ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
তাজা খবর
অসুস্থ হনুমান চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিজেই হাসপাতালে হাজির
মেধার স্বাক্ষরে দেশসেরা মনিরামপুরের সুরাইয়া ও অরিত্র
ব্যারিস্টার জাইমা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করেছেন
মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও
ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ
ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন
১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর
ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী
গল্প কথায় বাংলা ও পারস্যর অমর ভালবাসা

জেমস আব্দুর রহিম রানা
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:৫২:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ৬৫ বার পঠিত

জেমস আব্দুর রহিম রানা: নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা (নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম বংশধর) প্রকৃতির ভালবাসায় যেমন জন্ম নেয় সবুজ চারাগাছ, তেমনি তাঁদের ভালবাসায় অঙ্কুরিত হয়েছিল আনন্দ বেদনার এক মহাকাব্য’। তাঁরা ছিলেন বাংলার ভালবাসা। তাঁরা ছিলেন একে অন্যের প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয়। তাঁদের ভালবাসা ছিল… হৃদয়ের বন্ধনে। তাদের ভালবাসার কথা আজও শুনা যায় মানুষের মুখে মুখে।
জি! বন্ধুরা ঠিক বুঝেছেন আপনারা, আমি বঙ্গ যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা ও বঙ্গ সম্রাজ্ঞী বেগম লুৎফুন্নিসার কথা বলছি। ১৭২৭ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর সিরাজউদ্দৌলা নামক ফুটফুটে সুন্দর এক ফুল ফুটল বাংলার বাগিচায় আর এই ফুলটির প্রতি লুৎফুন্নিসার ছিল হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা।
সিরাজ ও লুৎফুন্নিসা খুব ভালোবাসতেন সৃষ্টিকর্তার সুন্দর সৃষ্টি ফুল-পাখিদের। প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভে আনন্দ পেতেন একসাথে।একমাত্র সন্তান উম্মে জোহরাকে ভালোবাসতেন হৃদয়ের সব টুকু ভালবাসা দিয়ে।
বঙ্গতাজ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বঙ্গ সম্রাজ্ঞী বেগম লুৎফুন্নিসা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নিসার বিনোদন ছিল তার পরিবার-পরিজন নিয়ে গঠিত অন্দর মহল আর প্রিয়জনদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা।
বন্ধুরা… ১৭৪৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত্রি ১১:৩০ –এ,আবার অনেক ঐতিহাসিকের মতে ১৪ই ফেব্রুয়ারি রাত্রি ১২:৩০ –এ ( বাংলা মাসের- ১লা ফাল্গুন ) যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা ও লুৎফুন্নিসার নিকাহ সম্পন্ন হয় তৎকালীন দু’বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে। সিরাজের নিকাহ হয় সম্ভ্রান্ত বংশীয় ইরাজ খানের কন্যা লুৎফুন্নিসার সাথে। নিকাহর অল্প দিন পরে বলা যায় মধুচন্দ্রিমায় সিরাজউদ্দৌলা ও লুৎফুন্নিসা পারস্যের ‘সিরাজ’ প্রদেশে গিয়েছিলেন। ওই সময়ে যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নিসাকে ‘সিরাজ’ শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে গুণিজনেরা রাজকীয় সংবর্ধনা দেন।
লুৎফুন্নিসা যৌবনের শুরু থেকে সিরাজের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সুখে-দুঃখে ছায়ার ন্যায় তাঁর পাশে ছিলেন। জন্মের অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ধীর, স্থির ও মৃদু স্বভাব সম্পন্না ও সুন্দরী হিসেবে সকলের প্রিয়-পাত্রী হয়ে ওঠেন। তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সিরাজ তাঁকে ভালোবেসে ফেলেন। লুৎফুন্নিসার প্রণয়-মিশ্রিত সম্ভাষণ, স্নেহপূর্ণ তিরস্কার ও ভালবাসার গভীরতা ও আন্তরিকতা দেখে পারিবারিক সম্মতি নিয়ে সিরাজ তাঁকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন নাই। সিরাজ লুৎফুন্নিসাকে বিশেষ স্নেহ ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন।
সিরাজউদ্দৌলা তাঁর সবচেয়ে বিপদের দিনেও স্ত্রী লুৎফুন্নিসাকে কাছ ছাড়া করেন নি। শত্রু পক্ষ থেকে বাংলার মসনদ পুনরুদ্ধার করার জন্য মুর্শিদাবাদ ছেড়ে আজীমাবাদ যাবার সময়েও বঙ্গবীর নবাব আলিবর্দী খানের অতি আদরের নাতী সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ছিলেন চিরসাথী প্রিয়তমা লুৎফুন্নিসা ও একমাত্র সন্তান উম্মে জোহরা।
দেশপ্রেমী নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে আঘাতের পর আঘাত হেনে নির্মম ভাবে হত্যা করলো বাংলার কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারিরা! বাংলার কুচক্রীরা নিহত নবাবের বিধবা বেগম ধর্মপরায়ণা লুৎফুন্নিসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। একথা শুনে লুৎফুন্নিসা সদম্ভে বলেছিলেন, “যে নারী চিরকাল হাতীর পিঠে চড়ে অভ্যস্ত, সে কি কখনও গাধার পিঠে চড়তে চাইবে”?
