ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
তাজা খবর
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
বৃষ্টিতে পানির নিচে পেঁয়াজ: কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা
টঙ্গীতে স্ত্রীর হাতে স্বামীর পুরুষাঙ্গ কর্তন
হরমুজ প্রণালি ও ইরানে শাসক পরিবর্তন নিয়ে মুখ খুললেন মার্কো রুবিও
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার
বাংলাদেশ ব্যাংকে ১০৮ সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সিটি কর্পোরেশন প্রশাসকের নির্দেশনা
সক্রিয় দালালচক্র ॥ চিকিৎসা বঞ্চিত রোগীর সাথে স্বজনদের ভোগান্তি চরমে
অবৈধ তেল মজুদকারী ধরতে লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা
রবীন্দ্রনাথ আমাদের চলমান জীবনের অংশ

রাকিবুল ইসলাম
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:২৭:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
- / ১০ বার পঠিত

রাকিবুল ইসলাম:
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা শুধু প্রতিভার বিস্ময় নন—তাঁরা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তাঁদের সৃষ্টিকর্ম কেবল কোনো একটি সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং সময়কে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের মননে স্থায়ী আসন গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তেমনই এক নাম যাঁকে শুধু কবি, গীতিকার কিংবা কথাসাহিত্যিক বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ আসলে একটি সভ্যতার বিবেক, একটি জাতির ভাবনার দিগন্ত, একটি ভাষার আত্মা। তিনি আমাদের সাহিত্যকে দিয়েছেন সৌন্দর্য, সংস্কৃতিকে দিয়েছেন গভীরতা এবং চেতনাকে দিয়েছেন মানবিকতার আলো।
রবীন্দ্রনাথকে জানার অর্থ তাঁর কবিতা মুখস্থ করা নয় কিংবা তাঁর গান গেয়ে আবেগে ভেসে যাওয়া নয়। তাঁকে জানা মানে নিজের ভেতরের মানুষটিকে নতুন করে আবিষ্কার করা। তাঁর লেখা আমাদের সামনে তুলে ধরে প্রেমের সূক্ষ্মতা, প্রকৃতির নীরব ভাষা, সমাজের দ্বন্দ্ব, মানুষের লোভ ও ভয়, শোষণের নির্মমতা, আবার মুক্তির অনিবার্য আকাঙ্ক্ষাও। এই বহুমাত্রিক উপস্থিতিই রবীন্দ্রনাথকে কেবল সাহিত্যিক নয় এক চিরকালীন প্রাসঙ্গিক চিন্তাবিদ করে তুলেছে।রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে যতটা আবেগ, ততটাই প্রয়োজন তাঁর চিন্তার বাস্তব পাঠ। কারণ তিনি ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যিনি সৌন্দর্যকে দেখেছেন মানবতার চোখ দিয়ে, দেশপ্রেমকে দেখেছেন নৈতিকতার আলোয়, আর ধর্মকে দেখেছেন সংকীর্ণতার বিপরীতে মুক্ত চেতনার দৃষ্টিতে। আজকের বাংলাদেশ কিংবা সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী সমাজ যে নানামুখী সংকটে দাঁড়িয়ে নৈতিক অবক্ষয়, সহিংসতা, বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, আত্মকেন্দ্রিকতা সেই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথকে স্মৃতিচারণ নয়, প্রয়োজন চেতনার আলো হিসেবে ফিরে দেখা।নবজাগরণের ঘরে জন্ম, কিন্তু নিজের আলোয় আলোকিত।
১৮৬১ সালের ৭ মে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। ঠাকুর পরিবার উনিশ শতকের ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র যেখানে শিক্ষা, শিল্প, সংগীত, দর্শন, সমাজসংস্কার ও জাতীয় চেতনার নানা প্রবাহ একত্রে মিলিত হয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কেবল সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিক উত্তরসূরি ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে নির্মাণ করার এক বিস্ময়কর স্রষ্টা। তাঁর চিন্তা ছিল যুগের সঙ্গে সংলাপরত, আবার যুগকে ছাড়িয়েও বহমান।
