ঢাকা, বাংলাদেশ। , বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
তাজা খবর
অসুস্থ হনুমান চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিজেই হাসপাতালে হাজির মেধার স্বাক্ষরে দেশসেরা মনিরামপুরের সুরাইয়া ও অরিত্র ব্যারিস্টার জাইমা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করেছেন মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী

নারীকে বেশ্যা কে বানালো সমাজ না নারী

মিনহাজ মোল্লা
  • সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ মে ২০২৫
  • / ৩২৯ বার পঠিত

একবার চিন্তা করে দেখেন তো  “বেশ্যা”— এই শব্দটির উচ্চারণেই সমাজ এক ধরণের নৈতিক ভয়, ধিক্কার আর ঘৃণার ছবি আঁকে। অথচ সমাজ জানেই না, এই শব্দটির উৎপত্তির উৎস, এর নির্মাতা আসলে কে। একটি মেয়ে যখন নিজের শরীর দিয়ে বাঁচতে চায়, তখন তাকে বেশ্যা বলা হয়। কিন্তু সেই সমাজ, যে তাকে কোনো বিকল্প দেয়নি— তার কি দায় নেই? এই আর্টিকেলে আমরা উন্মোচন করবো সেই মুখোশ, যেখানে নারীকে ভেঙে, পিষে, পণ্য করে, তাকে আবার অপরাধীর আসনে বসানো হয়।

১: নারীর শরীর বনাম সমাজের কামনা

সমাজে নারীকে নিয়ে যে কামনার রাজনীতি চলে, তা নতুন কিছু নয়। নারী যেন একটা জন্মগত পণ্য— তার শরীরই হয়ে ওঠে পরিচয়। ছোটবেলা থেকে একটি মেয়ে শেখে, “ভালো মেয়ে” হতে গেলে তাকে নির্দিষ্ট পোশাকে, নির্দিষ্ট চাহিদায় নিজেকে সাজাতে হবে। কিন্তু কাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই সাজ? উত্তর— পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।

নারীর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই সমাজের চোখে এক এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে। স্তন, নিতম্ব, ঠোঁট— সবই যেন সমাজের চাহিদার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। মিডিয়ায় নারীকে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয়, যেন সে কেবল ভোগ্যপণ্য। বিজ্ঞাপন হোক, নাটক বা সিনেমা— সবখানেই নারী শরীর ব্যবহৃত হয় বিক্রয়ের কৌশল হিসেবে।

এই কাঠামোতে নারীর ইচ্ছা গৌণ হয়ে পড়ে। সে কি চায়, কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়— এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। তাকে কীভাবে সমাজ দেখতে চায়, সেটাই তার নিয়তি। আর এই নিয়তি যখন ভেঙে যায়, তখন সমাজ বলে— সে বেশ্যা।

২: ধর্মের মুখোশের নিচে নারী নিপীড়ন

ধর্ম সমাজকে নৈতিকতা শেখায়— কিন্তু একইসাথে নারীর উপর চাপিয়ে দেয় নিয়ন্ত্রণের জাল। অধিকাংশ ধর্মে নারীর স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত, তার পোশাক, চলাফেরা, এমনকি কথাবার্তাও নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে বাঁধা।

পুরুষ ধর্ম প্রচারক যখন বলে, “নারী যদি শরীর দেখায়, তবে পুরুষের চোখ যাবে”, তখন দায় নারীর উপর চাপানো হয়। কিন্তু পুরুষের চোখের দায় কে নেবে? সেই প্রশ্ন তোলা যায় না। কারণ ধর্মীয় কাঠামোতে নারীই চিরকাল নীচু অবস্থানে।

নারী যখন নিজের ইচ্ছায় বাঁচতে চায়, নিজের পছন্দে পোশাক পরতে চায়, তখন তাকে বলা হয়— ‘পাপিষ্ঠা’, ‘উচ্ছন্নে যাওয়া’, ‘বেহায়া’, আর চূড়ান্ত অপবাদ— ‘বেশ্যা’। অথচ সেই ধর্মীয় নেতা, যার ফেসবুক প্রোফাইলেই অর্ধনগ্ন নারীর ফলো লিস্ট ভর্তি, তার পবিত্রতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে।

৩: অর্থনীতি ও পুঁজিবাদ নারীকে কী বানায়?

