ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তাজা খবর
ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন
১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর
ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
বৃষ্টিতে পানির নিচে পেঁয়াজ: কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা
হরমুজ প্রণালি ও ইরানে শাসক পরিবর্তন নিয়ে মুখ খুললেন মার্কো রুবিও
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার
জামালপুর হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:২৫:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
- / ২২ বার পঠিত

সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল: জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল জেলার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। শুধু জামালপুরই নয়, পাশের শেরপুর জেলা, যমুনা তীরবর্তী সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধার বহু মানুষও চিকিৎসার জন্য নির্ভর করেন ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালের ওপর। ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় তিনগুণ রোগী এখানে নিয়মিত ভর্তি থাকেন এবং প্রতিদিন হাজারো মানুষ বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন।
২০১৪ সালে জামালপুর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর হাসপাতালের সঙ্গে আরও ৫০০ শয্যা যুক্ত হওয়ায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবার প্রত্যাশা বাড়ে সাধারণ মানুষের। তবে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটিতে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহানের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এ সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবে সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আমিনুল হক এবং হিসাবরক্ষক আবু হান্নানের নাম উঠে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করলে চাকরি ও ব্যক্তিগত জীবনে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক কিছুই ঘটছে, কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না।”
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে তথ্য চাওয়া হয়। সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান শুরুতে তথ্য দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তিন মাস পার হয়ে গেলেও কোনো তথ্য সরবরাহ করেননি। পরবর্তীতে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্য দিতে অপারগতার কথা জানান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অন্যত্র বদলি হওয়া হিসাবরক্ষক আবু হান্নান এখনও হাসপাতালের খাবার সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে প্রভাবশালীভাবে যুক্ত রয়েছেন। হাসপাতালের রোগীদের জন্য সরবরাহকৃত খাবারের মান ও মেনু নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, ওষুধ সরবরাহকারী একটি কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়, যার মধ্যস্থতায় থাকেন আবু হান্নান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গত দুই বছর ধরে এই কমিশন বাণিজ্য চলমান রয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আবু হান্নান কোনো বক্তব্য দেননি।
হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আমিনুল হকের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, তিনি শহরের দেওয়ানপাড়া টেনিস ক্লাব মোড়ে নিজের মালিকানাধীন একটি বেসরকারি ক্লিনিক পরিচালনা করেন এবং সেখানে হাসপাতালের রি-এজেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। ময়মনসিংহ শহরের মাসকান্দায় চার ইউনিটের সাততলা ভবন এবং ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আমিনুল হক বলেন, তিনি হাসপাতালের কোনো রি-এজেন্ট ব্যক্তিগত ক্লিনিকে ব্যবহার করেন না এবং দুর্নীতির অভিযোগও ভিত্তিহীন।
হাসপাতালের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক ধরনের রসিদ ব্যবহার করা হয়। একটি রসিদের অর্থ সরকারি রাজস্ব খাতে জমা হলেও অন্য রসিদের অর্থ আলাদা হিসাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এছাড়া আউটসোর্সিং কর্মচারী নিয়োগ, ঠিকাদার নির্বাচন, ইউসেজ বিল এবং হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ আয়-ব্যয়ের বিভিন্ন খাত থেকেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কমিশন বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখতে নামসর্বস্ব ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং পরে স্থানীয় ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করা হয়।
হাসপাতালের একাধিক কর্মচারী জানান, আবু হান্নানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরে তাকে সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হলেও হাসপাতালের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার প্রভাব এখনও বিদ্যমান রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিপরীতে বাস্তব চিত্রও উদ্বেগজনক। হাসপাতালের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর, রোগীদের জন্য ওষুধের সংকট প্রায় নিয়মিত ঘটনা। মাসের শুরুতে কিছু ওষুধ পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে অধিকাংশ রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত হন।
জামালপুর জেলা জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক রেদোয়ান খন্দকার মাহিন বলেন, “আমি নিজে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যে পরিস্থিতি দেখেছি, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছি। ঘুষ, দুর্নীতি, দালালচক্র, নিম্নমানের খাবার এবং ওষুধ সংকট—সবকিছুই এখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে।”
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপজেলা পর্যায়ে কয়েক কোটি টাকার ওষুধ ক্রয়ে বড় অঙ্কের কমিশন পাওয়ার সুযোগ থাকে। সেই হিসেবে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে বছরে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ওষুধ ক্রয়ের ক্ষেত্রে কমিশনের পরিমাণ দেড় থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, কমিশন বাণিজ্য নিয়ে জেলা স্বাস্থ্য কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, “আমি কোনো ধরনের কমিশন বাণিজ্য বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মহল থেকে এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে।”
আমিনুল হক ও আবু হান্নানের প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নই। আমিনুল হক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এখানে কর্মরত আছেন। আর আবু হান্নানের সরকারি চাকরিতে থেকে ঠিকাদারির সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই।”
হাসপাতালের আয়-ব্যয়ের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, “সব অর্থ সরকারি বিধি অনুযায়ী জমা হয় এবং জেলা স্বাস্থ্য কমিটির অনুমোদনক্রমে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়। আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে।”
হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রোগী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক। জেলার প্রধান সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
আরও পড়ুন:
সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল






















