
শ.ম.গফুর, কক্সবাজার: কক্সবাজারের উখিয়ায় সরকার ঘোষিত অভিযানের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার ও উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী ঝাড়ু হাতে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন। এ সময় উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর সাহেদুল ইসলাম চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী আয়োজনটি দেখে পরিচ্ছন্ন উখিয়ার প্রত্যাশায় আশাবাদী হয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে তাঁদের সেই আশায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, উদ্বোধনের একদিনের কর্মসূচির পর পরিচ্ছন্নতার ধারাবাহিক কাজ কোথায়? প্রতিদিন যে ময়লা পরিষ্কার করার কথা, তা কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উখিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকলেও তা অপসারণে নিয়মিত ও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রবে জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
উখিয়া থেকে কোটবাজার যাওয়ার প্রবেশপথে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পূর্ব পাশে থাকা ময়লার ভাগাড় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন কবির জুশান ও স্থানীয় মোহাম্মদ নুরুল আলম। তারা বলেন, “সড়কের পাশে ময়লার ভাগাড় দেখে মনে হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদেরা যেন এগুলো দেখেন না। আমরা আশা করব, সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে দ্রুত কোটবাজারের এই ময়লার ভাগাড় দূর করা হবে। মানুষ লোকদেখানো কাজ পছন্দ করেন না; তাঁরা নিয়মিত ও কার্যকর পরিচ্ছন্নতা চান।উখিয়া সদর এলাকার বাসিন্দা নুরুল আবসার বলেন, বঙ্গমাতা সরকারি মহিলা কলেজ ও প্রশাসনিক উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তার পাশে জমে থাকা ময়লা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে পথচারীদের হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। শিক্ষার্থীসহ প্রতিদিনের যাতায়াতকারীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভোগের।স্থানীয় কাজী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উখিয়ার সর্বত্রই ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে আছে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এই অঞ্চলের নির্মল বাতাস যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বন উজাড়, গাছপালা কর্তন, পাহাড় কাটা এবং বাজারের ময়লা রাতের আঁধারে বিভিন্ন স্থানে ফেলে যাওয়ার কারণে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে। দিনের বেলায় দুর্গন্ধের কারণে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এতে নানা রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ব্যবস্থা না থাকা, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের অভাব এবং যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে বস্তাভর্তি ময়লা ফেলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সড়কের পাশে গড়ে উঠছে একের পর এক অনিয়ন্ত্রিত ময়লার স্তূপ।
পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক সরাসরি। জমে থাকা ময়লা, নোংরা পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এরই মধ্যে রাজাপালং এলাকার জাহেদের ছেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বেলাল নামের এক সাংবাদিক ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এসব ডেঙ্গু আক্রান্তের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো ময়লার ভাগাড়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।উখিয়ার মতো সীমান্তবর্তী ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়, এটি নিয়মিত জনসেবা ও জনস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অংশ। শুধু ঝাড়ু হাতে উদ্বোধনী ছবি তোলা নয়, ময়লা অপসারণের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান, নিয়মিত পরিবহন ও নিষ্পত্তি, বাজারভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম নিশ্চিত করাই এখন জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে লোকদেখানো কর্মসূচিতে পরিণত না করে এর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। কোটবাজারের ময়লার ভাগাড়সহ উখিয়া সদর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে জমে থাকা আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
এক দিনের ঝাড়ুতে উদ্বোধন হতে পারে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কিন্তু পরিচ্ছন্ন উখিয়া গড়তে প্রয়োজন প্রতিদিনের দায়িত্বশীলতা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক নজরদারি।

শ.ম.গফুর, কক্সবাজার 



















