ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
তাজা খবর
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
বৃষ্টিতে পানির নিচে পেঁয়াজ: কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা
টঙ্গীতে স্ত্রীর হাতে স্বামীর পুরুষাঙ্গ কর্তন
হরমুজ প্রণালি ও ইরানে শাসক পরিবর্তন নিয়ে মুখ খুললেন মার্কো রুবিও
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার
বাংলাদেশ ব্যাংকে ১০৮ সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সিটি কর্পোরেশন প্রশাসকের নির্দেশনা
সক্রিয় দালালচক্র ॥ চিকিৎসা বঞ্চিত রোগীর সাথে স্বজনদের ভোগান্তি চরমে
অবৈধ তেল মজুদকারী ধরতে লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন: ছাত্ররাজনীতি ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সংকট

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।।
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০৪:২৭:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
- / ৭ বার পঠিত

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।।
বাংলাদেশের রাজনীতি সবসময়ই ইতিহাস, আবেগ, সংগ্রাম ও ক্ষমতার জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। এই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনোই শুধু নির্বাচন কিংবা সরকার পরিবর্তনের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর গভীরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রাষ্ট্রগঠনের দর্শন, সামরিক ও বেসামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা, গণআন্দোলনের উত্তরাধিকার এবং দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও সুসংহত গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের জায়গায় পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে এবং সেই বিভাজনের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের শিক্ষাঙ্গনে।
একসময় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক জাগরণের প্রাণকেন্দ্র। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা জাতির অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি তার আদর্শিক শক্তি হারিয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দখলদারিত্বের সংস্কৃতিতে রূপ নিতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষাঙ্গনকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রের পাশাপাশি সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহার করেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মতের বহুমাত্রিকতা ও সহাবস্থানের চর্চা দুর্বল হয়েছে, আর শক্তিশালী হয়েছে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ ও আনুগত্যের রাজনীতি।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো আবাসন সমস্যা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। তাদের বড় অংশ কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী কিংবা সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তান। রাজধানী বা বড় শহরে বাসা ভাড়া করে পড়াশোনা চালানো অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র আশ্রয় ও টিকে থাকার অবলম্বন।
দীর্ঘদিন ধরে এই আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে শিক্ষাঙ্গনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। নতুন শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষেত্রেই আবাসিক সিট পাওয়ার জন্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের শরণাপন্ন হতে হয়। সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়। মিছিল, মিটিং, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা সাংগঠনিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে আবাসিক জীবনের অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে। ফলে বহু শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত আদর্শ বা রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজন এবং নিরাপত্তার কারণেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এই বাস্তবতা অনুধাবন না করে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিকে কেবল আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কারণ শিক্ষাঙ্গনের বড় একটি অংশে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা অনেক সময় বিশ্বাসের চেয়ে বেঁচে থাকার কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ কারণেই সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনের ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যায়। যে রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি থাকে, সাধারণত তারাই ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন শক্তি পুরোনো শক্তির জায়গা দখল করে নেয়, কিন্তু পরিবর্তন হয় না দখলদারিত্বের সংস্কৃতি।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিছক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়; এটি একটি গভীর মানবিক ও সামাজিক সংকট। রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে বহু শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ক্যাম্পাসে ফিরতে পারছে না, কেউ সামাজিক প্রতিশোধের আশঙ্কায় আত্মগোপনে রয়েছে, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। এর বড় অংশই এমন পরিবার থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থী, যাদের বাবা-মা জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ও স্বপ্ন বিনিয়োগ করেছেন সন্তানের উচ্চশিক্ষার পেছনে।
একটি দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সন্তানের উচ্চশিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি পুরো পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দখলদারিত্ব কিংবা সহিংসতার কারণে ভেঙে যায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল একজন শিক্ষার্থী নয়, বরং একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং একটি জাতির সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতা। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাঙ্গনেও প্রতিশোধমূলক মনোভাব প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করে ফেলে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেটি জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী যদি সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকে, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু গণহারে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা, সামাজিকভাবে চিহ্নিত করা কিংবা ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে সহিংসতা, প্রতিশোধ এবং মব সংস্কৃতি কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। বরং তা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন ও অস্থিরতার জন্ম দেয়। শিক্ষাঙ্গনে যখন সহাবস্থানের পরিবেশ নষ্ট হয়, তখন গণতন্ত্রের ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার ক্ষেত্র।
আজ সময় এসেছে ছাত্ররাজনীতিকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার। শিক্ষার্থীদের মৌলিক আবাসন সংকটের সমাধান না করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত না করে এবং শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা না করে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং মেধা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কেমন রাষ্ট্র চাই? এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনের দখলদারিত্বের মানচিত্র বদলাবে, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্তচিন্তা, গবেষণা, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের প্রাণকেন্দ্র?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে। কারণ একটি জাতির বিশ্ববিদ্যালয় যদি স্বাধীন না থাকে, তবে সেই জাতির গণতন্ত্রও কখনো সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারে না।
লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা।সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক, গবেষক ও কলামিস্ট।
আরও পড়ুন:
।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।।





















