ঢাকা, বাংলাদেশ।
,
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
তাজা খবর
জ্বালানি সংকটে অচল দেশ: পাম্পে সংঘর্ষ
কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম
বৃষ্টিতে পানির নিচে পেঁয়াজ: কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা
টঙ্গীতে স্ত্রীর হাতে স্বামীর পুরুষাঙ্গ কর্তন
হরমুজ প্রণালি ও ইরানে শাসক পরিবর্তন নিয়ে মুখ খুললেন মার্কো রুবিও
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার
বাংলাদেশ ব্যাংকে ১০৮ সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সিটি কর্পোরেশন প্রশাসকের নির্দেশনা
সক্রিয় দালালচক্র ॥ চিকিৎসা বঞ্চিত রোগীর সাথে স্বজনদের ভোগান্তি চরমে
অবৈধ তেল মজুদকারী ধরতে লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা
তিস্তা পাড়ের মেয়ে

মোঃ জাবেদুল ইসলাম
- সর্বশেষ পরিমার্জন: ০১:১৪:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
- / ৬৯ বার পঠিত

—মোঃ জাবেদুল ইসলাম
শান্ত বাবু বাবা মায়ের আদরের সন্তান। তাদের পরিবারে বাবা মা আর তিন ভাই বোনের সংসার। বাবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনস্হ উচ্চমান সহকারী। শান্ত বাবু তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার বড়। এবার ইন্টারমেডিয়েট পাস করলো, জিপিএ গোল্ডেন 5 পেয়ে।
শান্ত বাবুর খুশি আর ধরে না। সাথে বাবা-মা তার ছোট ভাই টুটুল ও বোন সুমাইয়াও খুশিতে গদগদ হয়ে পড়ে। এবার শান্ত বাবুর
ই্ঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ হলো। তারা কাকে বলবে আর কাকে যে ঐই খুশির খবরটা পৌঁছে দিবে তা তারা যেন ভেবে পাচ্ছে না। শান্ত বাবু তার বাবা চাকুরির সুবাদে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনস্হ সরকারি কোয়ার্টাররে থাকা হয় তাদের। বিশাল কলোনির অনেক অনেক লোকের বাস সেখানে। কলোনির দক্ষিণ পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা অববাহিকায়। তিস্তার উৎপত্তি হিমালয়ের পাদদেশে সিকিম রাজ্য থেকে আনুমানিক ১৫০০খ্রিঃ এর আগে পরে, এরকমই ধারণা করা হয়।
তিস্তা হিমালয় অঞ্চলের সিকিমের হতে উৎপত্তি হয়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার কিছু অংশ ঘিরে প্রবাহিত হয়ে চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে ধরলা তিস্তা একত্রে মিলিত হয়ে মোহনায় মিলিত হয়ে বয়ে চলে অজানা কোনো গন্তব্যের পথে। এখন গ্রীষ্ম কাল। প্রচন্ড গরম, যেন গায়ে কাপড় রাখা যায় না। বিকেলে পড়ন্ত বেলায় নদীর তীরে দক্ষিণা শীতল বাতাস বইছে।
শান্ত বাবু প্রতিদিনের মতো আজও এই সময়ে শীতল বাতাসে শরীর টা ঠান্ডা করার জন্য নদীর ধার দিয়ে এক পা দুই পা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাটছে আর গুণগুণ করে গান গাচ্ছে। হাটতে হাটতে হঠাৎ পা পিছলে নদীতে হুমরি খেয়ে পানিতে পড়ে গেল। তখন নদীর ছিল ভরা যৌবন। প্রচুর পানি। প্রবল স্রোতের তিস্তা। একবার যদি কাউকে ধরেছে। তাহলে আর সহজে ছাড়ে না। শান্ত বাবু তীরে উঠার জন্য প্রচন্ড চেষ্টা করছে কিন্তু খরস্রোতা নদী তিস্তার সাথে কিছুতেই পেড়ে উঠতে পারছে না। পানির স্রোতের টানে সে ভেসে যাচ্ছে। শান্ত বাবু উতালপাতাল শুরু করে দিয়েছে এবার। সে ভয় পেল। কারণ স্রোতে ভাসতে ভাসতে অনেক দুরে এসে পড়ছে এবার। শরীর ক্লান্ত হয়ে গেল।
