
বিপ্লব সাহা, খুলনা: পঁচে যাচ্ছে গোডাউনে থাকা কাঁচা পাট লোকসানের মুখে কোম্পানি চাকরি হারানোর আশঙ্কায় শ্রমিক সবকিছু মিলে দেশের অন্যতম কুটির শিল্পের সম্পদ সোনালী আঁশ যেন মরীচিকাময় লোহায় পরিণত হচ্ছে,
এ বিষয়ে মিল শ্রমিকদের অভিযোগ সূত্রে উঠে এসেছে খুলনা অঞ্চলে প্রায় ৯ মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে কাঁচাপাট রপ্তানি। কাঁচাপাটকে ‘শর্তসাপেক্ষ’ রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই এই নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি রপ্তানিকারকদের। ফলে বিপুল পরিমাণ পাট গোডাউনে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, কমছে এর গুণগত মান ও বাজারমূল্য। এতে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের লোকসান ও ব্যাংক ঋণের বোঝা আকাশচুম্বী হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনের শঙ্কায় পড়েছেন অঞ্চলের হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিক। নিস্তব্ধ পাট গোডাউন, ধ্বংসের মুখে সোনালী আঁশ: খুলনার দৌলতপুর, খানজাহান আলী ও আশপাশের এলাকার পাট গোডাউনগুলোতে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। যে সময়টায় বিদেশে পাঠানোর জন্য কাঁচাপাট বাছাই, প্রেসিং ও বেইলিংয়ের কাজে শ্রমিকদের ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে গোডাউনগুলো এখন নিস্প্রাণ। কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হাজার হাজার মণ পাট মাসের পর মাস ধরে গুদামে মজুত থাকায় নষ্ট হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাঁচাপাটকে শর্তসাপেক্ষ রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই খুলনা থেকে রপ্তানি ধসে পড়ে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসহ বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিল প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবে কাঁচাপাট রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। সংকট নিরসনের দাবিতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে একাধিকবার স্মারকলিপি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান আসেনি।
ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর শঙ্কা: গাজী জুট ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী গাজী শরীফুল ইসলাম বলেন, “রপ্তানি বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ পাট গুদামে আটকে আছে। এদিকে ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়ছে, গুদাম ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও হু হু করে বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে চরম দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। দ্রুত রপ্তানি চালু না হলে অনেক প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।”
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মো. আলমগীর খান বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত কাঁচাপাট রপ্তানি। দীর্ঘদিন ধরে এই খাত অচল থাকায় ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমিক—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান চিরতরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
উদ্বেগজনক তথ্য: মে মাস পর্যন্ত রপ্তানি তলানিতে: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খুলনা অঞ্চল থেকে ৩৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছিল। অথচ চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৭ হাজার ৩০০ মেট্রিক টনে! এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় খুলনাঞ্চলের পাট খাত কতটা খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।
১০ হাজার শ্রমিকের ঘরে উনুন জ্বলছে না, বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি: রপ্তানি বন্ধের সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর। সংশ্লিষ্টদের মতে, খুলনা অঞ্চলের প্রায় ২০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক সরাসরি কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। কাজ না থাকায় সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে দৌলতপুরের আব্দুল গফ্ফার, মো. সোহেল রানা কিংবা রহিমা বেগমের মতো হাজারো শ্রমিকের। সন্তান ও পরিবারের চিকিৎসা ও খাদ্য জোটাতে তারা এখন ধারদেনায় জর্জরিত।
দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেইলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিঠু তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা এখন চরম হুমকির মুখে। কয়েক দফা আন্দোলন করেও আমরা কোনো দৃশ্যমান সমাধান পাইনি। দ্রুতই যদি সরকার আমাদের কর্মের ব্যবস্থা বা রপ্তানি সচল করতে না পারে, তবে হাজার হাজার শ্রমিককে সাথে নিয়ে আমরা আরও বড় ও কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।”
আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ পাট অধিদপ্তর: এদিকে সমস্যা সমাধানের বিষয়টি এখনও শুধু আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। খুলনা পাট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরজিৎ সরদার বলেন, “বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজ করছে। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের উদ্বেগের বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। আমরা দ্রুত একটি ইতিবাচক সমাধানের আশা করছি।” তবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু ফাঁকা আশ্বাস নয়, সোনালী আঁশ আর মেহনতি মানুষকে বাঁচাতে অবিলম্বে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হোক

বিপ্লব সাহা, খুলনা 


















