— সাংবাদিক হাসান মামুন
শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে কোনো আইন, নীতিমালা বা সংস্কারমূলক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত-শিক্ষার্থীর অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষার মান উন্নত করা এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং করানো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একদিকে শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিকতা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানের বৈষম্য। ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ জারি করে। নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ নীতিমালার উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষকের ব্যক্তিগতভাবে পড়ানো বন্ধ করা নয়; বরং বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান যাতে কোচিংনির্ভরতার কাছে পরাজিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা। কারণ একজন সরকারি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষক রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সহায়তায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় যথাযথভাবে পাঠদান করা, শিক্ষার্থীদের পাঠ বুঝিয়ে দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা তাঁর মৌলিক পেশাগত দায়িত্ব। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, কোচিং বন্ধ করা হচ্ছে, কিন্তু বিদ্যালয়ের ভেতরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে তো ? দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান সমান নয়। শহরের একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংখ্যা, সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার পরিবেশ কিংবা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তার তুলনা অনেক ক্ষেত্রেই করা যায় না। ফলে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠের পাশাপাশি অতিরিক্ত শিক্ষা নিতে চাইলে তার প্রয়োজন ও বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং করানো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একদিকে শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিকতা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানের বৈষম্য। ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ জারি করে। নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ নীতিমালার উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষকের ব্যক্তিগতভাবে পড়ানো বন্ধ করা নয়; বরং বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান যাতে কোচিংনির্ভরতার কাছে পরাজিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা। কারণ একজন সরকারি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষক রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সহায়তায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় যথাযথভাবে পাঠদান করা, শিক্ষার্থীদের পাঠ বুঝিয়ে দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা তাঁর মৌলিক পেশাগত দায়িত্ব। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, কোচিং বন্ধ করা হচ্ছে, কিন্তু বিদ্যালয়ের ভেতরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে তো ? দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান সমান নয়। শহরের একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংখ্যা, সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার পরিবেশ কিংবা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তার তুলনা অনেক ক্ষেত্রেই করা যায় না। ফলে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠের পাশাপাশি অতিরিক্ত শিক্ষা নিতে চাইলে তার প্রয়োজন ও বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। একটি গ্রামের শিক্ষার্থীকে ভালো শিক্ষা পেতে যেন বাধ্যতামূলকভাবে শহরমুখী হতে না হয়, সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।একইভাবে কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু বিদ্যালয়ের দুর্বল পাঠদানের কারণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হলে সেটিও শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত।
তাই কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠের মান, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল এবং শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারক করা প্রয়োজন।
কারণ কোচিং বন্ধ করা একটি নীতিগত পদক্ষেপ হতে পারে; কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত চূড়ান্ত লক্ষ্য।
একজন সরকারি চিকিৎসক কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালন করবেন, এটি যেমন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা, তেমনি সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষকও কর্মঘণ্টায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষা দেবেন, এটিই স্বাভাবিক ও ন্যায্য প্রত্যাশা। কর্মঘণ্টায় দায়িত্বে অবহেলা করে ব্যক্তিগতভাবে অর্থের বিনিময়ে সেবা প্রদান কোনো পেশাতেই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
তবে কর্মঘণ্টার বাইরে বৈধ ও নীতিমালা-সম্মত কোনো কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আইন কী অনুমোদন করে এবং কোন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে অনুসরণ করা জরুরি। কারণ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, সুনির্দিষ্ট বিধান ও প্রমাণকে ভিত্তি করতে হবে।
সম্প্রতি পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে নীতিমালা অমান্য করে কোচিং পরিচালনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের বাধা ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট ২০২৬ ইং বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে একটি কিন্ডারগার্টেনের পেছনের একটি কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে তদন্ত বা যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার আগে অপরাধ হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। একইভাবে সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকদের বাধা বা হামলার অভিযোগও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরও আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংবাদ সংগ্রহে বাধা, সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখানো বা হামলার অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা, তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা জরুরি।
শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবী-কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। আবার অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না। আইনের শাসনের মূল সৌন্দর্য এখানেই, অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণ মূল্যায়ন হবে এবং নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারিত হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের উচিত শুধু কোচিং বন্ধে অভিযান পরিচালনা না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরের শিক্ষার মানও নিয়মিত মূল্যায়ন করা। শিক্ষক যথাসময়ে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন কি না, নির্ধারিত পাঠক্রম সম্পন্ন করছেন কি না, শিক্ষার্থীরা পাঠ বুঝতে পারছে কি না এবং বিদ্যালয়ের ফলাফল ও শিক্ষার পরিবেশ কেমন, এসব সূচকের ভিত্তিতে নিয়মিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কারণ কোনো শিক্ষার্থী যদি বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা পায়, তাহলে কোচিংয়ের ওপর তার নির্ভরতা অনেকাংশে স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। আর যদি বিদ্যালয়ের পাঠদান দুর্বল থাকে, শুধু কোচিং নিষিদ্ধ করে সেই শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে সরকার চাইলে দক্ষ ও যোগ্য তরুণদের জন্য আইন ও নীতিমালার আওতায় বৈধ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বাণিজ্যিক স্বার্থের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক কোচিংয়ে নেওয়া কিংবা সরকারি দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ রাখা যাবে না।
