
অপু দাস, রাজশাহী: দেশের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চল রাজশাহীতে মৌসুমের শেষভাগে এসে আমের বাজারে প্রাণচাঞ্চল্য আরও বেড়েছে। জেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর আমের হাটসহ পুঠিয়া, চারঘাট, বাঘা এবং মহানগরীর বিভিন্ন বাজারে এখন ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকা ল্যাংড়া ও ক্ষীরশাপাত জাতের আম প্রায় শেষ হয়ে এলেও বর্তমানে ফজলি, আম্রপালি ও লক্ষণভোগ জাতের আমের বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। একই সঙ্গে আশ্বিনা ও বারি-৪ জাতের আম বাজারে আসতে শুরু করায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
রাজশাহীর অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে আমের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। প্রতি বছর আমকে কেন্দ্র করে জেলার হাজার হাজার মানুষের জীবিকা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মৌসুমের শেষ পর্যায়েও আমের বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহ এবং ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা প্রমাণ করছে যে রাজশাহীর আম এখনও দেশের ফলবাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
উৎপাদনে ইতিবাচক চিত্র
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রাজশাহী জেলায় প্রায় ১৯ হাজার ৬০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে আমের চাষ হয়েছে। মৌসুমজুড়ে আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় অধিকাংশ বাগানে ফলন সন্তোষজনক হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি আম উৎপাদিত হবে। উৎপাদনের এই পরিমাণ বাজারে সরবরাহ হলে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমের এই বিপুল উৎপাদন শুধু কৃষকদের নয়, স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকেও গতিশীল করবে।
শেষ সময়ে দাম বেড়েছে
মৌসুমের শেষদিকে এসে বাজারে ভালো মানের আমের সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে আমের জাত ও গুণগত মান অনুযায়ী বাজারে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে আম্রপালি প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ফজলির দাম রয়েছে ২ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। লক্ষণভোগ বা লখনা আমের দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এছাড়া হাড়িভাঙা ও বারি-৪ জাতের আম প্রতি মণ ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের শুরুতে বাজারে আমের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কিছুটা কম ছিল। কিন্তু এখন অনেক জনপ্রিয় জাতের আম শেষ হয়ে আসায় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাহিদা বাড়ায় বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
বানেশ্বর হাটে ক্রেতাদের ভিড়
রাজশাহীর বানেশ্বর হাট দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ আমের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন ভোর থেকে এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের উপস্থিতিতে জমে ওঠে কেনাবেচা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত পাইকাররা ফজলি ও আম্রপালি আম বেশি কিনছেন। চাহিদা বাড়ার কারণে বাজারে প্রতিযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক ভালো মূল্য পাচ্ছেন।
অনলাইন বিপণনে নতুন সম্ভাবনা
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ব্যবস্থার কারণে রাজশাহীর আম এখন দেশের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। স্থানীয় অনেক তরুণ উদ্যোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
এই উদ্যোগের ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমেছে এবং উৎপাদকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ভোক্তারাও তুলনামূলকভাবে সতেজ ও মানসম্মত আম সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন। অনলাইন ব্যবসার বিস্তারের কারণে রাজশাহীর আম এখন দেশের বাইরেও পরিচিতি লাভ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কুরিয়ার খাতে বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য
অনলাইনে আম বিক্রি বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে কুরিয়ার সেবায়। রাজশাহীর বিভিন্ন কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আম পরিবহনের বাড়তি চাপ সামলাতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। কুরিয়ার কর্মীরা জানান, আমের মৌসুমে সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি পণ্য পরিবহন করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান রাত পর্যন্ত আম প্যাকেজিং ও প্রেরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন চাষিরা
মৌসুমের শুরুতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অনেক বাগানে কিছু আম সময়ের আগেই পেকে যায় এবং ঝরে পড়ে। এতে চাষিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমানে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় সেই ক্ষতির একটি বড় অংশ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
বাগান মালিকরা বলছেন, যারা দেরিতে পাকে এমন জাতের আম চাষ করেছেন তারা এখনও ভালো লাভের আশা করছেন। বিশেষ করে আশ্বিনা ও বারি-৪ জাতের আম বাজারে থাকায় মৌসুমের শেষ পর্যন্ত আয় অব্যাহত থাকবে বলে তারা মনে করছেন।
নিরাপদ আম নিশ্চিতে প্রশাসনের নজরদারি
রাজশাহীর আমের সুনাম ধরে রাখতে এবং ভোক্তাদের নিরাপদ ফল নিশ্চিত করতে প্রশাসন নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভিন্ন হাট ও বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অপরিপক্ব আম সংগ্রহ, ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার এবং অন্যান্য অনিয়ম প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপদ ও মানসম্মত আম বাজারজাত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
আমকে ঘিরে রাজশাহীতে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তা জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। চাষি, বাগান মালিক, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, কুরিয়ার কর্মী, প্যাকেজিং শ্রমিক এবং অনলাইন উদ্যোক্তাসহ হাজারো মানুষ এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ আশ্বিনা ও বারি-৪ জাতের আমের সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে চলতি বছরের আমের মৌসুম শেষ হবে। তবে মৌসুমের শেষভাগেও বাজারে যে চাঙা অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে উৎপাদন ও বাণিজ্য—দুই ক্ষেত্রেই সন্তোষজনক সাফল্য অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অপু দাস, রাজশাহী 



















