সুলতান এম. মাইনউদ্দিন: ঢাকা এমন একটি শহর, যে শহর খুব কমই স্থির থাকে। এর রাস্তাগুলো সারাক্ষণ চলমান, অথচ অনেক সময় মনে হয়—কিছুই যেন এগোচ্ছে না। মানুষ ঘর থেকে বের হয় একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের কথা মাথায় রেখে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কখন, কীভাবে, এমনকি আদৌ সেখানে পৌঁছানো যাবে কি না—অনেকটাই যেন ঠিক করে দেয় শহরটি নিজেই। যানজট, নির্মাণকাজ, শব্দ, মানুষের ভিড়, অসংখ্য যানবাহন আর অসমাপ্ত নানা পরিসর—সবকিছু মিলেই আমাদের প্রতিদিনের শহুরে জীবনের অংশ। এই চলমানতার মধ্যেই আমরা যেমন বেঁচে আছি, তেমনি তার থেমে যাওয়ার মুহূর্তগুলোর সঙ্গেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।
কুনতাল বারই বহু বছর ধরে এই বাস্তবতাকে দেখছেন, অনুভব করছেন। ঢাকার সঙ্গে তাঁর শিল্পীসত্তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে মূলত শহরের রাস্তা, যানবাহন, রিকশা, চাকা আর অবিরাম চলাচলের দৃশ্যকে ঘিরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দৃশ্যগুলো তাঁর কাছে শুধু একটি ব্যস্ত শহরের ছবি হয়ে থাকেনি। এগুলো হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনযাপন, চলাফেরা, অপেক্ষা, সংগ্রাম এবং এই ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা নগরজীবনের মধ্যে নিজেদের জায়গা খুঁজে নেওয়ার এক উপায়।
‘Anatomy of Transit’-এ কুনতাল ঢাকাকে প্রায় একটি জীবন্ত শরীরের মতো দেখেছেন। রাস্তা হয়ে উঠেছে তার ধমনী, মোড়গুলো যেন চাপ ও সংঘাতের জায়গা, আর অসংখ্য যানবাহন সেই বৃহৎ নগরদেহের বিচ্ছিন্ন অথচ পরস্পর-নির্ভর অংশ। দূর থেকে শহরটিকে হয়তো সুশৃঙ্খল মনে হয়, কিন্তু একটু কাছে গেলেই দেখা যায়—তার ভেতরে জমে আছে বিশৃঙ্খলা, চাপ, পুনরাবৃত্তি, ক্লান্তি এবং একই সঙ্গে মানুষের অসাধারণ টিকে থাকার ক্ষমতা।
কুনতালের কাজের যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে, তা হলো—তিনি শুধু ঢাকাকে দেখান না, তিনি আমাদের প্রতিদিনের দেখা শহরটিকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করেন। এক সারি গাড়ি, একটি ব্যস্ত রাস্তা, একটি চাকা কিংবা কোনো যানবাহনের ছোট্ট একটি অংশ—এসবের মধ্যেও তিনি খুঁজে পান ক্লান্তি, তাড়না, আশা, অস্থিরতা কিংবা আটকে থাকার অনুভূতি। তাঁর কাজের মধ্যে তাই একসঙ্গে থাকে চলাচল ও স্থিরতা, স্বাধীনতা ও সীমাবদ্ধতা, বিশৃঙ্খলা ও ছন্দ।
তাঁর ছবিগুলোর মধ্যে আবার এক ধরনের পরিচিতিও আছে। আমরা এই রাস্তাগুলো চিনি। এই যানবাহনগুলো চিনি। যানজটে আটকে থেকে চারপাশে জীবনকে এগিয়ে যেতে দেখার অনুভূতিটাও আমাদের অচেনা নয়। কিন্তু কুনতাল যখন এই পরিচিত অভিজ্ঞতাগুলোকে তাঁর পেইন্টিং, ড্রয়িং ও মিক্সড-মিডিয়ার কাজে নিয়ে আসেন, তখন সেগুলো আবার নতুন এবং কিছুটা অচেনা হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের শহরকে শুধু একটি ভৌগোলিক বা শারীরিক জায়গা হিসেবে দেখতে বলেন না; বরং এমন একটি পরিসর হিসেবে দেখতে শেখান, যা প্রতিনিয়ত আমাদের অনুভূতি, চিন্তা এবং নিজেদের সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রভাবিত করে।
ঢাকার পরিবর্তন আমাদের দিয়েছে উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে চাপ, স্থানচ্যুতি এবং এমন এক দূরত্ব—যেখানে আমরা যে শহরটিকে কল্পনা করি, আর যে শহরের মধ্যে প্রতিদিন বাস করি, তাদের মধ্যে ফারাক ক্রমেই বাড়ছে। কুনতালের কাজ সেই টানাপোড়েনের মধ্যেই অবস্থান করে। তাঁর ঢাকা পুরোপুরি হতাশার শহর নয়, আবার এটি কোনো রোমান্টিক শহরের ছবিও নয়। এটি অস্থির, অসম্পূর্ণ, ভিড়ে ঠাসা—তবু প্রাণবন্ত।
আমাদের কাছে ‘Anatomy of Transit’ শেষ পর্যন্ত শুধু যানজট বা শহরের ব্যস্ততার গল্প নয়। এটি চলমানতার মধ্যে মানুষের অবস্থান নিয়ে একটি ভাবনা। আমাদের জীবনের কতটা সময় কোথাও যাওয়ার পথে কেটে যায়, কতটা সময় আমরা অপেক্ষা করি, আবার কতটা সময় নিজেদের জন্য সামান্য একটু জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করি—এই প্রদর্শনী সেই প্রশ্নগুলোর সামনে আমাদের দাঁড় করায়।
শহরের রাস্তা, যানবাহন আর অবকাঠামোর আড়ালে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের নিজস্ব গল্প এগিয়ে চলে। কুনতালের কাজ আমাদের সেই গল্পগুলোর কথাও মনে করিয়ে দেয়।
কুনতাল বারইয়ের শক্তি এখানেই—শহুরে জীবনের একেবারে পরিচিত, প্রায় উপেক্ষিত কিছু দৃশ্যকে তিনি এমনভাবে সামনে নিয়ে আসেন, যার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের থামতে হয়। যে শহরে আমরা প্রতিনিয়ত ছুটছি, সেই শহরেই তাঁর কাজ আমাদের এক মুহূর্ত থামতে বলে—এবং দেখতে বলে।

সুলতান এম. মাইনউদ্দিন 