শৈশব থেকেই রবীন্দ্রনাথের ভেতরে ছিল স্বাধীনতা ও প্রশ্ন করার প্রবণতা। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। নিয়মের স্কুল, পরীক্ষার চাপ, মুখস্থবিদ্যা—এসব তাঁর কল্পনার বিস্তৃত আকাশকে সংকুচিত করত। ফলে তাঁর শিক্ষা হয়ে ওঠে প্রকৃতি, জীবন ও অভিজ্ঞতার পাঠ। এই আত্মশিক্ষাই তাঁর লেখায় এনে দেয় অনন্য গভীরতা, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি যেন একে অপরের ভাষা হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজগতে প্রকৃতি কখনো কেবল পটভূমি নয়; প্রকৃতি সেখানে জীবন্ত সত্তা, অনুভবের সঙ্গী, কখনোবা দর্শনের বাহক।
রবীন্দ্রনাথ যে সময়ের সন্তান, সে সময় ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের টালমাটাল সময়। ঔপনিবেশিক শাসন, ধর্মীয় কুসংস্কার, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অবমূল্যায়ন, জাতপাতের বিভেদ সবকিছু মিলিয়ে ভারতবর্ষ তখন এক ধরনের সংঘাতময় বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। এই বাস্তবতা রবীন্দ্রনাথকে একদিকে যেমন গভীরভাবে আলোড়িত করেছে, অন্যদিকে তাঁর ভেতরে গড়ে তুলেছে মানবতার এমন এক দর্শন, যা কেবল তৎকালীন ভারত নয় আজকের পৃথিবীর জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা প্রায় অসম্ভব। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, ভ্রমণকাহিনি, সংগীত সব মিলিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে দিয়েছেন আধুনিকতার পূর্ণতা। তাঁর হাত ধরে বাংলা ভাষা পেয়েছে ভাবের নতুন বিস্তার, শব্দের নতুন শক্তি, আর মানবিক অনুভবের এমন এক গভীরতা, যা আগে এই মাত্রায় দেখা যায়নি। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে দর্শন, আছে প্রকৃতির মর্মভাষা, আছে জীবন-রহস্যের অনুসন্ধান। তাঁর কবিতায় মানুষ কখনো শুধু ব্যক্তি নয় মানুষ সেখানে এক মহাজগতের অংশ, এক অনন্ত যাত্রার পথিক।
‘গীতাঞ্জলি’ তাঁর কাব্যজগতের এক অনন্য মাইলফলক। এটি শুধু কবিতার বই নয় এ যেন আত্মার আরাধনার ভাষা। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বড় ঘটনা ঘটেছিল বাংলা ভাষার ইতিহাসে। বিশ্বের দরবারে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এই ভাষায় লেখা সাহিত্যও সার্বজনীন মানব-অনুভব প্রকাশ করতে পারে।
তবে রবীন্দ্রনাথকে কেবল নোবেলজয়ী কবির পরিচয়ে আটকে রাখলে তাঁর প্রকৃত ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। গল্পকার হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যের ভিত শক্ত করেছেন। আধুনিক ছোটগল্পের যে কাঠামো ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আজ প্রতিষ্ঠিত, তার ভিত্তি নির্মাণে রবীন্দ্রনাথ অনিবার্য। ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘ছুটি’, ‘নষ্টনীড়’—এসব গল্প আমাদের শুধু ঘটনা শোনায় না; মানুষের মনস্তত্ত্বের দরজা খুলে দেয়। তাঁর গল্পে সমাজের নিষ্ঠুরতা যেমন আছে, তেমনি আছে মমতা, ব্যথা ও সহানুভূতির আলো। তিনি বুঝেছিলেন—মানুষকে বোঝার সবচেয়ে বড় মাধ্যম তার অনুভূতি। তাই রবীন্দ্রনাথের গল্পে চোখের জল যেমন আছে, তেমনি আছে নীরবতার ভাষাও।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে যুক্ত করেছে এক নতুন মাত্রা। ‘চোখের বালি’ মানুষের গোপন আবেগ ও সম্পর্কের জটিলতাকে সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। সমাজ যে মুখোশ পরে থাকে, তার আড়ালের সত্যকে তিনি নির্মম সততায় তুলে ধরেছেন। ‘ঘরে বাইরে’তে উঠে এসেছে জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত। এটি শুধু রাজনৈতিক উপন্যাস নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, প্রেম, দায়িত্ববোধ এবং আদর্শের দ্বন্দ্বের এক গভীর পাঠ। আর ‘গোরা’ উপন্যাসে ধর্ম, জাতপাত, পরিচয় ও মানবতার প্রশ্ন এমনভাবে উত্থাপিত হয়েছে, যা আজও আমাদের সমাজে সমানভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস কেবল বিনোদনের পাঠ নয়; এগুলো সমাজ-রাজনীতির অন্তর্লীন সত্যকে সাহিত্যিক আলোয় উন্মোচিত করে।