“ লুৎফুন্নিসা জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো হারিয়ে যখন অন্য জীবন পেলেন… সব খুশি হারিয়ে যখন স্মৃতিতে ভালবাসা পেলেন … দু’হাত প্রার্থনায় তুলে বিধাতার কাছে শুধু চেয়ে নিলেন, তাঁর বীর দেশপ্রেমী নবাব সিরাজউদ্দৌলার আত্মার শান্তির মঙ্গল কামনা” । সিরাজের শাহাদাতের পর ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদের বন্দিজীবন শেষে ইংরেজরা লুৎফাকে মুর্শিদাবাদে আনয়ন করে নবাব আলিবর্দী ও সিরাজের সমাধি ভবন খোশবাগের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়। বেগম লুৎফুন্নিসা আজীবন কন্যা উম্মে জোহরা সহ খোশবাগে অবস্থান করে রোজ সন্ধ্যায় বীর আলিবর্দী খান ও দেশপ্রেমী সিরাজের মাজারে মোমবাতি, আগরবাতি জ্বালিয়ে কোরআন তেলাওয়াত করতেন।
বন্ধুরা আপনাদের অনেকের কাছেই হয়তো অজানা যে, সিরাজের স্বপ্নের বাগিচা ‘হীরাঝিল’-এর নাম করন করেছিলেন তারই প্রিয়তমা সহধর্মিনী বেগম লুৎফুন্নিসা!
হীরাঝিলের রক্ষণাবেক্ষণ যে গঞ্জের নজরানায় চলত, তার নাম ছিল মনসুরাগঞ্জ। সিরাজউদ্দৌলার অনেক দিনের সাধ ছিলো দৃষ্টি নন্দন একটি মহল দাঁড় করাবেন বাংলার হৃদয়ে। তার সেই স্বপ্ন রঙে আঁকা প্রাসাদটির নাম রাখতে চেয়েছিলেন সহধর্মিনী লুৎফার নামে। লুৎফুন্নিসার বাঁধাতে সেটি সম্ভব হয়নি।
লুৎফুন্নিসা বলেছিলেন- “আমি ঝিল হতে চাই না। আমি নির্জলা লুৎফা থাকতে চাই। আমি চাই না, তুমি আর আমি লুৎফা ঝিলের মাঝে বেঁচে থাকি। তার চেয়ে তুমি এমন একজন দেশপ্রেমী নবাব হও, যাতে তোমাকে কেউ কোনদিন না ভুলে। তুমি যদি সেভাবে অমর হও, তাহলে আমিতো তোমার সঙ্গেই বেঁচে থাকবো প্রতি যুগে। আমি যে তোমার প্রানের আধখানা।”
সিরাজউদ্দৌলা- লুৎফার স্বপ্নের প্রাসাদ ‘হিরাঝিল’ নির্মাণে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে ছিলেন নানা নবাব আলিবর্দী খান। এই বাগবাগিচায় প্রাধান্য পেল পারস্যের সৌরভ।
সিরাজউদ্দৌলার প্রিয়তমা স্ত্রী- বেগম লুৎফুন্নিসা পারস্যের প্রকৃতি থেকে নির্যাসিত বিশেষ সৌরভ গায়ে মেখে নিজেকে সুরভিত করতেন। তাই লুৎফুন্নিসার নৌকা যখন ভাগিরথী নদীতে ভেসে যাচ্ছিল তখন বাতাসের দারুণ সুরভিতে আমোদিত হয়ে উঠেছিলেন বাংলার যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা।
আবার সুগন্ধিপ্রেমী নামে লুৎফুন্নিসার কাছে পরিচিত ছিলেন বাংলার বীর পুত্র সিরাজউদ্দৌলা। যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা ও লুৎফুন্নিসা দুধে গোলাপের পাপড়ি ফেলে আর পারস্যের সুগন্ধি মিশিয়ে তাতে গোসল করতেন এবং প্রচুর পারস্যের সুগন্ধ গায়ে মাখতেন। আর এতে সুন্দর স্নিগ্ধ গন্ধের পারস্যের সৌরভে ছেয়ে যেতো, লুৎফা সিরাজউদ্দৌলার স্বপ্ন রঙে সাজানো ‘হিরাঝিল’- প্রাসাদ।
সোনাঝরা চাঁদনী রাতে প্রায়ই ভেসে যেত লুৎফার সোনার তরী। সেই দৃশ্য যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলাকে ভ্রান্তি জাগাতো, একি স্বপ্ন না মায়া? কিন্তু প্রায় এক মাইলব্যাপী ভাগীরথী নদীর সমীরণই বলে দিতো তাদের ভালোবাসার অনেক না বলা কথা।