আজকের পৃথিবীতে পুঁজিবাদ নারীকে করেছে ব্যবসার হাতিয়ার। নারীকে পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে মিডিয়া ও কর্পোরেট দুনিয়ায়। নারী এখন একরকম ব্র্যান্ড— তার শরীরের ব্যবহার হয় বিজ্ঞাপনে, বিক্রয়ে, বিনোদনে।

একটা মেয়ে যদি অর্থাভাবে নিজের শরীর বিক্রি করে, তাকে সমাজ ঘৃণা করে। কিন্তু যে সমাজ তাকে কাজ দেয় না, খাদ্য দেয় না, আশ্রয় দেয় না— সেই সমাজকে কে দায়ী করবে?

নারী যখন নিজের শরীরের উপর অধিকার দাবি করে, তখন তাকে অবজ্ঞা করা হয়। কিন্তু যখন তার সেই শরীর সমাজের ব্যবসার উপকরণ হয়, তখন সবাই চুপ থাকে। এটি এক ধরনের নীরব ধর্ষণ, যেখানে পুরো সমাজ ধর্ষক হয়ে দাঁড়ায়।

৪: ধর্ষণের পরে বিচার নয়, হয় প্রশ্ন

ধর্ষিতার কাছে পুলিশ প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, “তুমি কোথায় ছিলে?” “তোমার পোশাক কেমন ছিল?”

এই প্রশ্নগুলোই সমাজের মনোভাব বুঝিয়ে দেয়। ধর্ষক নয়, ধর্ষিতাই যেন দায়ী। সে যদি একটু আধুনিক হয়, যদি রাস্তায় হাঁটে, যদি কাজ করে— তাহলে তো সমাজের চোখে সে আগেই ‘বেশ্যা’!

ধর্ষণকারীরা বারবার পার পেয়ে যায়, কারণ সমাজ তাদের দেখে না। সমাজ শুধু দেখে মেয়েটির চলাফেরা, পোশাক, মুখের ভাষা। আর এখানেই নারীকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। তার কষ্ট নয়, তার শরীরই সমাজের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

 

চলুন এবার আপনাদের একটা কবিতা শুনানো যাক?

তাকে বেশ্যা বানিয়েছ তুমি

তাকে কেউ প্রেম দেয়নি— দিয়েছে দাম।
তার চোখে ছিল আলো, তোমরা চাইলেএর দেহের ছোলা।
সে যখন রুটি চাইলো, দিলা কামনার কড়ি,
আর তারপর বললে— “সে তো বেশ্যা, নরকের গরি!”

তোমারই তো শহরে ছিল সে এক খাঁচার পাখি,
তুমি শিস দিলে হাসলো, কাঁদলে— তাকে বখাটে ডাকী।
তাকে দাওনা আকাশ, কেবল শরীরের মানচিত্র,
তাকে ভালোবেসেছো কখন? কেবল চেয়েছো অধিকারহীন বিপদত্রিপ্ত।

ধর্মের বইয়ে তার শরীর আছে, মন কোথায়?
সেই প্রশ্নে হে পুরুষ, আজ তুমিই বেশ্যা দায়।

কেমন লাগলো হে লোহ মানব, এবার কি তোমার চক্ষু খুলিয়াছে নাকি তুমি নিজে‍ই নিজেকে বলবে না আমি না ওরা? চলো সামনে আগানো যাক।

 

৫: বেশ্যাবৃত্তি কি পেশা না সমাজের ফলাফল?

একজন নারী যখন দেহ ব্যবসায় নামে, সে কি খুব আনন্দে তা করে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর— না।

দারিদ্র্য, নির্যাতন, পারিবারিক ভাঙন, সমাজের বৈষম্য— সবকিছু মিলে একজন নারীকে ঠেলে দেয় এই পেশায়। কেউ কেউ আবার এক সময় এটাকে গ্রহণ করে, কারণ অন্য কোনো পথ নেই। কিন্তু সমাজ তাদের কোনো বিকল্প দেয় না— তারপর বলে, “সে তো বেশ্যা!”

এই নীতিবোধ, এই রুদ্ধ চিন্তাধারা, এই পিতৃতন্ত্রের সিস্টেমই নারীকে সেই জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজের শরীরকে পুঁজি করতে বাধ্য হয়। তার আগে কেউ তাকে চাকরি দেয়নি, শিক্ষা দেয়নি, সম্মান দেয়নি।

তাহলে কে দোষী? নারী, নাকি সেই সমাজব্যবস্থা?

