
আবু জাফর বিশ্বাস, ঝালকাঠি: স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এরই মধ্যে ঝালকাঠিতে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরা। জেলার চার উপজেলা, দুই পৌরসভা ও ৩২টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী অক্টোবরকে সম্ভাব্য নির্বাচনী সময় ধরে মাঠ গোছাচ্ছে দুই দল।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিতে প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবারই প্রথম তৃণমূলের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপকভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি পৌরসভাসহ অধিকাংশ উপজেলা ও ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ এগিয়েছে দলটি।
রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয়ভাবে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা। একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে অনেক ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ডে দলটির প্রার্থীদের জয় পাওয়া কঠিন হতে পারে।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূলে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় একক প্রার্থী নিশ্চিত করার বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ হোসেন বলেন, নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী দলের সব প্রার্থীকে নিয়ে আলোচনা করা হবে। দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেউ প্রার্থী হলে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমান বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত ভালো ফল করবে। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঝালকাঠি জেলা সভাপতি ইলিয়াস সিকদার ফরহাদ বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে তা ভোটারদের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি করবে।
ঝালকাঠি পৌরসভা
ঝালকাঠি পৌরসভায় মেয়র পদে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম নুপুর, সাবেক জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাহবুব আলম খান, শহর বিএনপির সভাপতি আনিচুর রহমান তাপু এবং জেলা যুবদলের আহ্বায়ক শামীম তালুকদারের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া সাবেক পৌর মেয়র আব্দুল হালিম গাজী এবং ঝালকাঠি প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও অতিরিক্ত পিপি আকাশ সিকদারও গণসংযোগ করছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী জেলা আমির হাফিজুর রহমানকে মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে ছয়টিতে কাউন্সিলর পদে জামায়াত প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বিএনপির প্রতিটি ওয়ার্ডেই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন।
নলছিটি পৌরসভা
নলছিটি পৌরসভায় বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক তৌহিদ আলম মান্না, সাবেক মেয়র মজিবুর রহমান, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিম গাজী, সাবেক কাউন্সিলর এনায়েত করিম মিশু এবং সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী জাহাঙ্গীর রয়েছেন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে সাবেক ছাত্রশিবির নেতা কামরুজ্জামান মান্নাকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
নলছিটি উপজেলা
নলছিটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনিচুর রহমান হেলাল, সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম সজিদ এবং জেলা বিএনপির সাবেক জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদক কবির হোসেন জোমাদ্দারের নাম আলোচনায় রয়েছে। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জেলা নায়েবে আমির আমিনুল ইসলামের নাম প্রচার হচ্ছে।
নলছিটির ১০ ইউনিয়নেও বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। ভৈরবপাশায় বাসার চৌধুরী ও বেল্লাল মৃধা, কুলকাঠিতে রফিক মোল্লা ও জুলফিকার বিশ্বাস, মোল্লারহাটে সালাম হাওলাদার ও মোহাম্মদ আলম, সুন্দিপুরে রতন খান ও দেলান মুন্সি, দপদপিয়ায় খন্দকার ওহিদুল ইসলাম বাদল ও মোহাম্মদ নান্টু মল্লিক, কুসঙ্গলে জুয়েল জোমাদ্দার ও মিজানুর রহমান, মগড়ে রব মল্লিক ও মঈন সরদার, রানাপাশায় সাইদুল ইসলাম রনি ও সুমন হাওলাদার, নাচনমহলে আজিজ খলিফা ও খোকন হাওলাদার এবং সিদ্ধকাঠিতে হাবিব মল্লিক ও হারুন সরদারের নাম আলোচনায় রয়েছে।
রাজাপুর উপজেলা
রাজাপুর উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আজিজুল হক, যুবদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাকারিয়া সুমন, যুবদলের সদস্যসচিব নাজমুল হক এবং উলামা দলের আহসান হাবিব সোহাগ গণসংযোগ করছেন। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এখনো চেয়ারম্যান পদে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
ছয় ইউনিয়নের মধ্যে সদর ইউনিয়নে মাসুম বিল্লাহ পারভেজ ও নয়ন তালুকদার, বড়ইয়ায় ফারুক ফকির ও আতিকুর রহমান আতিক এবং জামায়াতের মাওলানা সাইয়েদ আহমেদ, গালুয়ায় ওয়ালিউল হাসনাত হাফিজ ও আমিনুল ইসলাম আমিন এবং জামায়াতের মিলন গাজী, সাতুরিয়ায় নুরুল ইসলাম নানু ও ফেরদৌস হোসেন নুরু এবং জামায়াতের ইউসুফ বিন সালাম, শুক্তগড়ে গোলাম কিবরিয়া বরকত ও জামায়াতের মাওলানা কবির হোসেন এবং মঠবাড়ীতে জাহিদুল ইসলাম ও আব্দুল হক নান্টুর নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
কাঠালিয়া উপজেলা
কাঠালিয়া উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির উপজেলা ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জালুর রহমান আকন, শামীম সিকদার ও মো. শহিদুল ইসলামের নাম আলোচনায় রয়েছে। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে এখনো তেমন আলোচনা নেই।
তবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সরব হয়ে উঠেছে কাঠালিয়ার রাজনীতি। সদর ইউনিয়নে বিএনপির জয়নাল আবেদীন ও ফয়সাল আহম্মদ এবং জামায়াতের মাওলানা নাসির উদ্দিন, আমুয়ায় বিএনপির আখতার হোসেন নিজাম মিরবহর ও জাকির গোলদার এবং জামায়াতের মাস্টার মজিবর রহমান, পাটিকালঘাটায় বিএনপির খলিলুর রহমান ও আবুল কালাম আজাদ এবং জামায়াতের শহিদ হাওলাদার, চেঁচরিরামপুরে বিএনপির মামুন তর রশিদ ও মাহবুব জোমাদ্দার এবং জামায়াতের নুরজ্জামান, শৌলজালিয়ায় বিএনপির শামসুল আলম ও মাসুদ হাওলাদার এবং জামায়াতের বেলায়েত হোসেন এবং আওরাবুনিয়ায় বিএনপির মাওলানা গফুর হাওলাদার ও অলিউর রহমান মুন্সি গণসংযোগ করছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় ঝালকাঠির তৃণমূল রাজনীতি ইতোমধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা হলে প্রার্থী বাছাই, দলীয় মনোনয়ন এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ—দুই দলের জন্যই বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আবু জাফর বিশ্বাস, ঝালকাঠি 



















