বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ
পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্ব আমাদের সকলের

- সর্বশেষ পরিমার্জন: ১২:০১:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
- / ২৭ বার পঠিত

শেখ রিফান আহমেদ : পরিবেশ মানুষের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, নিরাপদ জীবন ও সুস্থ সমাজ কল্পনা করা যায় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের নির্বিচার ব্যবহার বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নদী দূষণ, বন উজাড়, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের পরিবেশকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও পলিথিনের কারণে নদ-নদীগুলো তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীবনীশক্তি হারাচ্ছে।
বাংলাদেশের বনাঞ্চলও নানা কারণে সংকুচিত হচ্ছে। অবৈধভাবে গাছ কাটা, পাহাড় ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে শুধু প্রাণীকুলের আবাসস্থলই নষ্ট হচ্ছে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবও আরও তীব্র হয়ে উঠছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার ঘটনা পরিবেশগত সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে।
পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা পরিবেশবাদী সংগঠনের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা এবং পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। কারণ সচেতন জনগণ ছাড়া কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
প্রতিটি মানুষ যদি দৈনন্দিন জীবনে কিছু সাধারণ অভ্যাস গড়ে তোলে, তাহলে পরিবেশ রক্ষায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। যেমন— অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা, নিয়মিত বৃক্ষরোপণ করা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ বিষয়ক সমস্যা, সম্ভাবনা ও সচেতনতামূলক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়ে সংবাদমাধ্যম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ রক্ষায় সফল উদ্যোগ ও ইতিবাচক উদাহরণগুলোও বেশি বেশি প্রচার করা প্রয়োজন, যাতে অন্যরাও উৎসাহিত হয়।
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশ রক্ষা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আজ আমরা যদি প্রকৃতিকে রক্ষা করি, তাহলে প্রকৃতিও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করবে। একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে এখনই প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। পরিবেশ রক্ষার এই সংগ্রামে প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণই হতে পারে একটি সুন্দর আগামী দিনের ভিত্তি।
-লেখক: সম্পাদক, দৈনিক নাগরিক ভাবনা





