৬: নারীর পক্ষে কথা বললে, আপনি বেকুব

এই সমাজে কেউ যদি বলে, “নারীর শরীর তার অধিকার”, তখন লোকজন বলে— “ও তো নারীঘেঁষা”, “ফেমিনিস্ট পাগল”, “ওর নিজের চরিত্র খারাপ।”

কারণ সত্যি কথা এই সমাজ সহ্য করতে পারে না। তারা চায় নারী চুপ থাকুক, মেনে নিক, হজম করুক। আর কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, তাহলে সেই মানুষকেও সমাজ আক্রমণ করে।

কিন্তু ইতিহাস বলে, সব বড় পরিবর্তন এসেছে প্রশ্ন থেকে। প্রশ্নই সমাজকে জাগায়। আর তাই নারীর পক্ষেও আজ প্রশ্ন করা দরকার।

৭: বেশ্যাবৃত্তির পেছনের মুখোশধারী পুরুষ

যারা রাত্রে গোপনে নারীর শরীর ভোগ করে, সকালে তার চরিত্র নিয়ে কথা বলে— তারাই এই সমাজের সবচেয়ে বিপজ্জনক শ্রেণি। তারা নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে চায়, কিন্তু সম্মান দিতে চায় না।

একজন পুরুষ যখন বারবার দেহ ব্যবসায় জড়িত হয়, তাকে কেউ ‘ব্যভিচারী’ বলে না। কারণ সমাজে পুরুষের অপরাধ লুকানো হয়, নারীর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত খতিয়ে দেখা হয়।

এবার চলুন দেখে আসি কে দায়ী?

শেষ প্রশ্নটিই মূল কথা: নারীকে ‘বেশ্যা’ কে বানায়?

➤ সেই ধর্মীয় নেতা, যে নিজের চোখ সামলায় না।
➤ সেই সমাজ, যে বিকল্প না দিয়ে নারীর শরীর চায়।
➤ সেই মিডিয়া, যারা নারীর শরীর বিক্রির উপায় বানায়।
➤ সেই পিতৃতন্ত্র, যা নারীকে মানুষ নয়, ভোগ্যপণ্য ভাবে।

নারী নিজের ইচ্ছায় কখনো বেশ্যাহয় না। সে হয় সমাজের ব্যর্থতা ও বর্বরতার শিকার। তবে হ্যাঁ, সে লড়তে শিখেছে। এখন নারী জেগে উঠছে। এখন সে বলছে— “আমার শরীর আমার অধিকার। তোমার কামনা নয়।”

লেখা: মিনহাজ মোল্লা (দৈনিক নাগরিক ভাবনা)

আরও পড়ুন:

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পড়ার সুযোগ দিন

বিশেষ আয়োজন

প্রবন্ধ কলাম

নারীকে বেশ্যা কে বানালো সমাজ না নারী

সর্বশেষ পরিমার্জন: ১০:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ মে ২০২৫

একবার চিন্তা করে দেখেন তো  “বেশ্যা”— এই শব্দটির উচ্চারণেই সমাজ এক ধরণের নৈতিক ভয়, ধিক্কার আর ঘৃণার ছবি আঁকে। অথচ সমাজ জানেই না, এই শব্দটির উৎপত্তির উৎস, এর নির্মাতা আসলে কে। একটি মেয়ে যখন নিজের শরীর দিয়ে বাঁচতে চায়, তখন তাকে বেশ্যা বলা হয়। কিন্তু সেই সমাজ, যে তাকে কোনো বিকল্প দেয়নি— তার কি দায় নেই? এই আর্টিকেলে আমরা উন্মোচন করবো সেই মুখোশ, যেখানে নারীকে ভেঙে, পিষে, পণ্য করে, তাকে আবার অপরাধীর আসনে বসানো হয়।

১: নারীর শরীর বনাম সমাজের কামনা

সমাজে নারীকে নিয়ে যে কামনার রাজনীতি চলে, তা নতুন কিছু নয়। নারী যেন একটা জন্মগত পণ্য— তার শরীরই হয়ে ওঠে পরিচয়। ছোটবেলা থেকে একটি মেয়ে শেখে, “ভালো মেয়ে” হতে গেলে তাকে নির্দিষ্ট পোশাকে, নির্দিষ্ট চাহিদায় নিজেকে সাজাতে হবে। কিন্তু কাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই সাজ? উত্তর— পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।

নারীর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই সমাজের চোখে এক এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে। স্তন, নিতম্ব, ঠোঁট— সবই যেন সমাজের চাহিদার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। মিডিয়ায় নারীকে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয়, যেন সে কেবল ভোগ্যপণ্য। বিজ্ঞাপন হোক, নাটক বা সিনেমা— সবখানেই নারী শরীর ব্যবহৃত হয় বিক্রয়ের কৌশল হিসেবে।