রাষ্ট্রের কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোচিং বন্ধ হবে কি না’-এতটুকু হওয়া উচিত নয়। বরং বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত-একজন শিক্ষার্থী তার বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী যেন ভালো শিক্ষার জন্য শহরে ছুটতে বাধ্য না হয়; একজন রোগী যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য অকারণে দূরবর্তী শহরে যেতে বাধ্য না হন-এমন একটি জনবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিক্ষা ও চিকিৎসা-দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকের প্রত্যাশা একই: দক্ষ পেশাজীবী, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি এবং মানসম্মত সেবা।
তাই কোচিং নীতিমালার প্রয়োগে একদিকে যেমন শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব, নৈতিকতা ও আইন মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর অধিকার, বাস্তবতা এবং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের উদ্দেশ্য শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়; আইনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য জনস্বার্থ রক্ষা করা।
একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা তখনই গড়ে উঠবে, যখন শিক্ষক তাঁর প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জবাবদিহির মধ্যে থাকবে, রাষ্ট্র নিয়মিত তদারক করবে এবং শিক্ষার্থী তার অধিকার অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা পাবে।
সুশিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়। সুশিক্ষা একজন মানুষকে জ্ঞানী করার পাশাপাশি বিনয়ী, ভদ্র, বিবেকবান, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-কোচিংনির্ভরতা নয়, বিদ্যালয়নির্ভর মানসম্মত শিক্ষা; নিষেধাজ্ঞা নয়, দায়িত্বশীলতা; এবং অভিযোগ নয়, প্রমাণভিত্তিক জবাবদিহি।
লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক শেখ হাসান মামুন।
তাই কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠের মান, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল এবং শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারক করা প্রয়োজন।
কারণ কোচিং বন্ধ করা একটি নীতিগত পদক্ষেপ হতে পারে; কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত চূড়ান্ত লক্ষ্য।
একজন সরকারি চিকিৎসক কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালন করবেন, এটি যেমন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা, তেমনি সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষকও কর্মঘণ্টায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষা দেবেন, এটিই স্বাভাবিক ও ন্যায্য প্রত্যাশা। কর্মঘণ্টায় দায়িত্বে অবহেলা করে ব্যক্তিগতভাবে অর্থের বিনিময়ে সেবা প্রদান কোনো পেশাতেই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
তবে কর্মঘণ্টার বাইরে বৈধ ও নীতিমালা-সম্মত কোনো কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আইন কী অনুমোদন করে এবং কোন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে অনুসরণ করা জরুরি। কারণ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, সুনির্দিষ্ট বিধান ও প্রমাণকে ভিত্তি করতে হবে।
সম্প্রতি পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে নীতিমালা অমান্য করে কোচিং পরিচালনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের বাধা ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট ২০২৬ ইং বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে একটি কিন্ডারগার্টেনের পেছনের একটি কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে তদন্ত বা যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার আগে অপরাধ হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। একইভাবে সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকদের বাধা বা হামলার অভিযোগও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরও আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংবাদ সংগ্রহে বাধা, সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখানো বা হামলার অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা, তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা জরুরি।
শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবী-কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। আবার অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না। আইনের শাসনের মূল সৌন্দর্য এখানেই, অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণ মূল্যায়ন হবে এবং নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারিত হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের উচিত শুধু কোচিং বন্ধে অভিযান পরিচালনা না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরের শিক্ষার মানও নিয়মিত মূল্যায়ন করা। শিক্ষক যথাসময়ে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন কি না, নির্ধারিত পাঠক্রম সম্পন্ন করছেন কি না, শিক্ষার্থীরা পাঠ বুঝতে পারছে কি না এবং বিদ্যালয়ের ফলাফল ও শিক্ষার পরিবেশ কেমন, এসব সূচকের ভিত্তিতে নিয়মিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কারণ কোনো শিক্ষার্থী যদি বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা পায়, তাহলে কোচিংয়ের ওপর তার নির্ভরতা অনেকাংশে স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। আর যদি বিদ্যালয়ের পাঠদান দুর্বল থাকে, শুধু কোচিং নিষিদ্ধ করে সেই শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে সরকার চাইলে দক্ষ ও যোগ্য তরুণদের জন্য আইন ও নীতিমালার আওতায় বৈধ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বাণিজ্যিক স্বার্থের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক কোচিংয়ে নেওয়া কিংবা সরকারি দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ রাখা যাবে না।
রাষ্ট্রের কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোচিং বন্ধ হবে কি না’-এতটুকু হওয়া উচিত নয়। বরং বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত-একজন শিক্ষার্থী তার বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী যেন ভালো শিক্ষার জন্য শহরে ছুটতে বাধ্য না হয়; একজন রোগী যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য অকারণে দূরবর্তী শহরে যেতে বাধ্য না হন-এমন একটি জনবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিক্ষা ও চিকিৎসা-দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকের প্রত্যাশা একই: দক্ষ পেশাজীবী, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি এবং মানসম্মত সেবা।
তাই কোচিং নীতিমালার প্রয়োগে একদিকে যেমন শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব, নৈতিকতা ও আইন মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর অধিকার, বাস্তবতা এবং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের উদ্দেশ্য শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়; আইনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য জনস্বার্থ রক্ষা করা।
একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা তখনই গড়ে উঠবে, যখন শিক্ষক তাঁর প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জবাবদিহির মধ্যে থাকবে, রাষ্ট্র নিয়মিত তদারক করবে এবং শিক্ষার্থী তার অধিকার অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা পাবে।
সুশিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়। সুশিক্ষা একজন মানুষকে জ্ঞানী করার পাশাপাশি বিনয়ী, ভদ্র, বিবেকবান, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-কোচিংনির্ভরতা নয়, বিদ্যালয়নির্ভর মানসম্মত শিক্ষা; নিষেধাজ্ঞা নয়, দায়িত্বশীলতা; এবং অভিযোগ নয়, প্রমাণভিত্তিক জবাবদিহি।
লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক শেখ হাসান মামুন।

- সাংবাদিক হাসান মামুন 
