এরইমধ্যে তিস্তা নদীর পাড়ে কতোগুলো বাড়ি ঘর আছে। সেই খানে কতগুলো ছেলেমেয়ে খেলা করছে তাদের মধ্যে ষোল সতেরো বছর বয়সের একটি মেয়ে নাম রাজিয়া সুলতানা, দশম শ্রেণির ছাত্রী। অর্থাৎ এবার s s c candidate. দেখতে অপূর্ব সুন্দরী। গায়ের রং ফর্সা। বেশ গোল গাল মুখের ফেস কাটিম। রাজিয়া সুলতানা কাউকে কিছু না ব’লে এক দৌড়ে তিস্তায় ঝাপিয়ে পড়ে। প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে লাগলো ছেলেটিকে ধরার জন্য। অনেক পরিশ্রমের পর অবশেষে ছেলেটিকে একহাতে ধরে ফেলে। তারপর সাতরে দ্রুত তীরের দিকে আসডে থাকে। আর একহাত দিয়ে সাতরে ছেলেটিকে ডাঙায় তুলে। তারপর তিস্তার প্রবল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে মেয়েটিও যেন বেহুশের মতো হয়ে গেল। সবাই ছুটে আসলো। একটু পরে ছেলে মেয়ে দু’জনে সুস্থ হয়ে গেল।
ছেলেটির বাবা মা কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবে, তার ভাষা খুঁজে পায় না। এই অল্প বয়সী মেয়েটির হঠাৎ বুদ্ধি আর সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে.সত্যি সকলেই তার প্রসংশা আর ধন্যবাদ জানায়। কিছুক্ষণ পরে সবাই যার যার বাড়ি সেই সেই চলে গেলো। শান্ত বাবু বাড়ি ফিরে তার শরীরের ভেজা কাপড় প্যান্ট শার্ট জুতা খুলে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ভালো কাপড় পড়ে নিলো। আর মেয়েটির কথা কল্পনা করছে। ভাবছে যে, মেয়েটি না থাকলে সত্যি আজ বোধ হয় নদীর স্রোতে হারিয়ে যেতাম। আর কোনো দিন হয়তো এই প্রকৃতি আকাশ চাঁদ সূর্য গ্রহ তাঁরা নদী গাছের সারি পাখির ঝাঁক কিছুই দেখতে পেতাম না। সত্যি মেয়েটি খুব সাহসী আর বুদ্ধিমতি। মেয়েটির হাতে হাত শক্ত করে ধরা সাঁতরে নদীর পাড়ে তোলা সব কিছু তার মনের ভিতরে ভালো লাগার এক অপূর্ব রোমান্টিক অনুভূতির দোলা দিতে থাকে।
তারা দুইজন দুইজনকে ভালোবেসে ফেলে। এরপর মেয়েটির মা বাবা ছেলের বাসায় আসলো খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য। দেখলেন, ছেলেটি ভালো আছেন। বেশ মোটামুটি সুস্থ হয়ে গেছে। ছেলেটির পাশে বসে কিছু সময় ধরে বসে থাকলেন। গল্প গুজব করলেন এবং নদীর পাড়ে বেড়াতে গেলে সাবধানে চলা ফেরা করতে বললেন। ছেলে শান্ত বাবু আচ্ছা ব’লে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। পাশাপাশি মেয়ে রাজিয়া সুলতানারও খোঁজ খবর নিলেন শান্ত বাবুর বাবা মাও।
তার উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা আর অসীম সাহসীকতার জন্য তাদের আদরের মানিক শান্ত বাবু প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। তার জন্য মা বাবা দোয়া ও প্রশংসা করে আসলেন। রাতে ওদের দুইজনের কারোরই ভালো ঘুম হলো না জানি। শান্ত বাবুর মনের মধ্যে রাজিয়ার কথা বার বার মনে পড়ছে। কি অসীম সাহস তাঁর। প্রবল স্রোতের তিস্তা। সেখানে সে ঝাপিয়ে পড়ে সাঁতরে রক্ষা করে আমাকে। মেয়েটি যদি বা না থাকতো, তাহলে কি অবস্থা হতো আমার। আস্তে আস্তে কয়েক দিনের মধ্যে মেয়ে রাজিয়াকে তাঁর জীবন সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য তার মনে কল্পনা জাগলো।