আজকের বাংলাদেশে যখন ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক বিভাজন নানা মাত্রায় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছে, তখন ‘গোরা’র প্রশ্ন আরও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, পরিচয় কখনো মানবতার চেয়ে বড় হতে পারে না। মানুষকে মানুষের জায়গায় দেখতে না পারলে সভ্যতা অন্ধকারে ঢেকে যায়।
রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বহুমাত্রিকতা প্রকাশ করে। ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’, ‘অচলায়তন’—এসব নাটক শুধু মঞ্চের জন্য নয়, মানুষের মুক্তির জন্য লেখা। প্রতীক, দর্শন এবং প্রতিবাদের ভাষা তাঁর নাটকে গভীরভাবে উপস্থিত। ‘রক্তকরবী’তে লোভ ও শোষণের বিরুদ্ধে মানবিক আত্মার বিদ্রোহ যেমন রয়েছে, তেমনি ‘ডাকঘর’ মৃত্যুকে দেখিয়েছে মুক্তির এক দরজা হিসেবে—যেখানে জীবনের সীমাবদ্ধতা ভেঙে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
‘অচলায়তন’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ধর্ম যখন কুসংস্কারে পরিণত হয়, তখন তা মানবমুক্তির পথ রুদ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথ ধর্মকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু ধর্মের নামে অন্ধতা ও গোঁড়ামিকে তিনি ভয়ংকর বলে চিহ্নিত করেছেন। আজ যখন ধর্মীয় উগ্রতা, বিদ্বেষ এবং সংকীর্ণতার রাজনীতি সমাজে নানা জায়গায় মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
বাঙালির অনুভবের চিরন্তন সুর
রবীন্দ্রসংগীত শুধু গান নয়, এটি বাঙালির অনুভবের একটি ভাষা। রবীন্দ্রনাথ দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন যেখানে প্রেম, প্রকৃতি, ঈশ্বর, দেশপ্রেম, বিরহ, আনন্দ সবই একসূত্রে গাঁথা। বাঙালির জীবনে এমন কোনো অনুভূতি নেই, যেখানে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত। আনন্দে তিনি উৎসব, দুঃখে তিনি আশ্রয়, নিঃসঙ্গতায় তিনি সঙ্গী। এবং বিশ্ব ইতিহাসে খুব কম স্রষ্টাই আছেন, যাঁর লেখা একাধিক দেশের জাতীয় সংগীত হয়ে উঠেছে। ভারতের ‘জন গণ মন’ এবং বাংলাদেশের ‘আমার সোনার বাংলা’ দুটিই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি। এটি কেবল ঐতিহাসিক কাকতালীয় ঘটনা নয়; এটি তাঁর সৃষ্টির সার্বজনীনতার অনন্য প্রমাণ। রবীন্দ্রনাথ যে দেশপ্রেমের গান লিখেছেন, তা কখনো ঘৃণার ভাষা নয়; তা ভালোবাসার ভাষা। তিনি দেশকে ভালোবেসেছেন মাটির গন্ধে, মানুষের হাসি-কান্নায়, প্রকৃতির সৌন্দর্যে—অন্যকে বাদ দিয়ে নয়, অন্যকে স্বীকার করেই।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতার প্রাণভূমি রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যচর্চায় পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জমিদারি তদারকির সূত্রে তিনি বারবার এসেছেন এই অঞ্চলে। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর এই নামগুলো রবীন্দ্রজীবনের মানচিত্রে কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়, তাঁর সৃষ্টির একেকটি মৌলিক উৎস।শিলাইদহের পদ্মা, বর্ষার জলরাশি, গ্রামের মানুষের সহজ জীবন—এসব তাঁর ভাবনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এখানকার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি লিখেছেন ‘ছিন্নপত্র’, যা শুধু চিঠির সংকলন নয়—এ এক অনন্য সাহিত্যিক দলিল। সেখানে পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং কবির অন্তর্জগত একত্র হয়ে ওঠে। ‘ছিন্নপত্র’ পড়লে বোঝা যায়—রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে দেখতেন চোখ দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে।
শাহজাদপুরে যমুনা নদীর বিস্তৃতি, চরাঞ্চলের ভাঙন ও মানুষের অনিশ্চিত জীবন রবীন্দ্রনাথকে শিখিয়েছে বাস্তবের কঠিন পাঠ। আর পতিসরে কৃষকের দারিদ্র্য, ঋণের ভার, মহাজনী শোষণের নির্মমতা তাঁকে ভাবিয়েছে গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের মতো উদ্যোগে তাঁর চিন্তার ভিত শক্ত করে।
রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন এই পরিচয় তাঁর জীবনে একটি বিতর্কিত মাত্রাও যোগ করে। কিন্তু ইতিহাসের বিচার করতে গেলে দেখতে হয় তিনি জমিদার হয়েও প্রজাদের জীবনকে দূর থেকে দেখেননি। তিনি গ্রামবাংলার বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছেন এবং শোষণের কাঠামোকে প্রশ্ন করেছেন। তাঁর অনেক লেখায় সেই আত্মসমালোচনার সুরও শোনা যায়—যা একজন বড় মাপের স্রষ্টারই লক্ষণ।
রবীন্দ্রসাহিত্যের জীবন্ত উপাদান বাংলাদেশের নদীমাতৃক প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। পদ্মা-যমুনার স্রোত, বর্ষার আকাশ, শরতের কাশফুল, শীতের কুয়াশা—এসব তাঁর কবিতায় শুধু দৃশ্য নয়, এক ধরনের দর্শন। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মিক। তাই প্রকৃতি তাঁর কাছে কখনো প্রেম, কখনো প্রতিবাদ, কখনো ঈশ্বর-অন্বেষণের ভাষা হয়ে উঠেছে।এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষও তাঁর লেখার শক্ত ভিত্তি। কৃষকের ঘাম, নারীর বঞ্চনা, দরিদ্র মানুষের হাসি-কান্না তাঁর গল্পকে করেছে গভীর বাস্তব ও মানবিক। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়—এ এক সমাজ-মনস্তত্ত্বের দলিল। তিনি মানুষকে দেখেছেন শ্রেণিভেদে নয়, মানবতার দৃষ্টিতে। তাঁর লেখায় সমাজের অসাম্য যেমন উঠে এসেছে, তেমনি উঠে এসেছে মানুষের সম্ভাবনার কথাও। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষ যতই দুর্বল হোক, তার ভেতরে আলো আছে। সেই আলো জাগিয়ে তুলতে পারলেই সমাজ বদলায়।
রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন কেবল সাহিত্যসৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা, সমাজ, মানবকল্যাণ—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন এক অগ্রপথিক। শান্তিনিকেতন ছিল তাঁর স্বপ্নের শিক্ষালয়, যেখানে শিক্ষা মানে ছিল মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তোলা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল চাকরির যোগ্যতা তৈরির জন্য নয়; শিক্ষা মানুষের মনকে মুক্ত করার জন্য। পরীক্ষানির্ভর, মুখস্থবিদ্যাভিত্তিক শিক্ষার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন দৃঢ় সমালোচক। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল প্রকৃতি ও জীবনের সঙ্গে সংযোগের নাম।
শ্রীনিকেতন ছিল গ্রামীণ উন্নয়নের বাস্তব প্রয়াস। তিনি বুঝেছিলেন, গ্রামের উন্নতি ছাড়া দেশের উন্নতি অসম্ভব। কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, সমবায় ব্যবস্থা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি—এসব নিয়ে তিনি চিন্তা করেছেন বাস্তবভিত্তিকভাবে। আজকের বাংলাদেশেও গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি সংকট, শ্রমিকের অধিকার এবং উন্নয়ন বৈষম্যের প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের সেই ভাবনা নতুনভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
রাজনীতির প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিবেকবান। তিনি জাতীয়তাবাদকে ভালোবাসতেন, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি দেখেছিলেন, জাতীয়তাবাদ যখন অন্ধ আবেগে পরিণত হয়, তখন তা মানবতাকে গ্রাস করে।
১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড উপাধি ফিরিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর নৈতিক দৃঢ়তার অনন্য নজির। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে—রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি নন, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক এক বিবেক।
ধর্মের বাইরে, মানুষের ভেতর
রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানবতাবাদ। তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু ধর্মকে কখনো বিভাজনের দেয়াল হতে দেননি। তাঁর লেখায় ঈশ্বর আছেন, কিন্তু সেই ঈশ্বর মন্দির-মসজিদের সীমানায় বন্দী নন; তিনি মানুষের শ্রমে, ভালোবাসায়, দুঃখে, আনন্দে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ঈশ্বরকে খুঁজতে হলে মানুষের কাছে যেতে হবে। এই চিন্তা আজকের সমাজে আরও বেশি প্রয়োজনীয়—যখন ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়ে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হয়।মানুষকে ছোট করে দেখা, অন্যকে অস্বীকার করা, ভিন্ন মতকে শত্রু ভাবা—এসব প্রবণতা সমাজকে ধ্বংস করে। রবীন্দ্রনাথ সেই ধ্বংসের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়, সে মানুষ।
রবীন্দ্রনাথ কি কেবল অতীতের স্মৃতি?রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের সমাজে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে তাঁকে পূজার আসনে বসিয়ে ফেলা। অন্যদিকে তাঁকে রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ বানিয়ে আক্রমণ করা যেখানে তাঁর অবদানকে খাটো করে দেখানো হয়। দুই প্রবণতাই বিপজ্জনক। রবীন্দ্রনাথকে পূজা করারও দরকার নেই, অস্বীকার করারও প্রয়োজন নেই। দরকার তাঁকে পাঠ করা, বোঝা এবং সময়ের আলোয় তাঁর চিন্তাকে কাজে লাগানো।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য একটি মানদণ্ড—কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন তুলতে হয়, কীভাবে সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে হয়, কীভাবে মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জাতি গঠনের মূল শক্তি কেবল অর্থনীতি বা রাজনীতি নয়—মূল শক্তি মানুষের মন, মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতি।
আজকের যুগে যখন প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে দ্রুততর করেছে, কিন্তু সম্পর্ককে করেছে শুষ্ক; যখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন আছে, কিন্তু নৈতিক উন্নয়ন প্রশ্নের মুখে; যখন কথার স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়; যখন সমাজে বিদ্বেষের ভাষা বাড়ে—তখন রবীন্দ্রনাথ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষকে বাঁচাতে হলে আগে মানুষের মনকে বাঁচাতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ স্মৃতি নয়, আমাদের চেতনার নাম রবীন্দ্রনাথ।পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন জমিদারি সূত্রে, কিন্তু এই মাটি তাঁকে দিয়েছে গভীর অনুপ্রেরণা। শিলাইদহের পদ্মা, শাহজাদপুরের যমুনা, পতিসরের কৃষকের জীবন সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন বাস্তবতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বাংলাকে শুধু লিখে যাননি, বাংলাকে অনুভব করেছেন। তাই রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে কেবল একজন কবি নন—তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭ আগস্ট ১৯৪১ সালে
(২২ শ্রাবণ ১৩৪৮বাংলা)। কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস
ত্যাগ করেন।
আজও যখন সমাজ সংকটে পড়ে, যখন মানবতা প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়, তখন রবীন্দ্রনাথের লেখা আমাদের পথ দেখায়। তিনি মনে করিয়ে দেন মানুষের ভেতরের আলোই সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মা যতদিন জাগ্রত থাকবে, রবীন্দ্রনাথ ততদিন বেঁচে থাকবেন। কারণ তিনি কোনো একক সময়ের কবি নন—তিনি চিরকালের আলো, চিরকালের বিবেক।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে কেবল সাহিত্যিক স্মারক নন, তিনি একটি চলমান চেতনা। যে চেতনা বলে—মানুষকে ভালোবাসতে শেখো, সংকীর্ণতার দেয়াল ভাঙো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, আর সৌন্দর্যকে ধারণ করে জীবনকে আরও মানবিক করে তোলো। রবীন্দ্রনাথ তাই আজও আমাদের ঠিকানা। সময় বদলালেও, সভ্যতা বদলালেও এই ঠিকানা বদলায় না।
লেখকঃ লেখক ও গবেষক ।
আরও পড়ুন:
রাকিবুল ইসলাম





















