
নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকায় চিকিৎসাধীন এক গুরুতর আহত সাংবাদিকের জীবন বাঁচাতে রক্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন তার স্ত্রী। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর শিশু মেলা সংলগ্ন ওভারব্রিজের পশ্চিম পাশে। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার, এবং খোয়া যাওয়া মালামাল উদ্ধারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছে।
ভুক্তভোগী মোছাঃ রাশিদা সুলতানা জানান, তার স্বামী জেমস আব্দুর রহিম রানা, একজন সিনিয়র সাংবাদিক, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (নিটোর/পঙ্গু হাসপাতাল)-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি বর্তমানে হাসপাতালের গ্রীন-২ ইউনিটের ইএফ ওয়ার্ডের ২৮ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার একাধিক জটিল অস্ত্রোপচার চলছে এবং সেদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন নির্ধারিত ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ জুন শনিবার সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে স্বামীর অস্ত্রোপচারের জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন হওয়ায় রাশিদা সুলতানা শ্যামলীর একটি ব্লাড ব্যাংকে যান। সেখানে রক্ত সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে তিনি দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন।
পথিমধ্যে শিশু মেলা সংলগ্ন ওভারব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তি প্রথমে তার কাছে জানতে চায় তিনি চক্ষু হাসপাতাল চেনেন কিনা। তিনি জানান, তিনি ঢাকার নতুন এবং শহর সম্পর্কে ভালোভাবে পরিচিত নন। এরপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করে তিনি কোথা থেকে এসেছেন এবং কোথায় যাচ্ছেন।
সরল বিশ্বাসে তিনি জানান, তার স্বামী গুরুতর আহত অবস্থায় অপারেশন থিয়েটারের সামনে রয়েছেন এবং তার অস্ত্রোপচারের জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন ছিল। তিনি শ্যামলীর একটি ব্লাড ব্যাংকে রক্ত সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু রক্ত সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় হাসপাতালে ফিরছিলেন।
এ কথা শোনার পর তারা তার স্বামীর চিকিৎসা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চায় এবং রক্ত সংগ্রহে সহায়তা করার আশ্বাস দেয়। পরে তারা তাকে রক্তের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে শিশু মেলা সংলগ্ন ওভারব্রিজের পশ্চিম পাশে নিয়ে যায়।
সেখানে নিয়ে গিয়ে প্রতারণামূলক কৌশল ও কথাবার্তার মাধ্যমে তাকে জ্ঞানশূন্য বা অচেতন অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি দেখতে পান তার সঙ্গে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ, মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার খোয়া গেছে।
খোয়া যাওয়া মালামালের মধ্যে রয়েছে একটি বাটন মোবাইল ফোন (নম্বর: ০১৭১৬-২৯৪১০৬ ও ০১৯১৩-২১২৬১১), চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত নগদ ৩৮,৭০০ টাকা এবং সাড়ে চার আনা ওজনের এক জোড়া স্বর্ণের কানের দুল।
পরবর্তীতে তিনি দ্রুত হাসপাতালে ফিরে এসে অপারেশন থিয়েটারের সামনে অপেক্ষমাণ স্বামীকে বিষয়টি জানান। তখন তিনি বুঝতে পারেন, জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ের মাঝেই পরিবারটি আরেকটি চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানা বলেন, “আমি তখন অপারেশন থিয়েটারের সামনে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলাম। আমার স্ত্রী আমার জন্য রক্ত আনতে গিয়ে এমন প্রতারণার শিকার হবে, তা কল্পনাও করিনি। চিকিৎসার জন্য ধার-দেনা করে জোগাড় করা অর্থটাই ছিল আমাদের শেষ ভরসা।” এহেন পরিস্থিতিতে রক্ত সংকট এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তার এ দিনের অপারেশনটি স্থগিত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ চিকিৎসা ও একাধিক অস্ত্রোপচারের কারণে পরিবারটি ইতোমধ্যে কঠিন আর্থিক চাপে রয়েছে। এ ঘটনার পর তাদের পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর হাসপাতালকেন্দ্রিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা কখনো রক্তের প্রয়োজন, কখনো চিকিৎসা সহায়তা, আবার কখনো পথনির্দেশনার নামে অসহায় ও সংকটাপন্ন মানুষদের টার্গেট করে থাকে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতিতে থাকা রোগীর স্বজনদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় এ ধরনের প্রতারণা চক্রের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে। এতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে রোগীর স্বজনরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। তারা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান, নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারটি প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের সুদৃষ্টি কামনা করে জানিয়েছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করা গেলে ভবিষ্যতে এমন মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তারা খোয়া যাওয়া নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল ফোন উদ্ধারের জোর দাবি জানিয়েছে।
এ ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এ ধরনের অপরাধ দমনে দ্রুত ও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























