ঢাকা, বাংলাদেশ। , বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
তাজা খবর
অসুস্থ হনুমান চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিজেই হাসপাতালে হাজির মেধার স্বাক্ষরে দেশসেরা মনিরামপুরের সুরাইয়া ও অরিত্র ব্যারিস্টার জাইমা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করেছেন মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী

মোবাইল যন্ত্রণা: প্রযুক্তির ছায়ায় মানবিক সংকট

লেখক: মোঃ আরিফুর রহমান
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:৩৭:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৮৮ বার পঠিত
লেখক: মোঃ আরিফুর রহমান: একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী আবিষ্কারগুলোর একটি হলো মোবাইল ফোন। যোগাযোগকে সহজ, দ্রুত ও হাতের মুঠোয় এনে দেওয়া এই যন্ত্র মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই সুবিধার আড়ালেই ক্রমশ বেড়ে চলেছে এক নীরব যন্ত্রণা, যা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনকে গভীরভাবে আঘাত করছে।
আজ মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে আগের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। ঘরে বসে দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়, অথচ পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে দূরে সরে যাচ্ছে। কারণ, সবার দৃষ্টি এখন মোবাইলের পর্দায় বন্দী।
বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে মোবাইল আসক্তি একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। খেলাধুলা, বই পড়া কিংবা পারিবারিক সময়—সবকিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে অনলাইন গেম, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এর ফলে তাদের শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে একাকীত্ব, আগ্রাসী মনোভাব ও বাস্তবতা-বিমুখ মানসিকতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট—মনোযোগের ঘাটতি, ফলাফলের অবনতি এবং নৈতিক অবক্ষয় দিন দিন বাড়ছে।
মোবাইল যন্ত্রণা শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যারও জন্ম দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের দৃষ্টি দুর্বল হচ্ছে, বাড়ছে মাথাব্যথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ব্যথা। রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনিদ্রা একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মানসিকভাবে মানুষ হয়ে উঠছে অস্থির, ক্লান্ত ও হতাশ।
সামাজিক সম্পর্কেও এর প্রভাব উদ্বেগজনক। মানুষ এখন অনুভূতির চেয়ে ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’-এর মূল্য বেশি দিচ্ছে। বাস্তব জীবনের আনন্দের চেয়ে ভার্চুয়াল স্বীকৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে সম্পর্কগুলো হয়ে উঠছে কৃত্রিম ও স্বার্থনির্ভর। সমাজে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে, বাড়ছে ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাত।
তবে এই সংকটের জন্য প্রযুক্তিকে এককভাবে দোষারোপ করা যায় না। সমস্যা প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং অপব্যবহার। সঠিক নিয়ম ও সীমাবদ্ধতার অভাবে মোবাইল আমাদের জীবনে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার বদলে প্রযুক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছি—এটাই আজকের বাস্তবতা।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা। পরিবারে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের জন্য মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ, বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়া জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ব্যবহারে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে মোবাইল আসক্তি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।
মোবাইল প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই প্রযুক্তি যেন আমাদের মানবিকতা, সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতাকে গ্রাস না করে, সে দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। প্রযুক্তি হোক সহায়ক, নিয়ন্ত্রক নয়। অন্যথায়, আলোর এই যন্ত্রই একদিন আমাদের সমাজকে ঠেলে দেবে গভীর অন্ধকারের দিকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

মোবাইল যন্ত্রণা: প্রযুক্তির ছায়ায় মানবিক সংকট

সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৩:৩৭:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
লেখক: মোঃ আরিফুর রহমান: একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী আবিষ্কারগুলোর একটি হলো মোবাইল ফোন। যোগাযোগকে সহজ, দ্রুত ও হাতের মুঠোয় এনে দেওয়া এই যন্ত্র মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই সুবিধার আড়ালেই ক্রমশ বেড়ে চলেছে এক নীরব যন্ত্রণা, যা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনকে গভীরভাবে আঘাত করছে।
আজ মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে আগের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। ঘরে বসে দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়, অথচ পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে দূরে সরে যাচ্ছে। কারণ, সবার দৃষ্টি এখন মোবাইলের পর্দায় বন্দী।
বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে মোবাইল আসক্তি একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। খেলাধুলা, বই পড়া কিংবা পারিবারিক সময়—সবকিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে অনলাইন গেম, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এর ফলে তাদের শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে একাকীত্ব, আগ্রাসী মনোভাব ও বাস্তবতা-বিমুখ মানসিকতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট—মনোযোগের ঘাটতি, ফলাফলের অবনতি এবং নৈতিক অবক্ষয় দিন দিন বাড়ছে।
মোবাইল যন্ত্রণা শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যারও জন্ম দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের দৃষ্টি দুর্বল হচ্ছে, বাড়ছে মাথাব্যথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ব্যথা। রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনিদ্রা একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মানসিকভাবে মানুষ হয়ে উঠছে অস্থির, ক্লান্ত ও হতাশ।
সামাজিক সম্পর্কেও এর প্রভাব উদ্বেগজনক। মানুষ এখন অনুভূতির চেয়ে ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’-এর মূল্য বেশি দিচ্ছে। বাস্তব জীবনের আনন্দের চেয়ে ভার্চুয়াল স্বীকৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে সম্পর্কগুলো হয়ে উঠছে কৃত্রিম ও স্বার্থনির্ভর। সমাজে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে, বাড়ছে ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাত।
তবে এই সংকটের জন্য প্রযুক্তিকে এককভাবে দোষারোপ করা যায় না। সমস্যা প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং অপব্যবহার। সঠিক নিয়ম ও সীমাবদ্ধতার অভাবে মোবাইল আমাদের জীবনে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার বদলে প্রযুক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছি—এটাই আজকের বাস্তবতা।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা। পরিবারে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের জন্য মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ, বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়া জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ব্যবহারে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে মোবাইল আসক্তি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।
মোবাইল প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই প্রযুক্তি যেন আমাদের মানবিকতা, সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতাকে গ্রাস না করে, সে দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। প্রযুক্তি হোক সহায়ক, নিয়ন্ত্রক নয়। অন্যথায়, আলোর এই যন্ত্রই একদিন আমাদের সমাজকে ঠেলে দেবে গভীর অন্ধকারের দিকে।