ঢাকা, বাংলাদেশ। , শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
তাজা খবর
অসুস্থ হনুমান চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিজেই হাসপাতালে হাজির মেধার স্বাক্ষরে দেশসেরা মনিরামপুরের সুরাইয়া ও অরিত্র ব্যারিস্টার জাইমা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করেছেন মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী

গৌরব ও ঐতিহ্যের ১৯ বছরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

সাব্বির হোসেন, কুবি প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:০০:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ মে ২০২৫
  • / ১২০ বার পঠিত

লাল মাটির সবুজ ক্যাম্পাসে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশের ২৬তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান। গত ১৯ বছরে শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে কুবি। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুনাম অর্জন করছে। পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাস, নৈসর্গিক পরিবেশ, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এই প্রতিষ্ঠানকে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছে।

প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি

কুমিল্লার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাতি এই অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে বেগবান করে। আশির দশকে কুমিল্লাবাসীর জোরালো আন্দোলন সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে প্রাথমিকভাবে এই দাবি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তবে, কুমিল্লার মানুষের অদম্য প্রচেষ্টায় ২০০১ সালে জাতীয় সংসদে ১২টি জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ৪০নং আইন পাস হয়। ২০০৪ সালে স্থান নির্বাচন ও একনেক সভার মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়।২০০৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে কুবির যাত্রা শুরু হয়। একই বছরের ৮ মে জাতীয় সংসদে আইন পাস এবং ২৮ মে আইন কার্যকর হয়। ২৯ মে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং পূর্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বাতিল করা হয়। প্রতিষ্ঠার জন্য ৩২ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

শিক্ষা ও গবেষণার শ্রেষ্ঠত্ব

২০০৭ সালে মাত্র ৪টি অনুষদে ৭টি বিভাগ, ৩০০ শিক্ষার্থী এবং ১৫ জন শিক্ষক নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ৬টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগে ৬,৪৬১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ২৮১ জন শিক্ষক ও ৩০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও আইন অনুষদের অধীনে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ প্রদান করা হচ্ছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৫১ জন শিক্ষার্থী জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) ফেলোশিপ লাভ করেছেন। এর মধ্যে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ফার্মেসি, পরিসংখ্যান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। এই অর্জন কুবির গবেষণার মান ও শিক্ষার্থীদের মেধার প্রমাণ বহন করে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্প

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ৫০ একরের ক্যাম্পাসে ৪টি ৫ তলা একাডেমিক ভবন, ১টি প্রশাসনিক ভবন, ৫টি আবাসিক হল এবং ৪টি শিক্ষকদের ডরমিটরি রয়েছে। পাহাড় কেটে নির্মিত এই ভবনগুলো ক্যাম্পাসের নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে আরও মনোমুগ্ধকর করেছে। তবে, ক্যাম্পাসের আয়তন তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি বৃহত্তর ক্যাম্পাস।

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেছে ২০১৮ সালে অনুমোদিত ১,৬৫৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। বর্তমান ক্যাম্পাস থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে লালমাই মৌজায় ১৯৪.১৯ একর জমিতে নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ব্যাটালিয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্রিজ হেডকোয়ার্টারের তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পে ৫টি ১০ তলা একাডেমিক ভবন, দ্বিতীয় প্রশাসনিক ভবন, ৯টি আবাসিক ভবন, উপাচার্যের বাসভবন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, কেন্দ্রীয় মসজিদ, শহীদ মিনার, মুক্তমঞ্চ, লেক, ব্রিজ, রিজার্ভ ফরেষ্ট, ডে কেয়ার সেন্টার এবং আরও অনেক সুবিধা যুক্ত হবে। এই প্রকল্প কুবিকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করবে।

নান্দনিক স্থাপত্য ও ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তার স্থাপত্যশৈলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। প্রধান ফটক এই ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ। ২০২১ সালে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ফটকে কুমিল্লার বিজয়পুরের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির ফলকে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শিল্পী হাশেম খান ও রবিউল হোসাইনের যৌথ প্রয়াসে ২০১৩ সালে নির্মিত, ক্যাম্পাসের আরেকটি গৌরবময় স্থাপনা। মুক্তমঞ্চ শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র। ফরেষ্ট অব আর্ডেন, লালন চত্বর, বাবুই চত্বর, কাঠালতলা, প্রেম সেতু এবং ফুলে সজ্জিত পথ ক্যাম্পাসকে একটি নৈসর্গিক লীলাভূমিতে রূপান্তরিত করেছে।

আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থা

কুবিতে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৫টি আবাসিক হল রয়েছে: নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল, সুনীতি শান্তি হল, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল, বিজয়-২৪ হল এবং কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল। এই হলগুলোতে ওয়াইফাই, ডাইনিং, রিডিং রুম, প্রেয়ার রুম ও টিভি রুমের সুবিধা রয়েছে। স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। শিক্ষকদের জন্য ৪টি ডরমিটরি রয়েছে।অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ৮টি নীল বাস, ৯টি ভাড়ায় চালিত বাস, শিক্ষকদের জন্য ৭টি যানবাহন এবং জরুরি প্রয়োজনে ২টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এই পরিবহন ব্যবস্থা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াতকে সহজ করেছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘ভাইস চ্যান্সেলর স্কলারশিপ’ চালু করেছে। ২০২২ সালে ২৩৭ জন এবং ২০২৩ সালে ৩৯১ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। এছাড়া, খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতে ২০২৩ সালে ‘ভাইস চ্যান্সেলর স্পোর্টস স্কলারশিপ’ চালু করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রীড়া উৎসাহ বাড়িয়েছে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রম

