল রোহিঙ্গা আগমনের ভয়াল স্রোত।সেবার মিয়ানমার সামরিক জান্তা’র নানান নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর এদেশে রোহিঙ্গার আগমন ঘটে।তৎকালিন সরকারের  মানবিকতায় এসব রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফের বনভূমিতে। সেখানে গড়ে তুলেন বসতি। এরপর থেকে উজাড় হতে থাকে বনসম্পদ। বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায় বন্যপ্রাণী এবং পাহাড়। দখল হয়ে গেছে শ্রমবাজার, হুমকির মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বর্তমানে বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা।রোহিঙ্গার আগমন এবং পারিপার্শ্বিক,সমসাময়িক বিষয়ে যা জানালেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ(ইউপি)চেয়ারম্যান এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী।তিনি জাতীয় দৈনিক নাগরিক ভাবনা পত্রিকার কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি শ.ম.গফুর এর মুখোমুখি হন।তার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী টানা তিন বারের ইউপি’র চেয়ারম্যান, একাধারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি’র কেন্দ্রীয় মহাসচিব।সম্পৃক্ত রয়েছেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক বহসংগঠনে।একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে
 স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের ভাষ্যমতে তিনি জানান, বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ৮ বছর গত হয়েছে।এই ৮ বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে নানান সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা।তিনি চান রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে  যায়।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক চিন্তা করে স্থানীয়দের অনেকের জোত জমিতেও আশ্রয় দিয়েছিলাম। বর্তমানে জমির মালিক বলে দাবি করতে পারতেছিনা৷ রোহিঙ্গাদের কথায় ক্যাম্প প্রশাসন আমাদের অন্তত ২৫ একরের বেশী জোত জমি দখল করে এনজিওদের ভাড়া দিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগও করেছেন। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে স্থানীয়দের ধান-ক্ষেত খামার চাষ অনেকটা বন্ধ রয়েছে। অথচ এ জমি স্থানীয়দের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু গেল ৮ বছরে চাষাবাদ বন্ধ থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন অনেকে।ক্যাম্প লাগোয়া এলাকার বহু কৃষকের ভাষ্যমতে ক্যাম্পের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, পচঁনশীল ময়লা, মানব বর্জ্যসহ নানা বর্জ্যে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা। কোনোভাবেই এ বর্জ্য ফেলানো ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রায় শত একর ফসলা জমি ৮ বছর ধরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। উখিয়ার রাজাপালং ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিনের ভাষ্যমতে তিনি বলেন, একটি ড্রেন নির্মাণ করে পানি নিষ্কাশনের জন্য নানা জায়গায় আবেদন করেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। দফায় দফায় কৃষকদের নিয়ে প্রশাসন, এনজিও কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে গিয়েও কোনো কাজ হচ্ছেনা। এরপরেও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করেছেন, এমনও অনেকে জানিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন।রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে বন্যাপ্রাণীর অভ্যয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত উখিয়ার মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, ময়নারঘোনা, টিভি রিলে কেন্দ্র, তাজনিরমারখোলা, মোছাখোলা,শফিউল্লাহ কাটা,মধুরছড়া,মাছকারিয়া যেনো বিরান ভুমি। রোহিঙ্গা বসতির কারনে এ অঞ্চলে বসবাসরত এশিয়া প্রজাতির বন্যহাতি বিলুপ্ত প্রায়। এক সময় ওই অঞ্চলে প্রায় পৌণে তিনশ’ বন্য হাতির অবস্থান থাকলেও নিরাপদ বাসস্থান হারিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে। উখিয়ার পাহাড়ি বনভূমিতে ঘুরে বেড়াত এশিয়া প্রজাতির ইন্ডিয়া উপপ্রজাতির হাতিগুলো।আইইউ’র তথ্যমতে, কক্সবাজারের উত্তর-দক্ষিণ বনভূমিতে ৪৬-৭৮টি বন্য হাতির বিচরণ ছিল। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। বর্তমানে উজাড় হওয়া বন ও পাহাড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসতি। এতে বিলুপ্তির পথে বসেছে বন্যহাতিসহ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র।