শান্ত বাবু রোজ বিকেলে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে এবং মেয়ে রাজিয়া সুলতানা কে ডাকে ইশারা করে। কথা ব’লে। ভিতরে ভিতরে অনেক পরিচয় আদান-প্রদান হয়েছে ওদের দুইজনের মধ্যে। যতই দিন যেতে থাকে ততই তাদের মধ্যে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। এক সময় তাদের উভয় পরিবারের মধ্যে বিষয় টা জানাজানি হয়ে যায়.শান্ত বাবু ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলো। শান্ত বাবুর বাবা মা উচ্চ শিক্ষিত। ধনাঢ্য পরিবারের লোক। সরকারী চাকুরী করে। শান্ত বাবুও কম শিক্ষিত নয়। আর মেয়ের বাবার নেহাৎ গরীব মানুষ। সারাজীবন দুঃখ কষ্টে চলে তাদের জীবন। কিন্তু শান্ত তাহা কিছুতে মানতে রাজি নয়। পৃথিবীতে সব মানুষ এক রকম হলে আর পাথর্ক্য থাকে কোথায়? কেউ ধনী, কেউ গরীব, কেউ কৃষক, কেউ কামার, কেউ বা আবার শ্রমিক, কেউ মজুর।
প্রতিটি মানুষ তার নিজের প্রয়োজন মেটাতে একে অপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
একজন আরেক জনের জন্য নিয়োজিত করে দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করে মহান আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সমাজের কোন মানুষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নাই। যদি কেউ এটি করে থাকে তাহলে তাদের বোঝার ভুল। যাই হোক, শান্ত বাবু কারোর কথা শুনতে রাজি নন। সে তার প্রেমিক রাজিয়া সুলতানা কে ভুলতে পারবে না। খারাপ কি? রাজিয়া সুলতানা শিক্ষিত স্মার্ট এবং সুন্দরী গ্রামের সাধারণ মেয়ে। সংসার মনযোগী। না না এমন সহজ সরল স্মার্ট সুন্দরী শিক্ষিত গ্রামের সাধারণ মেয়েটিকে আমি ভুলতে পারবনা। এ বিষয় টা নিয়ে শান্ত বাবুর বাসায় তুমুল লড়াই হয়। বাবা মা আর ছেলের সঙ্গে। ছেলে মন খারাপ করে চুপচাপ ঘরে বসে থাকে। কিন্তু রাজিয়া সুলতানা কে এসব কিছু জানতে দেয় না। চুপিচুপি তাদের প্রেম চালিয়ে যেতে থাকে। কিছু দিন পরে শান্ত বাবু এলজিডিই ডিপার্টমেন্টে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকুরী পেয়ে যায়।
তবুও সে প্রেমিকার জন্য মনে মনে কষ্ট পেতে থাকে। চাকুরীতে জয়েন করলো। ভালো করে চাকুরী চলছে। মাস শেষে বেতন পাচ্ছে সংসারের সব খরচ করছে সবার প্রয়োজন মিটছে। বাবাও খুব খুশি। তার ছেলে অফিসার। একদিন আরো অনেক বড় অফিসার হবে। কিন্তু তার নিজের ছেলের মনের কথা বুঝতে তার কষ্ট হয় না। রাজিয়াকে ভুলে যাওয়ার জন্য শান্ত বাবুর বাবা চাকুরী বদলি নিয়ে তাদের নিজের জেলায় স্বপরিবারে চলে যায়। তিনি বুঝতে চান না যে, শান্ত বাবু চাকুরী জয়েন্ট করে ঠাকুরগাঁও জেলায়। তার ছেলে একটি মেয়েকে ভালোবাসে। তাঁকে নিয়ে ঘর সংসার করে সুখী হতে চায়। শান্ত বাবুর মা বাবা শান্তকে বিয়ে দেয়ার জন্য কত কত জায়গায় হতে মেয়ের খবর নিয়ে আসলো তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু শান্তর তিস্তা পাড়ের মেয়ে রাজিয়া সুলতানা ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয় সবাই কে। শান্ত বাবুর কথা কেউ শুনতে রাজি নয়।
