ঢাকা, বাংলাদেশ। , বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
তাজা খবর
অসুস্থ হনুমান চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিজেই হাসপাতালে হাজির মেধার স্বাক্ষরে দেশসেরা মনিরামপুরের সুরাইয়া ও অরিত্র ব্যারিস্টার জাইমা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করেছেন মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী

বাংলার নববর্ষর আগমন উপলক্ষে রং তুলিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নবীনগর মৃৎশিল্পীরা

আবু হাসান আপন , নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া)
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:০১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৫
  • / ৯০ বার পঠিত

বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামগঞ্জে, শহরে-বন্দরে নববর্ষ অত্যন্ত আনন্দণ্ডউল্লাসের সঙ্গে উদযাপিত হয়ে থাকে। শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার সব সম্প্রদায়ের জনগণ এ উৎসবমুখর দিনটি অতি আগ্রহের সঙ্গে উদযাপন করে থাকে। এ উৎসবে প্রধান অনুষঙ্গ বৈশাখী মেলা।

দেশের প্রাচীনতম শিল্পের মধ্যে মৃৎশিল্প একটি। আর এই প্রাচীনতম শিল্পের কারিগরেরা বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ বৎসর আগমন উপলক্ষে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর পৌর এলাকায় পালপাড়া নামে পরিচিত পাড়াগুলোতে এখন মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমের পণ্য নানান রঙে রং তুলির কাজ শেষের দিক। যুগ যুগ ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত কারিগররা তাদের গভীর ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে সুনিপুণ হাতের বিভিন্ন কারুকাজের মাধ্যমে মাটি দিয়ে তৈরি করেন নানা তৈজসপত্র।

এখন বাংলা নববর্ষকে ঘিরে নির্ঘুম ব্যস্ত সময় পার করছে নবীনগরে মৃৎশিল্পীরা। পহেলা বৈশাখ বাঙালির নববর্ষ। নববর্ষ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বসে বর্ষবরণ মেলা। সেই মেলায় চাহিদা থাকে নানা রকমের খেলনা, মাটির জিনিসপত্রের। মেলাকে দৃষ্টিনন্দন করতে মৃৎশিল্পীরা নিজের হাতে নিপুণ কারুকাজে মাটি দিয়ে তৈরি করতেন শিশুদের জন্য রকমারি পুতুল, ফুলদানি, রকমারি ফল, হাঁড়ি, কড়াই, ব্যাংক, বাসন, থালা, বাটি, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, টিয়া, ময়না, ময়ূর, মোরগ, খরগোশ, হাঁস, কলস, ঘটি, চুলা, ফুলের টবসহ মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র। আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মাটির তৈরি এসব জিনিসের বদলে বাজার দখল করছে প্লাস্টিক,

সিরামিকসহ অন্য সব সামগ্রী। তাই আধুনিক প্রযুক্তির তৈজসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাটির তৈরি অনেক পণ্যই হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাটির তৈরি কিছু তৈজসপত্র এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। শহরবাসীর দালান-কোটা সাজাতে মাটির তৈরি নানা পট-পটারি, ফুলদানি ও বাহারি মাটির হাঁড়ির কদর রয়েছে এখনো। সরজমিন গিয়ে জানা যায়, ২০ বছর আগেও নবীনগর উপজেলায় মৃৎশিল্পের দাপট ও কদর দুটোই ছিল। তখন উপজেলার ভোলাচং পৌরসভা  প্রায় এক হাজার পরিবার মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করত।

কিন্তু বর্তমানে এ উপজেলায় প্রায় পাঁচ শত পরিবার মৃৎশিল্পের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। আগের মতো চাহিদা আর পারিশ্রমিকের ন্যায্যমূল্য না থাকায় এ পেশার লোকজন অত্যন্ত দুঃখ-দুর্দশা আর হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় অন্য পেশায় তেমন খাপ খাওয়াতে পারছেন না তারা। কম লাভ জেনেও শুধু পারিশ্রমিকের আসায় বাপ-দাদার পুরানো ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো মাটি দিয়ে তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি, সরা, কলস, বাসন, মুড়ি ভাজার খোলা, কোলা, ভাটি, পিঠা তৈরির খাঁজ, জালের কাঠি, মাটির ব্যাংক ও জলকান্দা ইত্যাদি।