টিভি রিলে উপকেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা নুরুল কবির ভুট্টোর বরাতে বলেন, ৮ বছর পুর্বে বন্যহাতির ভয়ে এই এলাকায় কোন সাধারণ মানুষ রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারতনা। সড়কের উপর বন্যহাতির দল দাড়িয়ে থাকার কারণে রাতে যানবাহন চলাচলে বাধাগ্রস্ত হতো। কিন্তু তা এখন আর চোঁখে পড়েনা। রোহিঙ্গা বসতির কারণে বন্যপ্রাণী সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে।উখিয়ার বনবিভাগ সুত্রের বরাতে জানান, মূলত উখিয়ার দক্ষিণ বন এলাকাটি বন্য হাতির মূল বিচরণের ক্ষেত্র ছিল। বর্তমানে সেখানে রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠার কারণে বন্যহাতির দল আবাসস্থল হারিয়ে অন্যত্রে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে।সুত্রে প্রকাশ, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট’র পর থেকে নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমিতে বসতি স্থাপন করেছে। পুরনো দু’টি নিবন্ধিত ক্যাম্প এবং নতুন অনিবন্ধিত ৩২টি ক্যাম্পসহ রোহিঙ্গাদের মোট ক্যাম্প ৩৪টি। প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি দখল করে এসব ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। এতে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, ভূমিরূপ পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত বেড়েছে।সংশ্লিষ্ট সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বনজ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি টাকার অংকে সাড়ে চারশো কোটি’র উপর। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। মোট ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি ছাড়াবে।হাজার একর সৃজিত বন এবং এক হাজার ২৫৭ একর প্রাকৃতিক বনসহ ক্যাম্প এলাকার বাইরে জ্বালানি সংগ্রহে রোহিঙ্গারা বনাঞ্চল উজাড় করেছে।রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত ৮ বছরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছে রোহিঙ্গারা। দিনদিন জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ কর্মকান্ডে। ইয়াবা, মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্র চোরাচালান তাদের অন্যতম ব্যবসা। যার কারনে হুমকিতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি৷রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী আরোও বলেন, রোহিঙ্গার কারনে আমাদের নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে,যা বিদ্যমান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শ্রম বাজার, শিক্ষা, যাতায়াত ব্যবস্থা রাস্তা-ঘাট, বনভূমি ও পাহাড় ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে শতাধিক একর স্থানীয়দের জোত জমি অনাবাদী হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে এ বিষয়ে লেখালেখি করেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন অফিস সুত্র মতে তিনি বলেন, সাড়ে ৬ হাজার একর বন ভূমিতে রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এ সংখ্যা আরোও বাড়তে পারে।প্রথম দিকে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে বনসম্পদের কিছুটা ক্ষতি হলেও পরবর্তীতে বনায়নের উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে বনায়ন করা হয়েছে৷ তবে এই মুর্হুতে কি পরিমাণ বনায়ন সৃজন করা হয়েছে তা সঠিক করে বলা যাচ্ছেনা। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান।
মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন রাজ্যে) সামরিক জান্তা ও নাটালা বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যা, খুন, নির্যাতন, ধর্ষণের মুখে প্রাণ রক্ষায় এদেশে ঢুকে পড়েন লাখ-লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ সরকার মানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাদেরকে আশ্রয় দেন। বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফে ও নোয়াখালীর ভাসানচরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। এর বাইরে নতুন করে আরোও দুই লাখ রোহিঙ্গার আগমন ঘটেছে।তবে এখনো নিজ মাতৃভূমিতে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন এসব রোহিঙ্গা আশ্রিত রোহিঙ্গারা।
তিনি বলেন, ১৯৩২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৫ বার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলাদেশে, কিন্তু ২০১৭ সালের মতো এতো বৃহৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি বাংলাদেশে কখনো আসেনি। মিয়ানমারে অনেক জায়গা-জমি, ধন-সম্পদ ছিল কিন্তু প্রাণ বাঁচাতে এদেশে পালিয়ে এসেছেন। রোহিঙ্গারা এখানে খুবই ভালো আছেন,এরপরেও রাতে ঘুমাতে গেলে দেশের জন্য মন কাঁদে তাদের। নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসার পর থেকেই শুনে আসছি মিয়ানমার ফিরিয়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গাদের।বহুবার দিন তারিখ ঠিক করার পরও বর্হিবিশ্বের রহস্যজনক ভূমিকার কারনে ফেরা সম্ভব হচ্ছেনা, তার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