এই কাঠামোতে নারীর ইচ্ছা গৌণ হয়ে পড়ে। সে কি চায়, কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়— এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। তাকে কীভাবে সমাজ দেখতে চায়, সেটাই তার নিয়তি। আর এই নিয়তি যখন ভেঙে যায়, তখন সমাজ বলে— সে বেশ্যা।

২: ধর্মের মুখোশের নিচে নারী নিপীড়ন

ধর্ম সমাজকে নৈতিকতা শেখায়— কিন্তু একইসাথে নারীর উপর চাপিয়ে দেয় নিয়ন্ত্রণের জাল। অধিকাংশ ধর্মে নারীর স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত, তার পোশাক, চলাফেরা, এমনকি কথাবার্তাও নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে বাঁধা।

পুরুষ ধর্ম প্রচারক যখন বলে, “নারী যদি শরীর দেখায়, তবে পুরুষের চোখ যাবে”, তখন দায় নারীর উপর চাপানো হয়। কিন্তু পুরুষের চোখের দায় কে নেবে? সেই প্রশ্ন তোলা যায় না। কারণ ধর্মীয় কাঠামোতে নারীই চিরকাল নীচু অবস্থানে।

নারী যখন নিজের ইচ্ছায় বাঁচতে চায়, নিজের পছন্দে পোশাক পরতে চায়, তখন তাকে বলা হয়— ‘পাপিষ্ঠা’, ‘উচ্ছন্নে যাওয়া’, ‘বেহায়া’, আর চূড়ান্ত অপবাদ— ‘বেশ্যা’। অথচ সেই ধর্মীয় নেতা, যার ফেসবুক প্রোফাইলেই অর্ধনগ্ন নারীর ফলো লিস্ট ভর্তি, তার পবিত্রতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে।

৩: অর্থনীতি ও পুঁজিবাদ নারীকে কী বানায়?

আজকের পৃথিবীতে পুঁজিবাদ নারীকে করেছে ব্যবসার হাতিয়ার। নারীকে পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে মিডিয়া ও কর্পোরেট দুনিয়ায়। নারী এখন একরকম ব্র্যান্ড— তার শরীরের ব্যবহার হয় বিজ্ঞাপনে, বিক্রয়ে, বিনোদনে।

একটা মেয়ে যদি অর্থাভাবে নিজের শরীর বিক্রি করে, তাকে সমাজ ঘৃণা করে। কিন্তু যে সমাজ তাকে কাজ দেয় না, খাদ্য দেয় না, আশ্রয় দেয় না— সেই সমাজকে কে দায়ী করবে?

নারী যখন নিজের শরীরের উপর অধিকার দাবি করে, তখন তাকে অবজ্ঞা করা হয়। কিন্তু যখন তার সেই শরীর সমাজের ব্যবসার উপকরণ হয়, তখন সবাই চুপ থাকে। এটি এক ধরনের নীরব ধর্ষণ, যেখানে পুরো সমাজ ধর্ষক হয়ে দাঁড়ায়।

৪: ধর্ষণের পরে বিচার নয়, হয় প্রশ্ন

ধর্ষিতার কাছে পুলিশ প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, “তুমি কোথায় ছিলে?” “তোমার পোশাক কেমন ছিল?”

এই প্রশ্নগুলোই সমাজের মনোভাব বুঝিয়ে দেয়। ধর্ষক নয়, ধর্ষিতাই যেন দায়ী। সে যদি একটু আধুনিক হয়, যদি রাস্তায় হাঁটে, যদি কাজ করে— তাহলে তো সমাজের চোখে সে আগেই ‘বেশ্যা’!

ধর্ষণকারীরা বারবার পার পেয়ে যায়, কারণ সমাজ তাদের দেখে না। সমাজ শুধু দেখে মেয়েটির চলাফেরা, পোশাক, মুখের ভাষা। আর এখানেই নারীকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। তার কষ্ট নয়, তার শরীরই সমাজের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

 

চলুন এবার আপনাদের একটা কবিতা শুনানো যাক?

তাকে বেশ্যা বানিয়েছ তুমি

তাকে কেউ প্রেম দেয়নি— দিয়েছে দাম।
তার চোখে ছিল আলো, তোমরা চাইলেএর দেহের ছোলা।
সে যখন রুটি চাইলো, দিলা কামনার কড়ি,
আর তারপর বললে— “সে তো বেশ্যা, নরকের গরি!”