কুবির শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ‘প্রতিবর্তন’, ‘অনুপ্রাস কণ্ঠচর্চা’, ‘থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘প্ল্যাটফর্ম’ ব্যান্ড, কুমিল্লা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, ‘বন্ধু’ রক্তদান সংগঠন, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, ‘বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম’, ‘ইএলডিসি’ ‘উদীচী’ এবং ‘প্রথম আলো বন্ধুসভা’ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমৃদ্ধ করছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (কুবিসাস) ও প্রেসক্লাব সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

গ্রন্থাগার ও খেলাধুলা

 প্রশাসনিক ভবনের পঞ্চম তলায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ৬,৬৮৫ শিরোনামে ২২,২৮২টি বই এবং ৩,০০০-এর বেশি উপহারপ্রাপ্ত বই রয়েছে। এই গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও নন-একাডেমিক জ্ঞান সমৃদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।খেলাধুলায় কুবির ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, হকি ও ব্যাডমিন্টন দল বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করছে। কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার দ্বিতীয় তলায় জিমনেসিয়াম শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চার সুযোগ প্রদান করছে। ২০২৩ সালে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্পোর্টস কমপ্লেক্স ক্রীড়া কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

প্রথম সমাবর্তন

২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে এই ঐতিহাসিক সমাবর্তনে প্রথম থেকে অষ্টম ব্যাচের ২,৮৮৭ জন গ্র্যাজুয়েট অংশ নেন। এর মধ্যে ১,২২২ জন স্নাতক এবং ১,৬৬৫ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এই ঘটনা কুবির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি

৫০ একরের এই ক্যাম্পাসে প্রকৃতি ও স্থাপত্যের অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। পাহাড়ঘেরা পথ, কাঠালতলা, বাবুই চত্বর, লালন চত্বর, প্রেম সেতু, ফরেষ্ট অব আর্ডেন, ফুলে সজ্জিত পথ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং মুক্তমঞ্চ ক্যাম্পাসকে একটি জীবন্ত শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করেছে। এই নৈসর্গিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মনে সৃজনশীলতা ও প্রশান্তির জাগায়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় গত ১৯ বছরে শিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছে। নতুন ক্যাম্পাস ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেশ ও বিশ্বের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

গৌরব ও ঐতিহ্যের ১৯ বছরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৫:০০:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ মে ২০২৫

লাল মাটির সবুজ ক্যাম্পাসে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশের ২৬তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান। গত ১৯ বছরে শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে কুবি। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুনাম অর্জন করছে। পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাস, নৈসর্গিক পরিবেশ, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এই প্রতিষ্ঠানকে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছে।

প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি

কুমিল্লার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাতি এই অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে বেগবান করে। আশির দশকে কুমিল্লাবাসীর জোরালো আন্দোলন সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে প্রাথমিকভাবে এই দাবি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তবে, কুমিল্লার মানুষের অদম্য প্রচেষ্টায় ২০০১ সালে জাতীয় সংসদে ১২টি জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ৪০নং আইন পাস হয়। ২০০৪ সালে স্থান নির্বাচন ও একনেক সভার মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়।২০০৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে কুবির যাত্রা শুরু হয়। একই বছরের ৮ মে জাতীয় সংসদে আইন পাস এবং ২৮ মে আইন কার্যকর হয়। ২৯ মে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং পূর্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বাতিল করা হয়। প্রতিষ্ঠার জন্য ৩২ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

শিক্ষা ও গবেষণার শ্রেষ্ঠত্ব

২০০৭ সালে মাত্র ৪টি অনুষদে ৭টি বিভাগ, ৩০০ শিক্ষার্থী এবং ১৫ জন শিক্ষক নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ৬টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগে ৬,৪৬১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ২৮১ জন শিক্ষক ও ৩০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও আইন অনুষদের অধীনে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ প্রদান করা হচ্ছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৫১ জন শিক্ষার্থী জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) ফেলোশিপ লাভ করেছেন। এর মধ্যে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ফার্মেসি, পরিসংখ্যান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। এই অর্জন কুবির গবেষণার মান ও শিক্ষার্থীদের মেধার প্রমাণ বহন করে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্প

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ৫০ একরের ক্যাম্পাসে ৪টি ৫ তলা একাডেমিক ভবন, ১টি প্রশাসনিক ভবন, ৫টি আবাসিক হল এবং ৪টি শিক্ষকদের ডরমিটরি রয়েছে। পাহাড় কেটে নির্মিত এই ভবনগুলো ক্যাম্পাসের নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে আরও মনোমুগ্ধকর করেছে। তবে, ক্যাম্পাসের আয়তন তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি বৃহত্তর ক্যাম্পাস।