বাবার কথায় রাজি হতে হবে। শান্ত বাবুর বাবা তাঁর স্ত্রীকে জানিয়ে দেয়। এই নিয়ে বাবা মা আর ছেলের তুমুল ঝগড়া বিবাদ হয়।
বেশ কিছু দিন তাদের কারো সঙ্গে কারোর কথা হয় না। শান্ত বাবুর মন খারাপ করে থাকে। পরিবারের সকল অর্থনৈতিক চাহিদা মেটায়। কারোরই কোন একটা সমস্যা হতে দেয় না সে। আর আজ তার একজন জীবন সঙ্গী বেছে নেতে সে কতো না কষ্ট পাচ্ছে। তার কষ্টের কথা কেউ বুঝতে চায় না। বসে বসে একা ঘরে কাঁদছে শান্ত বাবু। রাজিয়া সুলতানা আজ নিশ্চয় বড় হয়ছে। হয়তো এত দিনে সে পূর্ণ সাবালিকা হয়েছে।
হয়তো বা কারো ঘরের ঘরনি হয়ে গেছে ভাবতেই সে চমকে উঠে। না না এটা হতে পারে না। রাজিয়াকে ছাড়া কিছু আর ভাবতে পারব না। রাজিয়া অন্য কারোর ঘরনি হলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো। মা বাবা বোধ হয় আমাকে বাঁচতে দিবে না।
শান্ত বাবু এসব ভাবতে ভাবতে এক সময়ে ঘুমিয়ে পরে। রাতের খাবারটাও খায়নি সে রাতে। মন খারাপ অবস্থা। খাওয়া দাওয়া সব কিছু অনিহা। কিছুই ভালো লাগে না তার। একমাত্র সঙ্গী রাজিয়া সুলতানার কথা ভাবতে ভাবতে কেঁদে ফেলে সে। এবার শান্ত বাবু একাই ঝুঁকি নিয়ে বসলো। কারণ বাবা-মা দুইজনের অনেক বয়স হয়েছে। আর কিছু দিন গেলে তারা আর চলাফেরা করতেও পারবে না। তখন আরও অনেক বেশি প্রব্লেম হবে। আমার অফিস, বাবা মায়ের সেবাযত্ন বাড়ির ভেতর ও বাহিরের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ, রান্না বান্না করা অনেক সাংসারিক কাজ দেখাশোনা করার জন্য একটা ভালো মনের মানুষ তার চাই।
আর সেই ভালো মনের মানুষটি হলো, তার রাজিয়া সুলতানা সেই তিস্তা পাড়ের মেয়েটি। শান্ত বাবু বিছানায় শুয়ে শুয়ে গভীর চিন্তা করতে লাগলো। খুব মন খারাপ করে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছে সে।
কি করা যায়। বাবা মা তার মনের অবস্থা বুঝে না, বা বুঝতে চায় না। শান্ত বাবুরও মনে তিস্তা পাড়ের মেয়ে রাজিয়া সুলতানার কথা গাঁথা হয়ে গেছে।
রাজিয়া সুলতানার কথা তার মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না। তাই এবার শান্ত বাবু নিজে নিজে প্ল্যান করে ফেল্লো। সে একদিন খুব ভোর বেলাতে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বেড়িয়ে পড়ে। আর ওদিকে অফিস থেকে তিন দিনের ছুটি চেয়ে তার বসের নিকট এ্যাপ্লিকেশন দিয়ে চলে শহরে। শহরে গিয়ে কিছু নতুন কাপড় চোপড় বিয়ের গহনাদি এবং রাজিয়া সুলতানার বাবা-মা ও ভাই বোন সকলের জন্য নতুন কাপড় জুতা সেন্ডেল অন্যান্য প্রসাধন সামগ্রী কিনে একটা বড় উন্নতমানের লাগেজে সাজিয়ে কিছু ফলমূল এবং কিছু মিষ্টি কিনে নিয়ে রওনা হলো তিস্তা পাড়ের মেয়ে রাজিয়া সুলতানার বাড়ির উদ্দেশ্য।