তোমারই তো শহরে ছিল সে এক খাঁচার পাখি,
তুমি শিস দিলে হাসলো, কাঁদলে— তাকে বখাটে ডাকী।
তাকে দাওনা আকাশ, কেবল শরীরের মানচিত্র,
তাকে ভালোবেসেছো কখন? কেবল চেয়েছো অধিকারহীন বিপদত্রিপ্ত।

ধর্মের বইয়ে তার শরীর আছে, মন কোথায়?
সেই প্রশ্নে হে পুরুষ, আজ তুমিই বেশ্যা দায়।

কেমন লাগলো হে লোহ মানব, এবার কি তোমার চক্ষু খুলিয়াছে নাকি তুমি নিজে‍ই নিজেকে বলবে না আমি না ওরা? চলো সামনে আগানো যাক।

 

৫: বেশ্যাবৃত্তি কি পেশা না সমাজের ফলাফল?

একজন নারী যখন দেহ ব্যবসায় নামে, সে কি খুব আনন্দে তা করে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর— না।

দারিদ্র্য, নির্যাতন, পারিবারিক ভাঙন, সমাজের বৈষম্য— সবকিছু মিলে একজন নারীকে ঠেলে দেয় এই পেশায়। কেউ কেউ আবার এক সময় এটাকে গ্রহণ করে, কারণ অন্য কোনো পথ নেই। কিন্তু সমাজ তাদের কোনো বিকল্প দেয় না— তারপর বলে, “সে তো বেশ্যা!”

এই নীতিবোধ, এই রুদ্ধ চিন্তাধারা, এই পিতৃতন্ত্রের সিস্টেমই নারীকে সেই জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজের শরীরকে পুঁজি করতে বাধ্য হয়। তার আগে কেউ তাকে চাকরি দেয়নি, শিক্ষা দেয়নি, সম্মান দেয়নি।

তাহলে কে দোষী? নারী, নাকি সেই সমাজব্যবস্থা?

৬: নারীর পক্ষে কথা বললে, আপনি বেকুব

এই সমাজে কেউ যদি বলে, “নারীর শরীর তার অধিকার”, তখন লোকজন বলে— “ও তো নারীঘেঁষা”, “ফেমিনিস্ট পাগল”, “ওর নিজের চরিত্র খারাপ।”

কারণ সত্যি কথা এই সমাজ সহ্য করতে পারে না। তারা চায় নারী চুপ থাকুক, মেনে নিক, হজম করুক। আর কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, তাহলে সেই মানুষকেও সমাজ আক্রমণ করে।

কিন্তু ইতিহাস বলে, সব বড় পরিবর্তন এসেছে প্রশ্ন থেকে। প্রশ্নই সমাজকে জাগায়। আর তাই নারীর পক্ষেও আজ প্রশ্ন করা দরকার।

৭: বেশ্যাবৃত্তির পেছনের মুখোশধারী পুরুষ

যারা রাত্রে গোপনে নারীর শরীর ভোগ করে, সকালে তার চরিত্র নিয়ে কথা বলে— তারাই এই সমাজের সবচেয়ে বিপজ্জনক শ্রেণি। তারা নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে চায়, কিন্তু সম্মান দিতে চায় না।

একজন পুরুষ যখন বারবার দেহ ব্যবসায় জড়িত হয়, তাকে কেউ ‘ব্যভিচারী’ বলে না। কারণ সমাজে পুরুষের অপরাধ লুকানো হয়, নারীর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত খতিয়ে দেখা হয়।

এবার চলুন দেখে আসি কে দায়ী?

শেষ প্রশ্নটিই মূল কথা: নারীকে ‘বেশ্যা’ কে বানায়?

➤ সেই ধর্মীয় নেতা, যে নিজের চোখ সামলায় না।
➤ সেই সমাজ, যে বিকল্প না দিয়ে নারীর শরীর চায়।
➤ সেই মিডিয়া, যারা নারীর শরীর বিক্রির উপায় বানায়।
➤ সেই পিতৃতন্ত্র, যা নারীকে মানুষ নয়, ভোগ্যপণ্য ভাবে।

নারী নিজের ইচ্ছায় কখনো বেশ্যাহয় না। সে হয় সমাজের ব্যর্থতা ও বর্বরতার শিকার। তবে হ্যাঁ, সে লড়তে শিখেছে। এখন নারী জেগে উঠছে। এখন সে বলছে— “আমার শরীর আমার অধিকার। তোমার কামনা নয়।”

লেখা: মিনহাজ মোল্লা (দৈনিক নাগরিক ভাবনা)