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেছে ২০১৮ সালে অনুমোদিত ১,৬৫৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। বর্তমান ক্যাম্পাস থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে লালমাই মৌজায় ১৯৪.১৯ একর জমিতে নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ব্যাটালিয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্রিজ হেডকোয়ার্টারের তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পে ৫টি ১০ তলা একাডেমিক ভবন, দ্বিতীয় প্রশাসনিক ভবন, ৯টি আবাসিক ভবন, উপাচার্যের বাসভবন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, কেন্দ্রীয় মসজিদ, শহীদ মিনার, মুক্তমঞ্চ, লেক, ব্রিজ, রিজার্ভ ফরেষ্ট, ডে কেয়ার সেন্টার এবং আরও অনেক সুবিধা যুক্ত হবে। এই প্রকল্প কুবিকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করবে।

নান্দনিক স্থাপত্য ও ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তার স্থাপত্যশৈলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। প্রধান ফটক এই ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ। ২০২১ সালে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ফটকে কুমিল্লার বিজয়পুরের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির ফলকে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শিল্পী হাশেম খান ও রবিউল হোসাইনের যৌথ প্রয়াসে ২০১৩ সালে নির্মিত, ক্যাম্পাসের আরেকটি গৌরবময় স্থাপনা। মুক্তমঞ্চ শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র। ফরেষ্ট অব আর্ডেন, লালন চত্বর, বাবুই চত্বর, কাঠালতলা, প্রেম সেতু এবং ফুলে সজ্জিত পথ ক্যাম্পাসকে একটি নৈসর্গিক লীলাভূমিতে রূপান্তরিত করেছে।

আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থা

কুবিতে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৫টি আবাসিক হল রয়েছে: নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল, সুনীতি শান্তি হল, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল, বিজয়-২৪ হল এবং কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল। এই হলগুলোতে ওয়াইফাই, ডাইনিং, রিডিং রুম, প্রেয়ার রুম ও টিভি রুমের সুবিধা রয়েছে। স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। শিক্ষকদের জন্য ৪টি ডরমিটরি রয়েছে।অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ৮টি নীল বাস, ৯টি ভাড়ায় চালিত বাস, শিক্ষকদের জন্য ৭টি যানবাহন এবং জরুরি প্রয়োজনে ২টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এই পরিবহন ব্যবস্থা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াতকে সহজ করেছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘ভাইস চ্যান্সেলর স্কলারশিপ’ চালু করেছে। ২০২২ সালে ২৩৭ জন এবং ২০২৩ সালে ৩৯১ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। এছাড়া, খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতে ২০২৩ সালে ‘ভাইস চ্যান্সেলর স্পোর্টস স্কলারশিপ’ চালু করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রীড়া উৎসাহ বাড়িয়েছে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রম

কুবির শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ‘প্রতিবর্তন’, ‘অনুপ্রাস কণ্ঠচর্চা’, ‘থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘প্ল্যাটফর্ম’ ব্যান্ড, কুমিল্লা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, ‘বন্ধু’ রক্তদান সংগঠন, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, ‘বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম’, ‘ইএলডিসি’ ‘উদীচী’ এবং ‘প্রথম আলো বন্ধুসভা’ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমৃদ্ধ করছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (কুবিসাস) ও প্রেসক্লাব সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

গ্রন্থাগার ও খেলাধুলা

 প্রশাসনিক ভবনের পঞ্চম তলায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ৬,৬৮৫ শিরোনামে ২২,২৮২টি বই এবং ৩,০০০-এর বেশি উপহারপ্রাপ্ত বই রয়েছে। এই গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও নন-একাডেমিক জ্ঞান সমৃদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।খেলাধুলায় কুবির ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, হকি ও ব্যাডমিন্টন দল বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করছে। কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার দ্বিতীয় তলায় জিমনেসিয়াম শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চার সুযোগ প্রদান করছে। ২০২৩ সালে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্পোর্টস কমপ্লেক্স ক্রীড়া কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

প্রথম সমাবর্তন

২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে এই ঐতিহাসিক সমাবর্তনে প্রথম থেকে অষ্টম ব্যাচের ২,৮৮৭ জন গ্র্যাজুয়েট অংশ নেন। এর মধ্যে ১,২২২ জন স্নাতক এবং ১,৬৬৫ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এই ঘটনা কুবির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি

৫০ একরের এই ক্যাম্পাসে প্রকৃতি ও স্থাপত্যের অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। পাহাড়ঘেরা পথ, কাঠালতলা, বাবুই চত্বর, লালন চত্বর, প্রেম সেতু, ফরেষ্ট অব আর্ডেন, ফুলে সজ্জিত পথ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং মুক্তমঞ্চ ক্যাম্পাসকে একটি জীবন্ত শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করেছে। এই নৈসর্গিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মনে সৃজনশীলতা ও প্রশান্তির জাগায়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় গত ১৯ বছরে শিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছে। নতুন ক্যাম্পাস ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেশ ও বিশ্বের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।