এক সময় শান্ত বাবু এসে পড়ে তার গন্তব্য স্থানে। এসে দেখে যেখানে রাজিয়াদের বাড়ি ছিলো সেখানটা পুরো পাড়াটা এবারের বন্যার প্রবল স্রোতের তিস্তা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শুধু ধুধু বালি চর। কে বলবে এখানে এক সময় অনেক অনেক ঘর বাড়ি ছিলো। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা এখানে গোল্লা .. ছুট আর দাঁড়িয়াবান্ধা আর হাডুডু
খেলতো। না নতুন কেউ আসলে বিশ্বাস করবে না। যাই হোক শান্ত বাবু এসব দেখে মনে মনে ভাবছে যে, ভুল করে আবার অন্য জায়গায় এসে পড়ছে না কি। তারপর থমকে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ। এবার একটা বুড়ো চাচা শান্ত বাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন বাবাজি কার বাড়ীতে যাবেন। শান্ত বাবু বল্লো চাচা আমি আব্দুল মোতালেব চাচার বাড়িতে যাবো।
ও! তারা তো আর এখানে থাকে না বাবাজি। গত বছর তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাসে পুরো গ্রাম খেয়ে ফেলেছে। দেখতেছ না গোটা আস্ত একটা নদী। শান্ত বাবু আবার জিগায় ওনারা কোথায় গেছে বলতে পারেন? বুড়ো চাচা আঙুল উঁচিয়ে এবার দেখায় দেয় বাবাজি ওই যে পাড়া দেখা যায়, ওখানেই তারা থাকে। রাজিয়ার বাবা আব্দুল মোতালেব হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়।
এখন ওদের পরিবারে মা আর ভাই বোন মিলে কোন রকম একটা ঘরে খুব কষ্টে দিন কাটায়। আয় রোজগার করার মত কেউ নাই। তা তুমি কে বাবা? তোমাকে চিনলাম না। আমার আব্বা এখানে চাকরি করেছে। আমরা কোয়াটারে ছিলাম।
এখন গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছি। মোতালেব চাচার সাথে আগেই থেকে পরিচয় ভালো। তাই ওনাদের কাছে দেখা করতে আসছি এই আর কি।
হঠাৎ রাজিয়ার ছোট ভাই সুমন শান্ত বাবু কে দেখে চিনে ফেলে। সুমন আগায় আাসে শান্ত বাবুর কাছে। ছালাম বিনিময় করলো। কখন আসলেন? একটু আগে আসছি। তোমাদের এই অবস্থা কেন? প্রকৃতির ইচ্ছে ছিল তাই। আমাদের কারোর কোন হাত নেই এখানে। আমাদের বাড়িতে যাবেন? হ্যাঁ তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসছি। চলেন যাই। সুমন লাগেজটা একহাতে আর এক হাতে ফলের ব্যাগ হাতে ধরে চলে গেলো বাড়ির ভেতর।
রাজিয়া সুলতানা মা ও ছোট বোন সবাই খুশি। দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করা হলো। অনেক দুঃখ কষ্টের কথা আদান প্রদান হয় উভয় পরিবারের মধ্যে। এবার লাগেজ খুলে শান্ত বাবু যার যার উপহার তাঁকে তাঁকে দিয়ে দিলেন। পরিশেষে রাজিয়া সুলতানা কে চাকরি দিতে চাইলেন। শান্ত বাবু রাজিয়া সুলতানা পাশে কথাগুলো বলছিলো শান্ত বাবু। রাজিয়া ও রাজিয়ার মাকে তাদের পরিবারের সমস্ত ঘটনা খুলে বল্লো। শান্ত বাবু রাজিয়া সুলতানা মায়ের হাত ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলছে এসব কথাগুলো। রাজিয়া চাকুরী টা আমার প্রিয় বাবা মায়ের সেবা যত্ন করা। সময় মতো খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা। ঘর-বাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা।