 ‘মিয়ানমারের তালবাহানা, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সদিচ্ছার অভাবে নিজ দেশে ফিরতে পারছে না রোহিঙ্গারা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী আরোও বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। তারা মাদকের ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হওয়া নিয়ে আমরাও সন্দিহান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক কিছু সংগঠন নিজ স্বার্থে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা দেখিয়ে তারা সুবিধা আদায় করছে। তাই এসব সেবা সংস্থা গুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।বিগত সময়ে রোহিঙ্গা শিবির থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু তাও পুরোপুরি নেওয়া হয়নি।২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের (নতুন-পুরাতন) মিলিয়ে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প ও ভাসানচরে আশ্রয় নিয়ে আছে।এর বাইরে গত দুই বছরে আরোও নতুন যোগ হয়েছে অন্তত দুই লাখ।নতুন জন্ম নেওয়া সহ সব মিলিয়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা স্থানীয়দের জন্য বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে।যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হোক।তাদের ফিরিয়ে দিতে পারলেই রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য মঙ্গল বলে মন্তব্য করেন এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী।প্রত্যাবাসন হচ্ছে,হবে এসব শুনতে-শুনতে নাবিশ্বাসের জন্ম নিয়েছে জনমনে।কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন শুরু হবে স্পষ্ট করা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

রোহিঙ্গা সংকট : মানবতা আর মানবিক আশ্রয় থেকে বিষফোঁড়া-এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:১৫:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
শ.ম.গফুর,কক্সবাজার
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমন ১৯৩২ সাল থেকে।১৯৭৮ সালেও স্রোত নেমেছিল।এরপর ১৯৯১ সালেও ঢ্ল নামে।২০১৬ সালে একাংশ বিচ্ছিন্ন ভাবে এদেশে পাড়ি জমান।এরপর ২০১৭ সালে ফের ঢল নামে।২০২৪-২৫ সাল,গত দুই বছরেও বিচ্ছিন্ন ভাবে রোহিঙ্গারা এদেশে পাড়ি জমান।এভাবে অন্তত ১৫ বার রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটে বাংলাদেশে।যদিও এসব তথ্য বুড়া-বুড়িদের মুখ থেকে শোনা।কিন্তু ২০১৭ সাল ছিল রোহিঙ্গা আগমনের ভয়াল স্রোত।সেবার মিয়ানমার সামরিক জান্তা’র নানান নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর এদেশে রোহিঙ্গার আগমন ঘটে।তৎকালিন সরকারের  মানবিকতায় এসব রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফের বনভূমিতে। সেখানে গড়ে তুলেন বসতি। এরপর থেকে উজাড় হতে থাকে বনসম্পদ। বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায় বন্যপ্রাণী এবং পাহাড়। দখল হয়ে গেছে শ্রমবাজার, হুমকির মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বর্তমানে বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা।রোহিঙ্গার আগমন এবং পারিপার্শ্বিক,সমসাময়িক বিষয়ে যা জানালেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ(ইউপি)চেয়ারম্যান এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী।তিনি জাতীয় দৈনিক নাগরিক ভাবনা পত্রিকার কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি শ.ম.গফুর এর মুখোমুখি হন।তার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী টানা তিন বারের ইউপি’র চেয়ারম্যান, একাধারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি’র কেন্দ্রীয় মহাসচিব।সম্পৃক্ত রয়েছেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক বহসংগঠনে।একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে
 স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের ভাষ্যমতে তিনি জানান, বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ৮ বছর গত হয়েছে।এই ৮ বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে নানান সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা।তিনি চান রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে  যায়।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক চিন্তা করে স্থানীয়দের অনেকের জোত জমিতেও আশ্রয় দিয়েছিলাম। বর্তমানে জমির মালিক বলে দাবি করতে পারতেছিনা৷ রোহিঙ্গাদের কথায় ক্যাম্প প্রশাসন আমাদের অন্তত ২৫ একরের বেশী জোত জমি দখল করে এনজিওদের ভাড়া দিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগও করেছেন। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে স্থানীয়দের ধান-ক্ষেত খামার চাষ অনেকটা বন্ধ রয়েছে। অথচ এ জমি স্থানীয়দের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু গেল ৮ বছরে চাষাবাদ বন্ধ থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন অনেকে।ক্যাম্প লাগোয়া এলাকার বহু কৃষকের ভাষ্যমতে ক্যাম্পের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, পচঁনশীল ময়লা, মানব বর্জ্যসহ নানা বর্জ্যে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা। কোনোভাবেই এ বর্জ্য ফেলানো ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রায় শত একর ফসলা জমি ৮ বছর ধরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। উখিয়ার রাজাপালং ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিনের ভাষ্যমতে তিনি বলেন, একটি ড্রেন নির্মাণ করে পানি নিষ্কাশনের জন্য নানা জায়গায় আবেদন করেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। দফায় দফায় কৃষকদের নিয়ে প্রশাসন, এনজিও কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে গিয়েও কোনো কাজ হচ্ছেনা। এরপরেও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করেছেন, এমনও অনেকে জানিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন।রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে বন্যাপ্রাণীর অভ্যয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত উখিয়ার মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, ময়নারঘোনা, টিভি রিলে কেন্দ্র, তাজনিরমারখোলা, মোছাখোলা,শফিউল্লাহ কাটা,মধুরছড়া,মাছকারিয়া যেনো বিরান ভুমি। রোহিঙ্গা বসতির কারনে এ অঞ্চলে বসবাসরত এশিয়া প্রজাতির বন্যহাতি বিলুপ্ত প্রায়। এক সময় ওই অঞ্চলে প্রায় পৌণে তিনশ’ বন্য হাতির অবস্থান থাকলেও নিরাপদ বাসস্থান হারিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে। উখিয়ার পাহাড়ি বনভূমিতে ঘুরে বেড়াত এশিয়া প্রজাতির ইন্ডিয়া উপপ্রজাতির হাতিগুলো।আইইউ’র তথ্যমতে, কক্সবাজারের উত্তর-দক্ষিণ বনভূমিতে ৪৬-৭৮টি বন্য হাতির বিচরণ ছিল। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। বর্তমানে উজাড় হওয়া বন ও পাহাড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসতি। এতে বিলুপ্তির পথে বসেছে বন্যহাতিসহ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র।
টিভি রিলে উপকেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা নুরুল কবির ভুট্টোর বরাতে বলেন, ৮ বছর পুর্বে বন্যহাতির ভয়ে এই এলাকায় কোন সাধারণ মানুষ রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারতনা। সড়কের উপর বন্যহাতির দল দাড়িয়ে থাকার কারণে রাতে যানবাহন চলাচলে বাধাগ্রস্ত হতো। কিন্তু তা এখন আর চোঁখে পড়েনা। রোহিঙ্গা বসতির কারণে বন্যপ্রাণী সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে।উখিয়ার বনবিভাগ সুত্রের বরাতে জানান, মূলত উখিয়ার দক্ষিণ বন এলাকাটি বন্য হাতির মূল বিচরণের ক্ষেত্র ছিল। বর্তমানে সেখানে রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠার কারণে বন্যহাতির দল আবাসস্থল হারিয়ে অন্যত্রে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে।সুত্রে প্রকাশ, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট’র পর থেকে নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমিতে বসতি স্থাপন করেছে। পুরনো দু’টি নিবন্ধিত ক্যাম্প এবং নতুন অনিবন্ধিত ৩২টি ক্যাম্পসহ রোহিঙ্গাদের মোট ক্যাম্প ৩৪টি। প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি দখল করে এসব ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। এতে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, ভূমিরূপ পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত বেড়েছে।সংশ্লিষ্ট সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বনজ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি টাকার অংকে সাড়ে চারশো কোটি’র উপর। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। মোট ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি ছাড়াবে।হাজার একর সৃজিত বন এবং এক হাজার ২৫৭ একর প্রাকৃতিক বনসহ ক্যাম্প এলাকার বাইরে জ্বালানি সংগ্রহে রোহিঙ্গারা বনাঞ্চল উজাড় করেছে।রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত ৮ বছরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছে রোহিঙ্গারা। দিনদিন জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ কর্মকান্ডে। ইয়াবা, মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্র চোরাচালান তাদের অন্যতম ব্যবসা। যার কারনে হুমকিতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি৷রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী আরোও বলেন, রোহিঙ্গার কারনে আমাদের নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে,যা বিদ্যমান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শ্রম বাজার, শিক্ষা, যাতায়াত ব্যবস্থা রাস্তা-ঘাট, বনভূমি ও পাহাড় ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে শতাধিক একর স্থানীয়দের জোত জমি অনাবাদী হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে এ বিষয়ে লেখালেখি করেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন অফিস সুত্র মতে তিনি বলেন, সাড়ে ৬ হাজার একর বন ভূমিতে রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এ সংখ্যা আরোও বাড়তে পারে।প্রথম দিকে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে বনসম্পদের কিছুটা ক্ষতি হলেও পরবর্তীতে বনায়নের উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে বনায়ন করা হয়েছে৷ তবে এই মুর্হুতে কি পরিমাণ বনায়ন সৃজন করা হয়েছে তা সঠিক করে বলা যাচ্ছেনা। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান।
মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন রাজ্যে) সামরিক জান্তা ও নাটালা বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যা, খুন, নির্যাতন, ধর্ষণের মুখে প্রাণ রক্ষায় এদেশে ঢুকে পড়েন লাখ-লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ সরকার মানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাদেরকে আশ্রয় দেন। বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফে ও নোয়াখালীর ভাসানচরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। এর বাইরে নতুন করে আরোও দুই লাখ রোহিঙ্গার আগমন ঘটেছে।তবে এখনো নিজ মাতৃভূমিতে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন এসব রোহিঙ্গা আশ্রিত রোহিঙ্গারা।
তিনি বলেন, ১৯৩২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৫ বার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলাদেশে, কিন্তু ২০১৭ সালের মতো এতো বৃহৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি বাংলাদেশে কখনো আসেনি। মিয়ানমারে অনেক জায়গা-জমি, ধন-সম্পদ ছিল কিন্তু প্রাণ বাঁচাতে এদেশে পালিয়ে এসেছেন। রোহিঙ্গারা এখানে খুবই ভালো আছেন,এরপরেও রাতে ঘুমাতে গেলে দেশের জন্য মন কাঁদে তাদের। নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসার পর থেকেই শুনে আসছি মিয়ানমার ফিরিয়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গাদের।বহুবার দিন তারিখ ঠিক করার পরও বর্হিবিশ্বের রহস্যজনক ভূমিকার কারনে ফেরা সম্ভব হচ্ছেনা, তার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
 ‘মিয়ানমারের তালবাহানা, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সদিচ্ছার অভাবে নিজ দেশে ফিরতে পারছে না রোহিঙ্গারা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী আরোও বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। তারা মাদকের ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হওয়া নিয়ে আমরাও সন্দিহান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক কিছু সংগঠন নিজ স্বার্থে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা দেখিয়ে তারা সুবিধা আদায় করছে। তাই এসব সেবা সংস্থা গুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।বিগত সময়ে রোহিঙ্গা শিবির থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু তাও পুরোপুরি নেওয়া হয়নি।২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের (নতুন-পুরাতন) মিলিয়ে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প ও ভাসানচরে আশ্রয় নিয়ে আছে।এর বাইরে গত দুই বছরে আরোও নতুন যোগ হয়েছে অন্তত দুই লাখ।নতুন জন্ম নেওয়া সহ সব মিলিয়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা স্থানীয়দের জন্য বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে।যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হোক।তাদের ফিরিয়ে দিতে পারলেই রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য মঙ্গল বলে মন্তব্য করেন এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী।প্রত্যাবাসন হচ্ছে,হবে এসব শুনতে-শুনতে নাবিশ্বাসের জন্ম নিয়েছে জনমনে।কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন শুরু হবে স্পষ্ট করা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।