ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
তাজা খবর
মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও
ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ
ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন
১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর
ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
বৃষ্টিতে পানির নিচে পেঁয়াজ: কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস-২০২৬
রক্তদান হোক জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০২:৩৫:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
- / ২৭ বার পঠিত

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ—-
প্রতি বছর ১৪ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব রক্তদাতা দিবস (World Blood Donor Day)। নিরাপদ রক্তের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং রক্তদানে মানুষকে উৎসাহিত করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) উদ্যোগে ২০০৪ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিনটি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনারের জন্মদিন উপলক্ষে নির্ধারণ করা হয়েছে, যিনি রক্তের গ্রুপ (ABO Blood Group) আবিষ্কারের মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী অবদান রাখেন।
রক্ত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
রক্ত মানবদেহের একটি অপরিহার্য উপাদান। এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন, পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় উপাদান পৌঁছে দেয়। বর্তমানে এমন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি, যা মানুষের রক্তের পূর্ণ বিকল্প তৈরি করতে পারে। তাই একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে আরেকজন মানুষের রক্তই একমাত্র ভরসা।
যেসব ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন হয়
* সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী
* বড় ধরনের অস্ত্রোপচার
* প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
* ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা
* থ্যালাসেমিয়া রোগী
* ডেঙ্গুজনিত জটিলতা
* গুরুতর রক্তস্বল্পতা
* শিশুদের কিছু জন্মগত রক্তরোগ
বিশ্বে ও বাংলাদেশে রক্তের চাহিদা
প্রতিবছর বিশ্বে কোটি কোটি ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশেও প্রতিদিন হাজারো ব্যাগ রক্তের চাহিদা থাকে। যদিও স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার বেড়েছে, তবুও প্রয়োজনের তুলনায় নিরাপদ রক্তের ঘাটতি এখনও বিদ্যমান। অনেক রোগীর স্বজনকে শেষ মুহূর্তে রক্তের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজতে দেখা যায়। এই সংকট দূর করতে নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারা রক্ত দিতে পারেন?
সাধারণত—
* বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছর
* ওজন কমপক্ষে ৪৫–৫০ কেজি
* শারীরিকভাবে সুস্থ
* রক্তশূন্যতা না থাকা
* সংক্রামক রোগমুক্ত ব্যক্তি
* রক্তদানের আগে স্বাস্থ্যকর্মীরা * প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন।
রক্তদানের উপকারিতা
রক্তদান শুধু গ্রহীতার জন্য নয়, দাতার জন্যও উপকারী হতে পারে।
* মানবিক তৃপ্তি ও আত্মিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।
* নতুন রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়।
* স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ পাওয়া যায়।
* সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।
* জীবন বাঁচানোর মহৎ কাজে অংশগ্রহণ করা যায়।
রক্তদান নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
সমাজে এখনও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে, যেমন—
১: রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়
* বাস্তবতা: সুস্থ ব্যক্তি নির্ধারিত নিয়মে রক্ত দিলে শরীরের কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয় না।
২: রক্ত দিলে মোটা বা চিকন হয়ে যায়
* বাস্তবতা: রক্তদানের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাসের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।
৩: বারবার রক্ত দিলে রোগ হয়
* বাস্তবতা: চিকিৎসা নির্দেশনা মেনে রক্তদান নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যসম্মত।
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
বাংলাদেশে বহু থ্যালাসেমিয়া রোগী নিয়মিত রক্ত গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। তাদের অনেকের প্রতি মাসে একাধিক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। একজন নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতা একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনের আশা জাগাতে পারেন। তাই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্তদান একটি চলমান মানবিক দায়িত্ব।
ইসলাম ও রক্তদান
ইসলাম মানবজীবনের মর্যাদা ও জীবন রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।আল্লাহ তাআলা বলেন—যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।” (সূরা আল-মায়িদা: ৩২)রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।” (আল-মুজামুল আওসাত: ৫৭৮৭) এই শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, রক্তদান
মনিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে করণীয়
* স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
* তরুণদের রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করা।
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো।
* রক্তদাতার জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা।
* রক্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
* ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা বৃদ্ধি।
* নিয়মিত রক্তদাতাদের সম্মাননা প্রদান।
স্বাস্থ্য সচেতনতায় রক্তদানের ভূমিকা
রক্তদানের সময় রক্তচাপ, ওজন, হিমোগ্লোবিনসহ বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করা হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এটি ব্যক্তিকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে সহায়তা করে।
তরুণদের প্রতি আহ্বান
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। যদি এই তরুণ সমাজ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানে অংশ নেয়, তাহলে নিরাপদ রক্তের সংকট অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, রক্তদান একটি সহজ, নিরাপদ, ব্যয়বিহীন এবং মহৎ মানবিক কাজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ কোটি ৮৫ লাখ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হয়, তবুও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বহু দেশে নিরাপদ রক্তের ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ৫৪ শতাংশ রক্ত সঞ্চালন করা হয় ৬০ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের জন্য, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে রক্তের বড় অংশ ব্যবহার করা হয় শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবায়। দুর্ঘটনা, ক্যান্সার, থ্যালাসেমিয়া, জটিল অস্ত্রোপচার এবং প্রসবকালীন রক্তক্ষরণের কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষের জীবন রক্তের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশেও নিরাপদ রক্তের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৮ থেকে ১০ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ সংগ্রহ করা হলেও এখনও স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। বিভিন্ন গবেষণা ও স্বাস্থ্যখাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রক্তের চাহিদার মাত্র ৩০–৩৫ শতাংশ আসে নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে, বাকিটা সংগ্রহ করতে হয় রোগীর আত্মীয়-স্বজন বা জরুরি ভিত্তিতে খুঁজে পাওয়া দাতাদের মাধ্যমে। বাংলাদেশে হাজার হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী নিয়মিত রক্ত গ্রহণ ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না, আবার প্রতিবছর অসংখ্য মা প্রসবজনিত জটিলতায় রক্তের প্রয়োজনীয়তার মুখোমুখি হন।
একজন সুস্থ মানুষ বছরে তিন থেকে চারবার রক্তদান করতে পারেন, অথচ একটি ইউনিট রক্তের উপাদান পৃথক করে তিনজন পর্যন্ত রোগীর জীবন রক্ষায় ব্যবহার করা সম্ভব। তাই একজন রক্তদাতার কয়েক মিনিট সময়, সামান্য সদিচ্ছা এবং মানবিক উদ্যোগ একটি পরিবারকে শোকের হাত থেকে বাঁচাতে পারে, ফিরিয়ে দিতে পারে নতুন জীবন।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবতার সেবায় সবচেয়ে মূল্যবান উপহারগুলোর একটি হলো স্বেচ্ছায় রক্তদান। তাই আসুন, ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে আমরা অঙ্গীকার করি—“নিয়মিত রক্তদান করব, নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করব এবং মানবতার সেবায় এগিয়ে আসব।” কারণ এক ব্যাগ রক্ত শুধু একটি জীবন নয়, একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখার অনন্য উপায়।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ই-মেইল : drmazed96@gmail.com
আরও পড়ুন:
ডা.মু মাহতাব হোসাইন মাজেদ





