তোমাদের পরিবারের সবার ভরণপোষণের দায়িত্ব আজ থেকে সম্পুর্ন আমার। তোমাদের কোনো চিন্তা করতে হবে না। সুমনের লেখা পড়ার দায়িত্ব আমার উপর। সবাই খুশি হয়ে গেল। রাজিয়া সুলতানাও রাজি হ’য়ে গেলো। খানিক পরে থমকে দাঁড়ালো রাজিয়া। শান্ত বাবু কে সে বল্লো, তোমার বাবা-মা যদি রাজি না হয়। শান্ত বাবু বল্লো এসব চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। বাবা-মা কে ম্যানেজ করবার দায়িত্ব আমার। তুমি রেডি হয়ে নাও। শান্ত বাবু আর সুমন ও তাদের বাড়ির প্রতিবেশী দুই জন লোককে সাথে নিয়ে বাজারে গেলো।
রাতে আমাদের বিয়ে সেজন্য কিছু খরচ করতে হবে। এলাকার চেয়ারম্যান চারপাচজন মেম্বার এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিকে শান্ত বাবু দাওয়াত করে। রাতে সবাই আসলেন সময় মত। শান্ত বাবু সবার সঙ্গে পরিচয় হলেন। অনেক কথা তাদের পরিবার পরিজন সম্পর্কে অনেক কথা হলো। এবসর কাজি সাহেব আসলেন। বিয়ের সব বন্দোবস্ত হয়ে গেল। এবার খাবার দেওয়া হলো। সবাই তৃপ্তি সহকারে খেলেন। খাওয়া শেষে নবদম্পতিদেরকে প্রান খুলে দোয়া করেন।
শান্ত বাবুর হাতে মা তার শপে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, বাবা একমাত্র মেয়ে, তুমি ওকে দেখে দেখে রাখবে। শান্ত বাবু এবার আশ্বস্ত করে বল্লো, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না ওকে দেখার দায়িত্ব আমার।ও খুব বুদ্ধিমতি। অনেক সময় ধরে এই কথাগুলো বলছিলো শান্ত বাবু তার শাশুড়ীকে। এবার বিদায় নিলো। শান্ত বাবুর বাড়ির দিকে রওনা হলো। ওদিকে শান্ত বাবুর খোঁজে তার বৃদ্ধ বাবা মা কাঁদতে কাঁদতে একেবারে শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ শান্ত বাবু বাড়ির উঠানে উপস্থিত। সাথে নববধূ। শান্ত বাবুর ইশারায় নববধূ বাবা মা’কে ছালাম করতে বল্লেন। রাজিয়া সুলতানা ছালাম করলো তার বাবা মা’কে। বাবা-মা আর কিছু না ব’লে হাসি মুখে মেনে নিলো ছেলের নববধূকে।
বেশ চলছে তাদের সংসার। বাবা রাজিয়া সুলতানার সংসারের উপর মনোযোগ দেখে খুব খুশি হয়। মায়ের কাছে বাবা রাজিয়া সুলতানার প্রশংসা করে। মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে গেল। বাবাও এখন মোটামুটি ভালো। ছোট বোনের লেখা পড়া চলছে ভালো। শান্ত বাবুও রাজিয়া সুলতানার পরিবারের সকলের খোঁজ খবর রাখে। সময় মতো সব কিছু পাঠিয়ে দেয়। আবার যদি টাকার প্রয়োজন হয়। শান্ত বাবুর কানে আসা মাত্র টাকার ব্যবস্থ করে দিয়ে দেয়।
শান্ত বাবু জীবন সঙ্গী হিসেবে তিস্তা পাড়ের মেয়ে রাজিয়া সুলতানা কে পেয়ে নিজের জীবনটাক ধন্য করছে। রাজিয়া সুলতানা সবার চোখে তাক লাগিয়ে দিয়ে তার সংসারক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শান্ত বাবু অনেক অনেক মেয়ে দেখেছে। কিন্তু তিস্তা পাড়ের মেয়ে রাজিয়া সুলতানা একটি ব্যতিক্রম ধর্মী। গরীব ঘরের মেয়ে হিসেবে তার কোনো অহংকার নেই। সেবা যত্ন সে এতো এক্সপার্ট তা নিজের চোখে না দেখলে বলা মুসকিল। সব মিলে তিস্তা পাড়ের মেয়ে রাজিয়া সুলতানা একজন পুর্ন নারী হিসেবে শান্ত বাবু হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।
আরও পড়ুন:
মোঃ জাবেদুল ইসলাম





