কুমারপল্লীতে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানান রঙের মাটির তৈরি তৈজসপত্র। ভোলাচং বাজার সংলগ্ন কুমার পল্লীতে সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমের পণ্যের বাজার। স্থানীয়রা কুমারপল্লীর ছোট ছোট দোকান থেকে তাদের পছন্দের সামগ্রী ক্রয় করছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারেরা আসছেন প্রতিদিন কুমার পল্লীতে। মাটির সামগ্রীতে মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের অনুভূতি, প্রেম-

বিরহের নানা দৃশ্যপট, মনোমুগ্ধকর ছবি হাতের স্পর্শে ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। অথচ আজ উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় এখন পুঁজির অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এখানকার মৃৎশিল্প। এই পেশায় এখন ভর করেছে অভাব-অনটন। মেলা-পার্বনেও তেমন চাহিদা নেই মাটির তৈজসপত্রের। তবে কিছু হোটেল-মিষ্টির দোকানে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজায় এখনও প্রয়োজন হয় মাটির সামগ্রীর। পহেলা বৈশাখে মাটির সরাইয়ে (সানকি) তে পান্তাভাত খাওয়ার রীতিও চালু আছে। উপজেলার ভোলাচং এলাকায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে এখনো  জড়িত রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টি পরিবার। তারা বিভিন্ন উৎসবসহ মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এখনো। তাই এখানে পুরুষ মৃৎশিল্পীর পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে কাজ করছেন মৃৎশিল্পী দুলাল পাল, বিশ্বজিৎ পাল, অনিকচন্দ্র পাল,পরিমল পাল জানান, প্রায় শত বছর আগে থেকে বাপ দাদার আমল হতে মৃৎশিল্পীর কাজ করে আসছে। বর্তমান বাজারে রং ও মাটির দাম বেশি থাকা আবার বাজারেও গত বছরের চেয়ে চাহিদা কম থাকা সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বাপ দাদার রীতির রেওয়াজটা মেনে চলছি। হয়তো আমাদের প্রজন্ম এটাকে ধরে রাখবে আমাদের পরের প্রজন্মে বিলুপ্তি হওয়ার সম্ভাবনা টা বেশি।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

বাংলার নববর্ষর আগমন উপলক্ষে রং তুলিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নবীনগর মৃৎশিল্পীরা

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:০১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৫

বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামগঞ্জে, শহরে-বন্দরে নববর্ষ অত্যন্ত আনন্দণ্ডউল্লাসের সঙ্গে উদযাপিত হয়ে থাকে। শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার সব সম্প্রদায়ের জনগণ এ উৎসবমুখর দিনটি অতি আগ্রহের সঙ্গে উদযাপন করে থাকে। এ উৎসবে প্রধান অনুষঙ্গ বৈশাখী মেলা।

দেশের প্রাচীনতম শিল্পের মধ্যে মৃৎশিল্প একটি। আর এই প্রাচীনতম শিল্পের কারিগরেরা বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ বৎসর আগমন উপলক্ষে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর পৌর এলাকায় পালপাড়া নামে পরিচিত পাড়াগুলোতে এখন মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমের পণ্য নানান রঙে রং তুলির কাজ শেষের দিক। যুগ যুগ ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত কারিগররা তাদের গভীর ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে সুনিপুণ হাতের বিভিন্ন কারুকাজের মাধ্যমে মাটি দিয়ে তৈরি করেন নানা তৈজসপত্র।

এখন বাংলা নববর্ষকে ঘিরে নির্ঘুম ব্যস্ত সময় পার করছে নবীনগরে মৃৎশিল্পীরা। পহেলা বৈশাখ বাঙালির নববর্ষ। নববর্ষ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বসে বর্ষবরণ মেলা। সেই মেলায় চাহিদা থাকে নানা রকমের খেলনা, মাটির জিনিসপত্রের। মেলাকে দৃষ্টিনন্দন করতে মৃৎশিল্পীরা নিজের হাতে নিপুণ কারুকাজে মাটি দিয়ে তৈরি করতেন শিশুদের জন্য রকমারি পুতুল, ফুলদানি, রকমারি ফল, হাঁড়ি, কড়াই, ব্যাংক, বাসন, থালা, বাটি, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, টিয়া, ময়না, ময়ূর, মোরগ, খরগোশ, হাঁস, কলস, ঘটি, চুলা, ফুলের টবসহ মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র। আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মাটির তৈরি এসব জিনিসের বদলে বাজার দখল করছে প্লাস্টিক,