বেগম লুৎফুন্নিসা হেঁটে গেলে যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা ভালোবেসে বলতেন পদ্মগন্ধা। লুৎফার সাতনরী হার হাতে নিয়ে শুঁকে দেখতেন যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা।
সেইসব দিনগুলোয়… হিরাঝিলের পাশে নানা রকম বাহারি ফুল গাছের শোভা ছিল। ঝিলের স্বচ্ছ জলে ছোট্ট একখানা রঙিন বজরা, ঢেউয়ের তালে তালে দুলত। হিরাঝিলের মহলে তখন হাজারো বাতি শোভা পেত। কত বিচিত্র রঙের আলোয় ঝলমল করতো হিরাঝিল। একে একে জ্বলে উঠতো হিরাঝিলের আলো। ঝিলের জল সেই আলোয় চকচক করতো। সিরাজ এবং লুৎফার হৃদয়ের ভালোসায় গাঁথা অনেক কথা রয়ে গেছিলো এই হিরাঝিলে।
তাইতো সিরাজ শহীদ হওয়ার পরে হিরাঝিলে রোজ সন্ধ্যায় নামতো এক অজানা নিস্তব্ধতা, শোনা যেত কিছু অজানা মায়াবি কান্নার শব্দ!
এই হিরাঝিলকে ঘিরে সিরাজ এবং লুৎফা গেঁথে ছিলেন সুন্দর কিছু ভালোসার স্বপ্ন। সেই ভালোসা নিমেষেই চুরমার করে দিলো ইংরেজ এবং বাংলার বিশ্বাসঘাতকেরা। তাইতো হিরাঝিলের সুখ সিরাজ হত্যাকারীদের বেশিদিন সইলো না। হিরাঝিল আপন করে নিলো না বাংলার বেঈমান, বিশ্বাসঘাতকদের! “সকাল সাঁঝে কুড়িয়ে পাওয়া ঝরা ফুলের মত, লাল সবুজের হৃদয়ে হৃদয়ে গানের মালায় যুগে যুগে প্রতি যুগে গাঁথা হবে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, বেগম লুৎফুন্নিসার হৃদয় ছোঁয়া অমর সব ভালবাসার গল্প কথা ।”
বন্ধুরা… ভালোবাসাবাসীর যে চিরায়ত ঘটনা তা কিন্তু চলে আসছে সুপ্রাচীনকাল থেকেই। এমনকি মানব ইতিহাস ছেড়ে কল্পকাহিনী আর পৌরানিক জগতেও ভালোবাসার অবস্থান দীর্ঘদিন থেকেই। যুগে যুগে অমর প্রেম নিয়ে যত গল্পকথা রচিত হয়েছে তার মধ্যে ইরানি প্রেম গাঁথা শিরি-ফরহাদের ভালোবাসার কথা আজও মানুষের মুখে মুখে।
তবে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে প্রাচীন এই ইরানি লোকগাঁথাটিকেও। এর মধ্যে সবচেয়ে সমর্থনযোগ্য যে সূত্রগুলো পাওয়া যায় তাতে শিরিনকে দেখানো হয়েছে রাজকন্যা হিসেবে। তবে নায়ক ফরহাদের পরিচয় দিতে যেয়ে কেউ তাকে উল্লেখ করেছেন ভাস্কর হিসেবে, আবার কেউবা তাকে আখ্যায়িত করেছেন বাঁধ নির্মাতা হিসেবে।
এক্ষেত্রে যেসব ইতিহাসবিদ ফরহাদকে বাঁধ নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাদের যুক্তি হলো ফর্হাদ শব্দটি হলো ‘বৃত্ত’ বা বাঁধের কাছাকাছি। এই ধারায় বিশ্বাসীদের বর্ণিত, কাহিনীতে দেখা যায় নায়িকা শিরি একসময় ফরহাদকে বলেছিল যে… “তুমি যদি ওই নদীতে বাঁধ তৈরি করতে পারো তাহলেই আমাকে পাবে।”
ফরহাদ শিরিকে পাবার জন্য এই অসম্ভবকে সম্ভব করার আশায় কাজে নামে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাঁধ ভেঙে জলের তোড়ে মারা যায় ফরহাদ। আর তার দুঃখে শিরিও পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে!
হয়তো এরই নাম ভালোবাসা।
লেখক :- নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা ( নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম বংশধর ; সম্পাদক – সাপ্তাহিক পলাশী )।
আরও পড়ুন:
জেমস আব্দুর রহিম রানা




















