ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
তাজা খবর
অসুস্থ হনুমান চিকিৎসা নেওয়ার জন্য নিজেই হাসপাতালে হাজির
মেধার স্বাক্ষরে দেশসেরা মনিরামপুরের সুরাইয়া ও অরিত্র
ব্যারিস্টার জাইমা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করেছেন
মঠবাড়িয়ায় ৩০ আঙুল নিয়ে নবজাতকের জন্ম, নেই জিহ্বাও
ক্রিসেন্ট জুট মিল ৩০ বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নিল মাহবুব গ্রুপ
ঈদুল আযাহাকে সামনে রেখে কামররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন
১১ মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে মুজিবুর
ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ৬ কোটি ডলার ঘোষণার কথা ভাবছে ইরান, উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, প্রমাণও পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রকোপ বৃদ্ধি আতঙ্ক নয় রোধ করতে প্রয়োজন জনসচেতনতা

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৪:০১:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ জুন ২০২৫
- / ৪২৫ বার পঠিত

দেশে ডেঙ্গু, করোনা এবং চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে।ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া দুটি মশাবাহিত ভাইরাসঘটিত রোগ, যা একই বাহক – এডিস মশা – দ্বারা ছড়ায়। উভয় রোগের প্রাথমিক উপসর্গগুলো একই রকম, যেমন জ্বর, মাথাব্যথা, মাংসপেশীতে ব্যথা, এবং শরীরে ফুসকুড়ি হওয়া। তবে, চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধিগুলোতে তীব্র ব্যথা বেশি দেখা যায়, যা অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে, কিছু ক্ষেত্রে রক্তপাত এবং শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই রোগ দুটি প্রতিরোধে মশার কামড় থেকে বাঁচা এবং মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা জরুরি।
> ডেঙ্গু জ্বর (Dengue Fever):
প্রতিবছর বর্ষা এলেই ডেঙ্গু আতঙ্ক ফিরে আসে, এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে যেমন- ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। চলতি সময়ের ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে এই চারটি ধরনের মধ্যে সবচেয়ে তিনটি ধরণ বেশি। এর মধ্যে ডেন-১, ডেন-২ এবং ডেন-৩ সেরোটাইপ দিয়ে নতুনভাবে সংক্রমণ হচ্ছে।আর ডেঙ্গু জ্বর একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যা ডেঙ্গু ভাইরাস (DENV) দ্বারা সৃষ্ট। এই ভাইরাস A, B, C, এবং D চারটি সেরোটাইপে (serotypes) বিদ্যমান। একবার কোনো ব্যক্তি কোনো একটি সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে, তার সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে জীবনভর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তবে অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।
>কারণ:
* ডেঙ্গু ভাইরাস (DENV) প্রধানত এডিস ইজিপ্টি (Aedes aegypti) এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস (Aedes albopictus) নামক মশা দ্বারা বাহিত হয়।
* এই মশা দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে এবং সাধারণত পরিষ্কার, আবদ্ধ পানিতে ডিম পাড়ে।
* সংক্রমিত মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।
> লক্ষণ ও উপসর্গ:
* ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান লক্ষণগুলি হল তীব্র জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশী ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, এবং শরীরে ফুসকুড়ি।
* কিছু ক্ষেত্রে, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (Dengue Hemorrhagic Fever) বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (Dengue Shock Syndrome) নামক মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেখানে রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কর্মহীনতা হতে পারে।
* ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ৩ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রোগের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে।
>রোগ নির্ণয়:
* ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়, যা ভাইরাসের অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডি সনাক্ত করতে পারে।
> প্রতিরোধ:
* মশার বিস্তার রোধ করা: মশা জন্মানোর জন্য উপযুক্ত স্থানগুলি ধ্বংস করা, যেমন- ফুলের টবে জমা পানি, বাতিল টায়ার, এবং অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানি অপসারণ করা।
* ব্যক্তিগত সুরক্ষার ব্যবস্থা: দিনে এবং সন্ধ্যায় মশা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ফুল হাতা জামাকাপড় পরা, মশা তাড়ানোর স্প্রে ব্যবহার করা এবং ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা উচিত।
> চিকুনগুনিয়া (Chikungunya):
চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাল রোগ, যা চিকুনগুনিয়া ভাইরাস (CHIKV) দ্বারা ছড়ায়। এটিও এডিস মশার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়।