সিরামিকসহ অন্য সব সামগ্রী। তাই আধুনিক প্রযুক্তির তৈজসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাটির তৈরি অনেক পণ্যই হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাটির তৈরি কিছু তৈজসপত্র এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। শহরবাসীর দালান-কোটা সাজাতে মাটির তৈরি নানা পট-পটারি, ফুলদানি ও বাহারি মাটির হাঁড়ির কদর রয়েছে এখনো। সরজমিন গিয়ে জানা যায়, ২০ বছর আগেও নবীনগর উপজেলায় মৃৎশিল্পের দাপট ও কদর দুটোই ছিল। তখন উপজেলার ভোলাচং পৌরসভা  প্রায় এক হাজার পরিবার মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করত।

কিন্তু বর্তমানে এ উপজেলায় প্রায় পাঁচ শত পরিবার মৃৎশিল্পের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। আগের মতো চাহিদা আর পারিশ্রমিকের ন্যায্যমূল্য না থাকায় এ পেশার লোকজন অত্যন্ত দুঃখ-দুর্দশা আর হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় অন্য পেশায় তেমন খাপ খাওয়াতে পারছেন না তারা। কম লাভ জেনেও শুধু পারিশ্রমিকের আসায় বাপ-দাদার পুরানো ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো মাটি দিয়ে তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি, সরা, কলস, বাসন, মুড়ি ভাজার খোলা, কোলা, ভাটি, পিঠা তৈরির খাঁজ, জালের কাঠি, মাটির ব্যাংক ও জলকান্দা ইত্যাদি।

কুমারপল্লীতে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানান রঙের মাটির তৈরি তৈজসপত্র। ভোলাচং বাজার সংলগ্ন কুমার পল্লীতে সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমের পণ্যের বাজার। স্থানীয়রা কুমারপল্লীর ছোট ছোট দোকান থেকে তাদের পছন্দের সামগ্রী ক্রয় করছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারেরা আসছেন প্রতিদিন কুমার পল্লীতে। মাটির সামগ্রীতে মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের অনুভূতি, প্রেম-

বিরহের নানা দৃশ্যপট, মনোমুগ্ধকর ছবি হাতের স্পর্শে ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। অথচ আজ উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় এখন পুঁজির অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এখানকার মৃৎশিল্প। এই পেশায় এখন ভর করেছে অভাব-অনটন। মেলা-পার্বনেও তেমন চাহিদা নেই মাটির তৈজসপত্রের। তবে কিছু হোটেল-মিষ্টির দোকানে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজায় এখনও প্রয়োজন হয় মাটির সামগ্রীর। পহেলা বৈশাখে মাটির সরাইয়ে (সানকি) তে পান্তাভাত খাওয়ার রীতিও চালু আছে। উপজেলার ভোলাচং এলাকায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে এখনো  জড়িত রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টি পরিবার। তারা বিভিন্ন উৎসবসহ মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এখনো। তাই এখানে পুরুষ মৃৎশিল্পীর পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে কাজ করছেন মৃৎশিল্পী দুলাল পাল, বিশ্বজিৎ পাল, অনিকচন্দ্র পাল,পরিমল পাল জানান, প্রায় শত বছর আগে থেকে বাপ দাদার আমল হতে মৃৎশিল্পীর কাজ করে আসছে। বর্তমান বাজারে রং ও মাটির দাম বেশি থাকা আবার বাজারেও গত বছরের চেয়ে চাহিদা কম থাকা সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বাপ দাদার রীতির রেওয়াজটা মেনে চলছি। হয়তো আমাদের প্রজন্ম এটাকে ধরে রাখবে আমাদের পরের প্রজন্মে বিলুপ্তি হওয়ার সম্ভাবনা টা বেশি।