
— ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতিবছর ৩ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার দিবস। আধুনিক স্থাপত্য, প্রকৌশল ও নগরসভ্যতার বিস্ময়কর অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে সুউচ্চ ভবন আজ বিশ্বের বড় শহরগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সীমিত জমিতে বিপুল মানুষের আবাসন, অফিস, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন নাগরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রয়োজন থেকেই উল্লম্ব নগরায়ণের প্রসার ঘটেছে। আকাশছোঁয়া ভবন তাই কেবল একটি স্থাপত্য নয়; এটি আধুনিক নগরজীবনের পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।তবে ভবনের উচ্চতা যত বাড়ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন—আমরা কি শুধু আকাশ ছোঁয়ার স্থাপনা তৈরি করছি, নাকি মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর নগরও গড়ে তুলছি? কারণ একটি শহরের উন্নয়ন শুধু তার ভবনের উচ্চতা দিয়ে বিচার করা যায় না। নাগরিকের সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিবেশ, চলাচলের সুবিধা এবং জরুরি সেবার নিশ্চয়তাই হওয়া উচিত উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি।
উল্লম্ব নগরায়ণ কেন প্রয়োজন
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরমুখী মানুষের সংখ্যা এবং জমির সীমাবদ্ধতা শহরগুলোকে উল্লম্বভাবে সম্প্রসারণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একই জায়গায় অধিক মানুষের বসবাস ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে বহুতল ভবন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে বহুতল ভবনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এটি নগরের আবাসন চাহিদা পূরণে সহায়ক হলেও শুধু ভবন নির্মাণ করলেই পরিকল্পিত নগরায়ণ হয় না। একটি ভবনের সঙ্গে রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন, হাসপাতাল, খেলার মাঠ ও সবুজ এলাকার সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ একটি সুউচ্চ ভবনকে বিচ্ছিন্ন স্থাপনা হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর নগর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর ভবন কেমন হওয়া উচিত
মানুষ তার জীবনের দীর্ঘ সময় ঘর, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ভবনের ভেতরে কাটায়। তাই ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তার স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো, বায়ু চলাচল, পরিচ্ছন্নতা, উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ একটি স্বাস্থ্যকর ভবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আলো-বাতাসের ঘাটতি এবং অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ভবনের পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে। আর্দ্রতা ও ছত্রাকের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই সুউচ্চ ভবনের নকশায় শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য, লবি বা আধুনিক সুবিধা নয়—মানুষের বসবাসের উপযোগী অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
অগ্নিনিরাপত্তায় কোনো অবহেলা নয়
বহুতল ভবনের অন্যতম বড় ঝুঁকি অগ্নিকাণ্ড।
নিচু ভবনের তুলনায় উঁচু ভবন থেকে জরুরি
সময়ে মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া কঠিন। ফলে অগ্নিনিরাপত্তা নির্মাণের পরের বিষয় নয়; এটি ভবনের নকশা ও নির্মাণপরিকল্পনার শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।নিরাপদ জরুরি সিঁড়ি, বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জরুরি আলো এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা অপরিহার্য। এসব সরঞ্জাম স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারিক মহড়ার মাধ্যমে প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। ভবনের বাসিন্দা ও কর্মীদেরও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। আতঙ্কের পরিবর্তে সুশৃঙ্খলভাবে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি মাথায় রাখতে হবে
বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। ঘনবসতিপূর্ণ নগরে বহুতল ভবনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সম্ভাব্য ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভবনের ভিত্তি, কাঠামো, নির্মাণসামগ্রী এবং প্রকৌশল নকশায় নির্ধারিত মান অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। নির্মাণ বিধিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি নির্মাণকাজে কার্যকর তদারকি থাকতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু ভবনকে প্রস্তুত করলেই হবে না; বাসিন্দাদেরও প্রস্তুত করতে হবে। জরুরি সময়ে কীভাবে নিরাপদে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে এবং কোথায় সহায়তা পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ
আধুনিক বহুতল ভবন মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কিন্তু নগরজীবনে হাঁটার সুযোগ কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার প্রবণতা মানুষের শারীরিক সক্রিয়তাকে সীমিত করতে পারে। ভবন ও আবাসিক এলাকার পরিকল্পনায় নিরাপদ হাঁটার জায়গা, খোলা পরিসর, শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য সিঁড়িও ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। এখানে মূল লক্ষ্য হলো নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া ও সক্রিয় থাকার সুযোগ তৈরি করা।
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবুজ পরিবেশ
শহরের কংক্রিটনির্ভর বিস্তার, যানজট, শব্দদূষণ ও প্রকৃতি থেকে দূরত্ব মানুষের মানসিক স্বস্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সুউচ্চ ভবনের পাশাপাশি সবুজ এলাকা ও উন্মুক্ত পরিসর সংরক্ষণ করা জরুরি। বৃক্ষরোপণ, ছাদবাগান, ছোট পার্ক, হাঁটার পথ এবং সামাজিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী উন্মুক্ত জায়গা নগরবাসীর জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। শিশুদের খেলাধুলা এবং বয়স্কদের হাঁটা ও বিশ্রামের সুযোগও পরিকল্পনায় রাখা দরকার।
শহর কেবল ইট-কংক্রিটের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবনযাপনের জায়গা। তাই নগর উন্নয়নে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।
সবার জন্য নিরাপদ ভবন
একটি ভবনের নিরাপত্তা তখনই পূর্ণাঙ্গ হয়, যখন শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বারান্দা, জানালা, ছাদ ও সিঁড়িতে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের উপযোগী প্রবেশপথ, বয়স্কদের সহজ চলাচল এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
জরুরি পরিস্থিতিতে যারা দ্রুত চলাচল করতে পারেন না, তাদের সহায়তার জন্য ভবনভিত্তিক পরিকল্পনা থাকা উচিত। এটি শুধু স্থাপত্যগত বিষয় নয়; এটি মানবিক দায়িত্বও।
জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ
বহুতল ভবনে অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাম্বুলেন্স যাতে সহজে ভবনের কাছে পৌঁছাতে পারে, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। জরুরি যোগাযোগ নম্বর এবং নিকটবর্তী চিকিৎসাকেন্দ্রের তথ্য ভবন ব্যবস্থাপনার কাছে সংরক্ষিত থাকা উচিত। প্রয়োজনে রোগীকে দ্রুত নিরাপদে ভবন থেকে বের করে আনার উপযোগী ব্যবস্থাও থাকতে হবে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে ভবন ব্যবস্থাপনার সমন্বয় থাকলে সংকট মোকাবিলা সহজ হয়।
নির্মাণের পরও চাই নিয়মিত তদারকি
ভবন নির্মাণের সময় নিয়ম মেনে কাজ করা যেমন জরুরি, ব্যবহারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও তেমন প্রয়োজনীয়। লিফট, বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম, পানি, গ্যাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। একটি ভবনকে নির্মাণের সময় নিরাপদ করে রেখে দীর্ঘদিন কোনো পরিদর্শন ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। সময়ের সঙ্গে যন্ত্রপাতি ও কাঠামোর বিভিন্ন অংশের রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন হয়। তাই নিরাপত্তাকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় সমন্বিত উদ্যোগ
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতায় বহুতল ভবন নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর সঙ্গে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।
ভবনের অনুমোদন, নকশা, নির্মাণ, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি প্রয়োজন। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় প্রকৌশলী, স্থপতি, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
ভবনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি রাস্তা, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ এলাকা, গণপরিবহন ও জরুরি সেবার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। নইলে উঁচু ভবন বাড়লেও নগরের বাসযোগ্যতা বাড়বে না।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার দিবস আধুনিক স্থাপত্য ও প্রযুক্তির অসাধারণ অগ্রগতিকে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ। কিন্তু এই দিবসের তাৎপর্য কেবল আকাশছোঁয়া ভবনের নান্দনিকতা বা প্রকৌশল দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের নগর উন্নয়নের লক্ষ্য ও দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে শেখায়।
ভবনের উচ্চতা যত বাড়বে, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও তত বাড়াতে হবে। এমন নগর আমাদের প্রয়োজন, যেখানে আধুনিক স্থাপত্য থাকবে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা উপেক্ষিত হবে না; উন্নত ভবন থাকবে, কিন্তু সবুজ পরিবেশ হারিয়ে যাবে না; প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে, কিন্তু মানবিকতা পিছিয়ে পড়বে না। ৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—শুধু আকাশছোঁয়া ভবন নয়, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর নগরও গড়ে তুলব। কারণ একটি শহরের প্রকৃত উচ্চতা তার ভবনের উচ্চতায় নয়; তার মানুষের সুস্থতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনমানের উচ্চতায়।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল : drmazed96@gmail.com

--- ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 
