> কারণ:
* চিকুনগুনিয়া ভাইরাসও মূলত এডিস ইজিপ্টি (Aedes aegypti) এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস (Aedes albopictus) মশার মাধ্যমে ছড়ায়।
* এই মশাগুলি দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে এবং পরিষ্কার, আবদ্ধ পানিতে ডিম পাড়ে।
> লক্ষণ ও উপসর্গ:
* চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রধান লক্ষণগুলি হল হঠাৎ জ্বর, তীব্র অস্থিসন্ধি ব্যথা (বিশেষ করে হাত ও পায়ের), মাথাব্যথা, মাংসপেশীতে ব্যথা, এবং শরীরে ফুসকুড়ি।
* এই রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অস্থিসন্ধিগুলোতে তীব্র ব্যথা, যা কয়েক সপ্তাহ, মাস বা এমনকি বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
* কিছু ক্ষেত্রে, চিকুনগুনিয়ার কারণে স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, যেমন- মেনিনজাইটিস বা এনসেফালাইটিস হতে পারে।
> চিকনগুনিয়া নির্ণয়:
* চিকনগুনিয়া রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রধানত দুটি পরীক্ষা করা হয়:
* RDT (র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট): এই পরীক্ষায় দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায় এবং এটি সাধারণত রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে করা হয়।
* RT-PCR (রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন): এই পরীক্ষাটি আরও সুনির্দিষ্ট এবং সাধারণত রোগের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে করা হয়।
> চিকনগুনিয়ার প্রতিকার:
* চিকনগুনিয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। রোগের চিকিৎসা মূলত উপসর্গ অনুযায়ী হয়ে থাকে।
* পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন।
* জ্বর ও ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। তবে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।
* প্রচুর পরিমাণে জল, ফলের রস এবং অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করা উচিত।
* মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে মশারী ব্যবহার করা, মশা তাড়ানোর স্প্রে ব্যবহার করা এবং বাড়ির আশেপাশে পানি জমতে না দেয়া উচিত।
* চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, পরিবেশদূষণ ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের বেশ কিছু সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের উন্নয়ন কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেই। অথচ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা। একটি দেশের জনগণের স্বাস্থ্য, গড় আয়ুসহ অনেক কিছুই নির্ভর করে সে দেশের পরিবেশের ওপর। বর্তমানে দেশে পরিবেশের যে অবস্থা, তা শুধু চিন্তিত হওয়ারই নয়, বরং উদ্বেগেরও। তা ছাড়া জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বায়ুদূষণ, পানিদূষণ ও শব্দদূষণ। বৃক্ষ যেমন পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সহায়তা করে, তেমনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও রক্ষা পেতে সহায়তা করে। কিন্তু আমরা নির্বিচারে গাছ কেটে বন উজাড় করে ফেলছি। নিষিদ্ধ পলিথিন-জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যসহ বিভিন্ন কারণে ক্রমেই আমাদের মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হচ্ছে। বাহ্যিকভাবে শব্দদূষণ তেমন কোনো ক্ষতিকর মনে না হলেও তা মানুষের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর।আর অপরিকল্পিত নগরায়ন, মশা নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির মূল কারণ। আবার বিশেষ করে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং কোভিড-১৯ এর নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জুন থেকে অক্টোবর সময়কালকে ভাইরাস জ্বরের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ সারাদেশে ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে।তাই চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা ও মানুষের পাশাপাশি অন্য উৎসগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে, সংক্রমণের সম্ভাব্য উপায়গুলো খুঁজে বের করতে হবে। যেমন—বন-জঙ্গলে থাকা এডিস মশা ও অন্যান্য মশায় এ রোগের জীবাণু আছে কি না তা শনাক্ত করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে যে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে, এগুলোর জিনগত বৈচিত্র্য নিরূপণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সাশ্রয়ী মূল্যে ভাইরাস শনাক্তকরণের পদ্ধতি বের করতে হবে, যাতে মহামারির সময় দ্রুত চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু রোগ একই সঙ্গে নির্ণয় করা যায়। আর চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু আমাদের জাতীয় সমস্যা। তাই আতঙ্কিত না হয়ে এসব রোগের নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারলে মশাবাহিত রোগমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে পারব।
আরও পড়ুন:





















